এবার ডুবে থাকা জাহাজের সার্ভে

নথিপত্রসহ সার্ভেয়ারকে আজ ঢাকায় তলব

প্রকাশ: ২২ ফেব্রুয়ারি ২০২১

অমরেশ রায়

এবার ডুবে থাকা জাহাজের সার্ভে

ছবি: ফাইল

বাসায় ও বিদেশে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় জাহাজের ভৌতিক সার্ভে ও রেজিস্ট্রেশনের (ফিটনেস পরীক্ষা) পর এবার মিলেছে ডুবে থাকা জাহাজের সার্ভে করার চাঞ্চল্যকর খবর। নৌপরিবহন অধিদপ্তরের নারায়ণগঞ্জ কার্যালয়ের 'ইঞ্জিনিয়ার অ্যান্ড শিপ সার্ভেয়ার' শাহরিয়ার হোসেন গত জানুয়ারি মাসে 'এমভি নিউ গোলাম রহমান (এম- ৭২৪১)' নামের একটি ডুবে থাকা কার্গো জাহাজ (মালবাহী) সাময়িক চলাচলের অনুমতি দিয়ে টোকেন (অস্থায়ী ফিটনেস সনদ) ইস্যু করেছেন।

২০১৮ সালে দুর্ঘটনাকবলিত হয়ে চাঁদপুরের কাছে মেঘনায় ইউনূস মিয়ার মালিকানাধীন এই জাহাজটি ডুবে যায়। এখনও তা উত্তোলন করা সম্ভব হয়নি। এমন প্রেক্ষাপটে এই জাহাজের সার্ভে ও টোকেন ইস্যুর খবরে সংশ্নিষ্ট মহলে তোলপাড় শুরু হয়েছে। সংশ্নিষ্ট নথিপত্রসহ শিপ সার্ভেয়ার শাহরিয়ার হোসেনকে আজ সোমবার ঢাকায় নৌপরিবহন অধিদপ্তরের প্রধান কার্যালয়ে তলব করা হয়েছে। চাঞ্চল্যকর খবরটি এমন সময়ে ফাঁস হলো, যখন দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) সিদ্ধান্তে নারায়ণগঞ্জের শিপ সার্ভেয়ারের বিরুদ্ধে নৌযান সার্ভে ও রেজিস্ট্রেশনে অনিয়মের তদন্ত চলছে।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, নজিরবিহীন এই দুর্নীতি-অপকর্মে জাহাজটির মালিক ইউনূস মিয়া ও নৌ অধিদপ্তরের নারায়ণগঞ্জের সার্ভেয়ার শাহরিয়ার হোসেন ছাড়াও অধিদপ্তরের মাওয়া ও মেঘনা অঞ্চলের দায়িত্বপ্রাপ্ত পরিদর্শক আমির হোসেন এবং অবসরে যাওয়া এক সার্ভেয়ার ও তার অনুগত এক দালাল জড়িত রয়েছেন। এতে মোটা অঙ্কের অর্থ লেনদেন হয়েছে। এ অপকর্মের তথ্য ফাঁস হওয়ার পর প্রধান কার্যালয়ে তলবের সংবাদ পেয়ে সংশ্নিষ্ট সার্ভেয়ার গত ১৮ ফেব্রুয়ারি অদৃশ্য  ওই জাহাজের টোকেন বাতিল করেছেন বলেও শোনা যাচ্ছে। যদিও বিদ্যমান আইনে টোকেন বাতিল করার ক্ষমতা তার নেই।

চলতি বছরের গত জানুয়ারি মাসে নারায়ণগঞ্জ শিপ সার্ভেয়ারের কার্যালয় থেকে 'এমভি নিউ গোলাম রহমান' নামের কার্গো জাহাজের অনুকূলে সার্ভে টোকেন ইস্যু করে ৪৫ দিন চলাচলের অনুমতি দেওয়া হয়। কার্গো জাহাজ মালিক সমিতির নেতৃত্ব নির্বাচনকে সামনে রেখে মালিক ইউনূস মিয়া সমিতির সদস্যপদ বহাল ও ভোটাধিকার নিশ্চিত রাখতে ডুবে থাকা জাহাজটিকে সচল দেখাতে বার্ষিক সার্ভের জন্য তৎপর হয়ে ওঠেন।

প্রথা অনুযায়ী, কোনো জাহাজের ফিটনেস পরীক্ষার জন্য মালিক বা তার প্রতিনিধি আবেদন করলে সংশ্নিষ্ট সার্ভেয়ার এবং অধিদপ্তরের ওই অঞ্চলের পরিদর্শক সেটি সরেজমিন পরিদর্শন করেন। সার্ভেয়ার যদি মনে করেন, জাহাজটি চলাচলের যোগ্য তাহলে সার্ভে সনদ জারির আগে সর্বোচ্চ ৪৫ দিন চলাচলের অনুমতি দিয়ে একটি টোকেন ইস্যু করতে পারেন।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, দীর্ঘদিন ধরে একটি দুষ্টচক্র দুর্ঘটনায় ডুবে থাকা বা চলাচলের অযোগ্য হয়ে পড়া অথবা ডকইয়ার্ডে নির্মাণাধীন জাহাজ সার্ভে ও রেজিস্ট্রেশন কাজে দালালি করে আসছে। অস্তিত্বহীন এ ধরনের জাহাজ সার্ভে ও রেজিস্ট্রেশনের পেছনে মালিকপক্ষের প্রধান তিনটি স্বার্থ কাজ করে। এগুলো হচ্ছে- মালিক সমিতির সদস্যপদ ও সমিতির নির্বাচনে ভোটাধিকার নিশ্চিত করা; মোটা অঙ্কের নতুন ব্যাংকঋণ নেওয়া কিংবা আগে নেওয়া ব্যাংকঋণ পুনঃতফসিল করা এবং দুর্ঘটনার পর জাহাজ মেরামত বা উত্তোলন না করে কাগজ-কলমে এ খাতে ব্যয় দেখিয়ে বীমা কোম্পানির কাছ থেকে মোটা অঙ্কের টাকা আদায় করা। প্রতিটি ক্ষেত্রেই জাহাজের রেজিস্ট্রেশন সনদের পাশাপাশি হালনাগাদ সার্ভে সনদ বাধ্যতামূলক।

