টিকা দিতে ঢাকায় হবে ৩০০ কেন্দ্র: স্বাস্থ্যমন্ত্রী

প্রকাশ: ১৯ জানুয়ারি ২০২১

সমকাল প্রতিবেদক

টিকা দিতে ঢাকায় হবে ৩০০ কেন্দ্র: স্বাস্থ্যমন্ত্রী

রোববার ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে মিট দ্য রিপোর্টার্স অনুষ্ঠানে স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক -সমকাল

অক্সফোর্ড-অ্যাস্ট্রাজেনেকার প্রযুক্তিতে উৎপাদিত সেরাম ইনস্টিটিউট থেকে কেনা টিকার পাশাপাশি উপহার হিসেবেও ভারতের কাছ থেকে কিছু টিকা পাওয়া যাবে। গতকাল সোমবার ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে (ডিআরইউ) 'মিট দ্য রিপোর্টার্স' অনুষ্ঠানে স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক এ কথা জানিয়েছেন।

স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, সরকারিভাবে সেরামের তিন কোটি ডোজ টিকা কিনছে বাংলাদেশ। প্রথম চালানে ৫০ লাখ ডোজ আগামী ২৫ জানুয়ারির মধ্যে আসবে। এর পর প্রতি মাসে ৫০ লাখ ডোজ; তিন কোটি ডোজ টিকা পাওয়া যাবে। এর বাইরে ভারত থেকে আরও কিছু টিকা উপহার হিসেবে আসবে। তবে উপহার হিসেবে কী পরিমাণ টিকা পাওয়া যাবে, তা এখনই বলা যাচ্ছে না।

অক্সফোর্ডের টিকা ছাড়াও ভারত বায়োটেকের তৈরি কোভ্যাক্সিন টিকার জরুরি ব্যবহারের অনুমোদন দিয়েছে ভারত সরকার। তবে কোন কোম্পানির টিকা ভারত উপহার হিসেবে পাঠাবে, সে বিষয়ে সুনির্দিষ্ট করে কিছু বলেননি মন্ত্রী। সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, উপহার হিসেবে পাওয়া টিকা সরকারের কেনা টিকার প্রথম চালানের আগেও আসতে পারে। এটি রাষ্ট্রীয় বিষয়। এ কারণে সুনির্দিষ্ট করে দিনক্ষণ এখনই বলতে চাই না। যে কোনোদিন চলে আসবে।

কোভ্যাক্স থেকে মোট জনগোষ্ঠীর ২০ শতাংশের জন্য টিকা পাবে বাংলাদেশ। একই সঙ্গে সেরাম ইনস্টিটিউট থেকে তিন কোটি ডোজ কিনছে সরকার। এর বাইরে অন্য কোনো দেশের সঙ্গে টিকার বিষয়ে কোনো চুক্তি হয়নি। সাংবাদিকদের এ-সংক্রান্ত প্রশ্নের জবাবে জাহিদ মালেক বলেন, টিকার জন্য আমরা সার্বক্ষণিক খোঁজখবর রাখছি। অক্সফোর্ড ছাড়াও ফাইজার, মডার্না, স্পুটনিক ভিসহ যেসব টিকা তৈরি হচ্ছে, সেগুলো আনার চেষ্টা করছি।

রাজধানী ঢাকায় টিকাদানের পরিকল্পনা তুলে ধরে স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, টিকাদান কার্যক্রম পরিচালনার জন্য এরই মধ্যে প্রশিক্ষণ দিয়ে প্রায় ৪২ হাজার কর্মীকে প্রস্তুত রাখা হয়েছে।

রাজধানীর সরকারি হাসপাতাল ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারে ৩০০ টিকাদান কেন্দ্র খোলা হবে। এসব কেন্দ্র থেকে টিকা দেওয়া হবে। তবে ১৮ বছরের নিচে কাউকে টিকা দেওয়া হবে না।

ফাইজারের টিকা নেওয়ার পর নরওয়েতে ২৩ জনের মৃত্যু হয়েছে। ভারতেও টিকা নেওয়ার পর কয়েকশ' মানুষ অসুস্থ হয়ে পড়েছে। বাংলাদেশও টিকাদান কার্যক্রম শুরু করতে যাচ্ছে। টিকার পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া নিয়ে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী বলেন, সব ধরনের ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া থাকে। ওষুধের গায়ে পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার কথা স্পষ্ট করে লেখা থাকে। করোনাভাইরাসের টিকার পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া আছে। এ সমস্যা এড়াতে টিকাদান কেন্দ্র হিসেবে হাসপাতাল ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারকে বেছে নেওয়া হয়েছে, যেন কেউ অসুস্থ হয়ে পড়লে দ্রুত চিকিৎসার আওতায় আনা যায়।

অক্সফোর্ডের টিকার দাম নিয়ে আরেক প্রশ্নের জবাবে জাহিদ মালেক বলেন, ভারতের সেরাম ইনস্টিটিউট থেকে অক্সফোর্ডের টিকার প্রতি ডোজ বাংলাদেশ চার ডলারে কিনছে। আর পরিবহন ব্যয় হবে এক ডলার। চুক্তি অনুযায়ী, ভারত কম দামে কিনলে আমাদের কম দামে টিকা দেবে। ফলে দাম বেশি হলে আমরা ওই টিকা নেব না। আমরা কম দামেই টিকা নেব।

