দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী ৬৫ বছরের আবদুল জব্বারের চোখে এখন আশার ঝলক। মুজিববর্ষে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উপহার সুদৃশ্য পাকা ঘর পাচ্ছেন তিনি। সেখানে স্ত্রী দাখিলন বেগম (৬০) এবং একমাত্র ছেলে মমিনুরকে নিয়ে পরম নিশ্চিন্তে বাকি জীবন কাটাতে পারবেন জীবনসায়াহ্নে পৌঁছানো এই বৃদ্ধ।

আবদুল জব্বারের পাশাপাশি আরেক দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী ফজলে হক (৩৫) ও তার স্ত্রী মিনারা বেগমেরও (২৬) ঠাঁই মিলেছে রংপুরের তারাগঞ্জ উপজেলার সয়ার ইউনিয়নের ফরিদাবাদ গ্রামে ভূমিহীন ও গৃহহীনদের জন্য গড়ে তোলা নিবাসে। 'মুজিববর্ষে একটি মানুষও গৃহহীন থাকবে না'- প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার এ প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে ফরিদাবাদের ৪৩৩ শতক (৪ দশমিক ৩৩ একর) খাসজমিতে প্রতিষ্ঠিত এই নিবাসে ঘর পাচ্ছে ৯০টি ভূমিহীন ও গৃহহীন পরিবার। দুই কক্ষের সুদৃশ্য বাড়ির পাশাপাশি দুই শতক জমিও তুলে দেওয়া হবে এসব পরিবারের কাছে। যার মধ্যে ২০টি পরিবারকে আগামীকাল শনিবার ঘর ও জমি তুলে দেওয়া হবে। ওই দিনই মুজিববর্ষে ভূমিহীন ও গৃহহীন ৬৬ হাজার ১৮৯টি পরিবারের মধ্যে গৃহ ও জমি হস্তান্তর কার্যক্রমের উদ্বোধন করবেন প্রধানমন্ত্রী।

৩০ বছরের বেশি সময় ধরে স্ত্রীকে নিয়ে গ্রামে গ্রামে ভিক্ষা করে জীবিকা নির্বাহ করে আসছিলেন দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী আবদুল জব্বার। ছেলে মমিনুর ধান মাড়াই শ্রমিক হিসেবে কাজ করে যৎসামান্য আয় করছিল; তা দিয়ে তিনজনের এ পরিবারের ভরণপোষণ মেটানোই দায় ছিল। তার ওপর সয়ার কুটিপাড়া গ্রামের খালপাড়ে জরাজীর্ণ যে চালাঘরে তাদের বসবাস, সেটাও জরাজীর্ণ অবস্থায় চলে গিয়েছিল। ঝড়-বৃষ্টিতে ঘরের মধ্যেই পানি জমে একাকার হয়ে যেত। এখন শেখ হাসিনার উপহার পাকা গৃহ পেয়ে দুর্ভোগের দিনের অবসান ঘটেছে জব্বারের। সমকালকে এ অভিব্যক্তিই তিনি জানালেন- 'শেখের বেটি আমাদের ঘর দিয়েছেন। এ জন্য মনে অনেক আনন্দ। দোয়া করি, তিনি হাজার বছর বেঁচে থাকুন; আমাদের মতো গরিব-দুঃখীর সেবা করে যান।'

দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী ফজলে হক জানালেন, গত পাঁচ বছর ধরে স্ত্রীকে নিয়ে ইউনিয়ন পরিষদের একটি পরিত্যক্ত কৃষি ভবনে তার বসবাস ছিল। তিনি নিজে যেমন চোখে দেখেন না, তেমনি তার একমাত্র মেয়ে ৩ বছর বয়সী ফারিহাও শারীরিক প্রতিবন্ধী। অপুষ্টির কারণে তার পা বাঁকা হয়ে গেছে। নিজেদের তৈরি পিঠা ও রুটি বিক্রি করে জীবিকা নির্বাহ হতো তাদের। এখন পাকা ঘর পেয়ে দুঃখের দিনের অবসানের প্রতীক্ষায় তারা।

