ভাসানটেকে গলিত লাশ উদ্ধার

নিপীড়নে অতিষ্ঠ হয়ে আলমকে ছুরিকাঘাতে হত্যা করেন রহমত

প্রকাশ: ১৯ জানুয়ারি ২০২১

ইন্দ্রজিৎ সরকার

দেড় বছর আগে শাহ আলম নামে এক ব্যক্তির সঙ্গে পরিচয় হয় তরুণ রহমত উল্লাহর। প্রথমদিকে দু'জনের দেখা হলে সাধারণ গল্প-আড্ডায় সময় কাটত। তবে কয়েক মাস পর একদিন বিভীষিকার মুখোমুখি হন রহমত। তাকে বাসায় ডেকে নিয়ে বলাৎকার করেন আলম। এ বিষয়ে কাউকে কিছু না বলার জন্য হুমকি দেন। 'ক্ষতিপূরণ' হিসেবে কিছু টাকাও ধরিয়ে দেন তিনি। কী করা উচিত বুঝতে না পেরে চুপচাপ থাকেন রহমত। অবশ্য আলম থেমে থাকেননি। বরং অসহায় তরুণকে জিম্মি করে কিছুদিন পরপরই চালান যৌন নিপীড়ন। এতে অতিষ্ঠ হয়ে একপর্যায়ে ভয়ংকর সিদ্ধান্ত নেন রহমত। সেই পরিকল্পনার বাস্তবায়ন করতেই তিনি গত বছরের ৩০ ডিসেম্বর আলমের বাসায় যান। ঘুমন্ত অবস্থায় প্রথমে ছুরিকাঘাত ও পরে বালিশচাপা দিয়ে আলমের মৃত্যু নিশ্চিত করেন। রাজধানীর উত্তর ভাসানটেকের একটি বাসা থেকে গত ১ জানুয়ারি শাহ আলমের গলিত লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। প্রাথমিকভাবে ক্লু-লেস মামলাটির তদন্তে বেরিয়ে এসেছে নেপথ্যের চাঞ্চল্যকর ঘটনা। নানামুখী বিশ্নেষণে রহমতের সংশ্নিষ্টতা নিশ্চিত হওয়ার পর গত ৬ জানুয়ারি সুনামগঞ্জের ধর্মপাশা থেকে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরদিন তিনি ঢাকার আদালতে ১৬৪ ধারায় দেওয়া জবানবন্দিতে হত্যাকাণ্ডের বিস্তারিত বর্ণনা দেন।

সম্প্রতি বলাৎকারকেও ধর্ষণ হিসেবে গণ্য করতে আদালতে রিট হয়েছে। নারী ধর্ষণের মতো 'পুরুষ ও ছেলেশিশু ধর্ষণসহ অন্যান্য ধর্ষণকে' যুক্ত করতে দণ্ডবিধির ৩৭৫ ধারায় সংশোধন চেয়ে গত বৃহস্পতিবার এ রিট করা হয়। হাইকোর্টের সংশ্নিষ্ট শাখায় রিটটি করেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী তাসমিয়া নূহাইয়া আহমেদ, সমাজকর্মী সৌমেন ভৌমিক ও জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক মাসুম বিল্লাহ।

ভাসানটেক থানার ওসি দেলোয়ার হোসেন সমকালকে বলেন, সেনাবাহিনীর এমইএস শাখার সিভিল কর্মচারী ছিলেন ৩৯ বছর বয়সী শাহ আলম। ঘটনার দিন দুপুরে তিনি পেশাগত দায়িত্ব পালন শেষে বাসায় ফেরেন। সেদিন রাত ১০টার দিকে ভাইয়ের সঙ্গে তার শেষবার কথা হয়। দু'দিন পর উত্তর ভাসানটেকের ১৬৬/৫ নম্বর ভবনের চিলেকোঠার ঘর থেকে তার লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। খবর পেয়ে স্বজনরা এসে লাশ শনাক্ত করেন। এ ঘটনায় তার ভাই বাদী হয়ে অজ্ঞাতপরিচয় আসামির বিরুদ্ধে মামলা করেন। তদন্তে প্রযুক্তির ব্যবহার করে দ্রুততম সময়ে অপরাধীকে আইনের আওতায় আনা সম্ভব হয়েছে।

তদন্ত-সংশ্নিষ্টরা জানান, নিহত শাহ আলম সমকামী ছিলেন। বেশ কয়েকজনের সঙ্গে তার এ ধরনের সম্পর্কের তথ্য পাওয়া গেছে। তবে ১৮ বছর বয়সী রহমতের মনে বিষয়টি মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। তিনি তার কষ্টের কথা কাউকে বলতেও পারেননি। আবার অর্থ সংকটে থাকায় আলমের দেওয়া টাকারও প্রয়োজন ছিল তার।

এ কারণে তাকে ঠেকানোর উপায় খুঁজে পাচ্ছিলেন না। এই অসহায়ত্বের একপর্যায়ে তিনি মুক্তির পথ হিসেবে আলমকে 'চরম শাস্তি' দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। ডিসেম্বরের প্রথম সপ্তাহে এই সিদ্ধান্ত নেওয়ার পর সুযোগের অপেক্ষায় ছিলেন রহমত।

তদন্ত সূত্র জানায়, ঘটনার দিন রাত সাড়ে ১১টার দিকে আলমের বাসায় যান রহমত। সেখানে দু'জনে একসঙ্গে সময় কাটানোর পর আলম ঘুমিয়ে পড়েন। ভোর ৪টার দিকে রহমত রান্নাঘর থেকে ছুরি নিয়ে ঘুমন্ত আলমের পিঠে আঘাত করেন। আলম জেগে উঠে সরে যাওয়ার চেষ্টা করলে দু'জনের মধ্যে ধস্তাধস্তি হয়। একপর্যায়ে মাথায় আঘাতপ্রাপ্ত হয়ে তিনি খাটের ওপর পড়ে যান। তখন তার মুখে বালিশচাপা দিয়ে মৃত্যু নিশ্চিত করেন রহমত। পরে হত্যায় ব্যবহূত ছুরিটি বিছানার নিচে লুকিয়ে রেখে বাথরুমে গিয়ে শরীরের রক্ত ধুয়ে ফেলেন। এরপর অন্য জামা-প্যান্ট পরে ঘরের দরজায় তালা ঝুলিয়ে তিনি পালিয়ে যান। পরে পুলিশ ঘটনাস্থল থেকে হত্যায় ব্যবহূত ছুরিটি উদ্ধার করে।

পুলিশ জানায়, হত্যায় শুধু রহমতের জড়িত থাকার তথ্যই মিলেছে। তিনি ভাসানটেক এলাকায় থাকতেন। মাঝেমধ্যে মাটি কাটার শ্রমিক হিসেবে কাজ করতেন। আদালতে জবানবন্দি দেওয়ার পর তাকে কারাগারে পাঠানো হয়েছে।