করোনাভাইরাস মহামারির কারণে দেশে সার্বিক দারিদ্র্যের হার বেড়ে ৪২ শতাংশ হয়েছে, যা কভিডের আগের হারের প্রায় দ্বিগুণ। গ্রামে ও শহরে একই হারে দারিদ্র্য বেড়েছে। দারিদ্র্যের পাশাপাশি সমাজে বৈষম্যও বেড়েছে। অন্যদিকে কর্মসংস্থানের ওপর বিরূপ প্রভাব পড়েছে। গবেষণা প্রতিষ্ঠান সানেমের সাম্প্রতিক এক জরিপে এসব তথ্য উঠে এসেছে।

গতকাল শনিবার বাংলাদেশে দারিদ্র্য ও জীবিকার ওপর কভিড-১৯ মহামারির প্রভাব নিয়ে সানেমের দেশব্যাপী সমীক্ষার ফলাফল প্রকাশ করা হয়। ভার্চুয়াল প্ল্যাটফরমে আয়োজিত অনুষ্ঠানে গবেষণার তথ্য তুলে ধরেন সানেমের নির্বাহী পরিচালক ড. সেলিম রায়হান। তিনি জানান, ২০১৮ সালে পরিকল্পনা কমিশনের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগের (জিইডি) সঙ্গে যৌথভাবে ৬৪ জেলার ১০ হাজার ৫০০ খানার ওপর জরিপ হয়। এর মধ্যে গত বছরের ২ নভেম্বর থেকে ১৭ ডিসেম্বর পর্যন্ত পাঁচ হাজার ৫৭৭টি খানার ওপর টেলিফোনে জরিপ করেছে সানেম। কভিডের আগের সঙ্গে দারিদ্র্য, বৈষম্য ও কর্মসংস্থান পরিস্থিতির তুলনা করতে এ জরিপ করা হয়।

গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়, করোনার প্রভাবে দরিদ্র মানুষের সব ধরনের ব্যয় করার ক্ষমতা কমেছে। তবে আয়ের সিংহভাগ খাদ্য কিনতে ব্যয় করার প্রবণতা দেখা গেছে। নতুন করে দারিদ্র্যসীমায় নেমে আসা মানুষ নিজে থেকে অর্থনৈতিক অবস্থার পরিবর্তন করতে পারবে কিনা, তা নিয়ে সংশয় আছে। তাছাড়া সার্বিক রেমিট্যান্স আয় বাড়লেও জরিপে অংশ নেওয়া পরিবারগুলো জানিয়েছে, আগের বছরগুলোর তুলনায় গত বছর বিদেশে থাকা স্বজনরা কম টাকা পাঠিয়েছেন।

জরিপের তথ্য অনুযায়ী দেশে সার্বিক দারিদ্র্যের হার বেড়ে ৪২ শতাংশে উন্নীত হয়েছে। ২০১৮ সালে জিইডি ও সানেমের জরিপে এ হার ছিল ২১ দশমিক ৬০ শতাংশ। ২০১৬ সালে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর খানা জরিপে দারিদ্র্যের হার ছিল ২৪ দশমিক ৩০ শতাংশ। বিবিএসের খানা জরিপে ২০১৬ সালে গ্রামাঞ্চলে দরিদ্র মানুষ ছিল ২৬ দশমিক ৪০ শতাংশ। ২০১৮ সালের জিইডি-সানেম জরিপে ছিল ২৪ দশমিক ৫০ শতাংশ। সানেমের সর্বশেষ জরিপে তা বেড়ে ৪৫ দশমিক ৩০ শতাংশে উন্নীত হয়েছে। শহরাঞ্চলে সার্বিক দারিদ্র্যের হার ২০১৬ সালে ছিল ১৮ দশমিক ৯০ শতাংশ। ২০১৮ সালে ছিল ১৬ দশমিক ৩০ শতাংশ। করোনা মহামারির প্রেক্ষাপটে বেড়ে হয়েছে ৩৫ দশমিক ৪০ শতাংশ।