ফাইজার-বায়োএনটেকের টিকা বাংলাদেশ নিতে চায় কিনা, তা কোভ্যাক্সকে জানানোর শেষ দিন ছিল গতকালই। বাংলাদেশ ওই টিকা নিচ্ছে কিনা- সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, ফাইজারের টিকা নিয়ে আগ্রহের কথা জানিয়ে এরই মধ্যে চিঠি দেওয়া হয়েছে।

গ্লোব বায়োটেকের টিকা তৈরির উদ্যোগের প্রশংসা করে জাহিদ মালেক বলেন, গ্লোব বায়োটেকের উদ্যোগকে আমরা সাধুবাদ জানাই। তারা একটি টিকা তৈরি করছে। এটি ট্রায়ালের জন্য আবেদন করা হয়েছে। মানবদেহে প্রয়োগের আগে যত ধাপ পেরিয়ে আসতে হয়, সব অনুসরণ করে গ্লোবের টিকা তৈরি হলে সেটি গ্রহণ করা হবে। স্বাস্থ্য বিভাগের কাছে কোনো সহযোগিতা চাইলে তা দেওয়া হবে।

বেসরকারি পর্যায়ে টিকা বিক্রির অনুমোদন প্রসঙ্গে স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, বেসরকারি পর্যায়ে টিকা আনার অনুমতি দেওয়া হবে। একটি টিকার দাম কত হবে, তা নির্ধারণ করার জন্য সরকারি প্রক্রিয়া আছে। সে প্রক্রিয়া অনুযায়ী আমরা দামও নির্ধারণ করে দেব। এই টিকা দেওয়ার নীতিমালাও তৈরি করা হচ্ছে।

সাংবাদিকরা সবাই টিকা পাবেন জানিয়ে জাহিদ মালেক বলেন, করোনাভাইরাস সংক্রমণের সময় সবচেয়ে ঝুঁকি নিয়ে যারা কাজ করেছেন, সাংবাদিকরা তাদের মধ্যে অন্যতম। অনেক সাংবাদিক করোনাভাইরাসে সংক্রমিত হয়েছেন; তাদের কেউ কেউ মারা গেছেন। ফ্রন্টলাইনার হিসেবে টিকা এলে শুরুতেই সব সাংবাদিক পাবেন।

ডিআরইউ নেতারা তাদের প্রতিষ্ঠানে একটি টিকাদান কেন্দ্র খোলার দাবি জানান। এর পরিপ্রেক্ষিতে স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, সরকার আপাতত হাসপাতালগুলোতে টিকাদান কেন্দ্র চালু করবে। কারণ টিকাদানের পর কারও পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দেখা দিলে যাতে দ্রুত চিকিৎসার আওতায় আনা যায়।

ডিআরইউ সভাপতি মুরসালিন নোমানীর সভাপতিত্বে ও সাধারণ সম্পাদক মসিউর রহমান খানের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে সংগঠনের নেতারা বক্তৃতা করেন। এর আগে অনুষ্ঠানের শুরুতে প্রয়াত সাংবাদিক মিজানুর রহমান খানের প্রতি সম্মান জানিয়ে ১ মিনিট নীরবতা পালন করা হয়।

এদিকে বিকেলে রাজধানীর একটি পাঁচতারা হোটেলে 'কভিড-১৯ স্বাস্থ্য বুলেটিন-২০২০' এর মোড়ক উন্মোচন অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, করোনাকালেও বিরোধীরা নিরাপদে ঘরে বসে শুধু সমালোচনা করে গেছেন। তারা ঘর থেকে বের হননি। বাসা থেকে অনলাইনে টিভি অনুষ্ঠানে যুক্ত হয়ে শুধু সরকারের সমালোচনা করে যাচ্ছেন। একবারের জন্যও মানুষের পাশে দাঁড়াননি। তারাই এখন টিকার সমালোচনা নিয়ে ব্যস্ত।

স্বাস্থ্য বিভাগের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের উদ্দেশ করে স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, অন্যের সমালোচনায় কান দেওয়ার প্রয়োজন নেই। সরকার করোনার টিকা আনছে। দেশের সবাই টিকা পাবে। শিগগিরই অ্যাপের মাধ্যমে নিবন্ধন করে টিকাদান কার্যক্রম শুরু করা হবে।

অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি ছিলেন তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলক। তিনি বলেন, করোনার টিকাদান কার্যক্রম সম্পন্ন করার লক্ষ্যে 'সুরক্ষা' নামে একটি অ্যাপ চালু করা হচ্ছে। বর্তমানে এটি পরীক্ষামূলকভাবে চলছে। দু'একদিনের মধ্যে অ্যাপটি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের কাছে হস্তান্তর করা হবে। এ অ্যাপের মাধ্যমে করোনার টিকা গ্রহীতার নিবন্ধন থেকে শুরু করে টিকা নেওয়া মানুষের সব তথ্য সংরক্ষিত থাকবে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. আবুল বাসার মোহাম্মদ খুরশীদ আলমের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে আরও বক্তৃতা দেন প্রধানমন্ত্রীর সাবেক উপদেষ্টা অধ্যাপক ডা. সৈয়দ মোদাচ্ছের আলী, স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের সচিব আবদুল মান্নান, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ডা. কনক কান্তি বড়ূয়া, বিএমএ সভাপতি ডা. মোস্তফা জালাল মহিউদ্দিন, স্বাচিপ সভাপতি অধ্যাপক ডা. এম ইকবাল আর্সলান, সাধারণ সম্পাদক ডা. এম এ আজিজ, এমএআইএসের লাইন ডিরেক্টর ডা. মিজানুর রহমান প্রমুখ।