সয়ার ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান এসএম মহিউদ্দিন আজম জানালেন আরেকটি চমকপ্রদ তথ্য। তার ভাষায়, প্রায় ৬৫ বছর ধরে স্থানীয় প্রভাবশালী মহলের দখলে ছিল সরকারের এই ৪৩৩ শতক খাসজমি। এসব জমিই দখলমুক্ত করে ভূমিহীন ও গৃহহীন পরিবারের মধ্যে বিতরণ ও ঘর করে দেওয়া হয়েছে। মোট ৭ একর খাসজমি অবমুক্ত করে পর্যায়ক্রমে ২০০ পরিবারকে ঘর ও জমি দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের।

তারাগঞ্জ উপজেলার এই ২০০ পরিবার ছাড়াও গঙ্গাচড়া উপজেলার ১০০ পরিবারকে দেওয়া হচ্ছে ঘর ও জমি। এর মধ্যে নৌহালী ইউনিয়নের পূর্ব কচুয়া গ্রামের প্রস্তাবিত 'স্বর্ণালী নিবাস'-এ ঘর ও জমি পাচ্ছে মুচি, নাপিতসহ নিম্নবর্ণের ১৫টি ভূমি ও গৃহহীন পরিবার। এখানে ঠাঁই পাওয়া

বিন্দু কুমার মহন্তের স্ত্রী তৃপ্তি রানী মহন্ত, কৃষ্ণ

মহন্তের স্ত্রী অঞ্জলি রানী এবং নির্মল চন্দ্রের স্ত্রী ময়না রানীসহ সবাই অভিন্ন ভাষায় বললেন, এতদিন তাদের ঘর ছিল না অথবা ঘর থাকলেও খড়ের বেড়ার ঘরগুলো বসবাসের অনুপযোগী ছিল। এখন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তাদের জমি দিয়েছেন; থাকার জন্য ঘরও করে দিয়েছেন। তারা এখন অনেক খুশি।

সরেজমিন জানা গেল, গৃহহীন ও ভূমিহীনদের স্থায়ী ঠিকানা দেওয়ার লক্ষ্যে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের আশ্রয়ণ-২ প্রকল্পের প্রথম পর্যায়ে যে ৬৬ হাজার ১৮৯টি একক গৃহ হস্তান্তর করা হবে, তার প্রতিটি একই নকশায় নির্মিত। নীল, লাল ও সবুজ টিনশেডের প্রতিটি গৃহে ইটের দেয়াল, কংক্রিটের মেঝে এবং টিনের ছাউনি দিয়ে তৈরি দুটি করে শোয়ার ঘর, একটি রান্নাঘর, টয়লেট এবং সামনে খোলা বারান্দা থাকবে। গৃহপ্রতি ১ লাখ ৭১ হাজার টাকা ব্যয় করা হয়েছে। এ হিসাবে গৃহহীনদের জন্য প্রাথমিক পর্যায়ে ১ হাজার ১৬৮ কোটি ৭১ লাখ টাকা খরচ করা হয়েছে।

রংপুরের জেলা প্রশাসক আসিফ আহসান জানান, এ প্রকল্পের আওতায় রংপুরের আটটি উপজেলার এক হাজার ২৭৩টি ভূমিহীন ও গৃহহীন পরিবারের মধ্যে ঘর ও জমি তুলে দেওয়ার পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে শনিবার প্রধানমন্ত্রীর উদ্বোধনের দিন ৮১৯টি পরিবারের মধ্যে গৃহ ও জমি হস্তান্তর করা হবে। বাকিদের আগামী ফেব্রুয়ারি মাসের মধ্যেই স্থায়ী ঠিকানায় তুলে দিতে পারবেন বলে আশা করছেন তারা।

গঙ্গাচড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা তাসলীমা বেগম বলেন, এত বিপুল সংখ্যক গরিব ও অসহায় মানুষকে একসঙ্গে আশ্রয়ণের মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মানবতার কল্যাণে বিরল এক দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। এ মানবিক কর্মযজ্ঞে যুক্ত থাকতে পারার সৌভাগ্য তাদের জন্যও চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে।

মন্তব্য করুন