সেলিম রায়হান আরও জানান, অতি দারিদ্র্যের হার বেড়ে সাড়ে ২৮ শতাংশ। ২০১৮ সালে জিইডি-সানেমের জরিপে যা ছিল ৯ দশমিক ৪০ শতাংশ। গ্রামাঞ্চলে চরম দারিদ্র্যের হার ২০১৮ সালে ১১ দশমিক ২০ শতাংশ ছিল, যা বেড়ে হয়েছে ৩৩ দশমিক ২০ শতাংশ। শহরাঞ্চলে চরম দারিদ্র্যের হার ৬ দশমিক ১০ শতাংশ থেকে বেড়ে হয়েছে ১৯ শতাংশ। জরিপের তথ্য তুলে ধরে সেলিম রায়হান জানান, ২০১৮ এবং ২০২০ সালের মধ্যে মাথাপিছু শিক্ষা ব্যয় কমেছে। অতি দরিদ্র পরিবারে এ হার কমেছে সবচেয়ে বেশি ৫৮ শতাংশ। অন্যদিকে মাথাপিছু স্বাস্থ্য ব্যয় বেড়েছে। জরিপে ফল পর্যালোচনায় দেখা গেছে, মহামারির সময়ে সংকট মোকাবিলায় দরিদ্র মানুষ ঋণ নেওয়া, খাদ্য ব্যয় কামানো, সঞ্চয় ভেঙে ফেলাসহ বিভিন্ন কৌশল অবলম্বন করেছে। জরিপের চমকপ্রদ তথ্য হলো- করোনাকালীন দেশে বৈধ পথে রেমিট্যান্স আয় বাড়লেও পারিবারিক পর্যায়ে অভিবাসী সদস্যদের কাছ থেকে প্রাপ্ত অর্থের পরিমাণ কমেছে। জরিপে অংশ নেওয়া ৮২ শতাংশ পরিবারের দাবি, তারা বিদেশ থেকে রেমিট্যান্স কম পেয়েছেন। এ বৈপরীত্যের সম্ভাব্য ব্যাখ্যা হলো- মহামারির আগে অনানুষ্ঠানিক চ্যানেলের মাধ্যমে প্রচুর পরিমাণে রেমিট্যান্স আসছিল। যেহেতু এ চ্যানেল বন্ধ হয়েছে, তাই পরিবারগুলো আগের তুলনায় কম অর্থ পেয়েছে।

আলোচনায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের চেয়ারম্যান ড. এম এম আকাশ বলেন, কভিডের কারণে যে ক্ষতি হলো তাতে স্বল্পমেয়াদি না দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পড়ল, তা ব্যাখ্যার বিষয়। এটি নির্ভর করবে ক্ষতির ধরন কেমন, কোন খাত কতটুকু ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং সরকার যে জরুরি পদক্ষেপ নিয়েছে, তা কতটুকু পর্যাপ্ত তার ওপর। দেশের সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত জনগোষ্ঠীর অবস্থা পরিবর্তনের জন্য শিক্ষা খাত যত দ্রুত সম্ভব চালু করতে হবে, স্বাস্থ্য খাতে ভর্তুকি দিতে হবে এবং কর্মসংস্থানের পরিবর্তন স্বীকার করে ব্যবস্থা নিতে হবে।

সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন বলেন, হারানো পুনোরুদ্ধারে এবং নতুন কর্মসংস্থান তৈরিতে বেশ কয়েক বছর লেগে যাবে। তার ওপর প্রযুক্তির আগ্রাসনের ফলে বহু কর্মসংস্থান বিলীন হয়ে যাবে এবং অনেক মানুষ কর্মহীন হয়ে পড়বে। সরকারি বিনিয়োগের মাধ্যমে অর্থনীতিকে চাঙ্গা করে তোলার প্রয়োজন ছিল- যেন দরিদ্রের হাতে অর্থ যায় এবং সেই অর্থ দিয়ে তারা বাজারে গিয়ে পণ্য কিনতে পারে।

অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন বলেন, এ জরিপের তথ্য বলছে, দারিদ্র্যের ভৌগোলিক আওতা ছড়িয়ে পড়েছে। গ্রামে যে হারে দারিদ্র্য বেড়েছে, শহরেও একই হারে বেড়েছে। আবার যেখানে আগে দারিদ্র্য কম ছিল, সেখানেও ব্যাপক বেড়েছে, যেখানে বেশি ছিল সেখানেও ব্যাপক বেড়েছে। সানেমের গবেষণা পরিচালক ড. সায়মা হক বিদিশা বলেন, একটি বিশাল সংখ্যক মানুষ আছে, যারা দারিদ্র্যসীমার ওপরে ছিলেন, তারা কভিডের আঘাতে এ সীমার নিচে নেমে আসার ঝুঁকিতে আছেন।

মন্তব্য করুন