এই দালালচক্রের সঙ্গে একাধিক শিপ সার্ভেয়ার ও পরিদর্শকসহ অধিদপ্তরের আরও কয়েকজন কর্মকর্তা ও কর্মচারীর গভীর সখ্য রয়েছে। অধিদপ্তরের সাবেক এক সার্ভেয়ার ও দুদকের হাতে টাকাসহ গ্রেপ্তারের পর বরখাস্ত হওয়া আরেক কর্মকর্তাও এসব কাজে জড়িত। মালিকপক্ষ 'এমভি নিউ গোলাম রহমান' জাহাজটি সার্ভের জন্য নৌ অধিদপ্তরের পরিদর্শক আমির হোসেনের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। এই কাজ সম্পন্ন করতে তাদের মধ্যে ১০ লাখ টাকা চুক্তি হয় বলেও গুঞ্জন রয়েছে। এর পর পরিদর্শক আমির হোসেন একজন দালালকে দিয়ে সাবেক এক সার্ভেয়ারের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। সাবেক সেই সার্ভেয়ার কথা বলেন নারায়ণগঞ্জের বর্তমান সার্ভেয়ার শাহরিয়ার হোসেনের সঙ্গে। এভাবে পরস্পর যোগসাজশে একটি ভৌতিক জাহাজকে অস্থায়ী ফিটনেস সনদ (টোকেন) দেওয়া হয়।

অভিযোগ, ডুবে থাকা জাহাজটির বিষয়ে সবকিছু জেনেশুনেও টোকেনে স্বাক্ষর করেন নারায়ণগঞ্জের সার্ভেয়ার শাহরিয়ার হোসেন। তার বিরুদ্ধে আগে থেকেই অভ্যন্তরীণ নৌযান সার্ভে (ফিটনেস পরীক্ষা) ও রেজিস্ট্রেশনে অনিয়ম-দুর্নীতি ও অব্যবস্থাপনার নানা অভিযোগ রয়েছে। অফিসে না গিয়ে ও বাসায় বসে মোটা অঙ্কের অর্থের বিনিময়ে জাহাজের সার্ভে ও রেজিস্ট্রেশন করার অভিযোগ এর মধ্যে অন্যতম। দুদকের সিদ্ধান্তে খোদ নৌ অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলীর নেতৃত্বে গঠিত একটি কমিটি ইতোমধ্যে এসব অনিয়ম বিষয়ে তদন্ত কার্যক্রম শুরু করেছে। বিষয়টি জানাজানির পর জাহাজ মালিকদের মধ্যে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। এ ছাড়া নৌপরিবহন অধিদপ্তরের গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ সংস্থা নৌবাণিজ্য দপ্তরের সাবেক মুখ্য কর্মকর্তা (পিও) শফিকুল ইসলামের বিরুদ্ধে বিদেশে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় কাগজে-কলমে দেশে জাহাজ পরিদর্শন দেখিয়ে সুপারভিশন ফি ও রেজিস্ট্রেশন ফি আদায় করে নেওয়ার অভিযোগ নিয়েও তদন্ত চলছে।

এ বিষয়ে কথা বলার জন্য ইঞ্জিনিয়ার ও শিপ সার্ভেয়ার শাহরিয়ার হোসেনের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলেও তিনি ফোন ধরেননি। এর আগেও কয়েকবার তার বিরুদ্ধে ওঠা নৌযান সার্ভে (ফিটনেস পরীক্ষা) ও রেজিস্ট্রেশনে অনিয়ম-দুর্নীতি ও অব্যবস্থাপনার নানা অভিযোগ নিয়ে কথা বলতে গেলে সাংবাদিক পরিচয় পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ফোন কেটে দিয়েছিলেন তিনি।

পরিদর্শক আমির হোসেন তার বিরুদ্ধে আনা সব অভিযোগ অস্বীকার করে সমকালকে বলেন, 'জাহাজ সার্ভে করেন সার্ভেয়ার। আমি তো আর সার্ভেয়ার নই যে, জাহাজ সার্ভে করে আবার টোকেনও দেব!' মোটা অঙ্কের অর্থের বিনিময়ে ডুবে থাকা জাহাজ 'এমভি নিউ গোলাম রহমানের' সার্ভে করার জন্য এর মালিকের সঙ্গে সংশ্নিষ্ট সার্ভেয়ারকে যোগাযোগ করিয়ে দেওয়ার অভিযোগ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এই অভিযোগও সঠিক নয়। কেননা, ওই মালিককে তিনি চেনেনও না।