ডাকাতিতে 'ভদ্র' গ্রুপ

প্রকাশ: ২৪ ফেব্রুয়ারি ২০২১

ইন্দ্রজিৎ সরকার

রাতের অন্ধকারে কোনো বাসায় ঢুকে সবাইকে অস্ত্রের মুখে জিম্মি করে স্বর্ণালংকার, নগদ টাকাসহ মূল্যবান জিনিস লুট করাই তাদের কাজ। সহজ কথায়, তারা দুর্ধর্ষ ডাকাত। এর পরও অপরাধ জগতে তাদের পরিচিতি 'ভদ্র গ্রুপ' হিসেবে। কারণ দলের সদস্যদের বড় অংশই শিক্ষিত। তারা ভদ্রলোকের মতো সুন্দর করে কথা বলে। নম্র-মার্জিত তাদের ব্যবহার। তাদের সহযোগী হিসেবে অবশ্য একদল পেশাদার ডাকাতই কাজ করে। এ চক্রটি গত চার মাসে রাজধানীতে অন্তত ছয়টি স্থানে ডাকাতির উদ্দেশ্যে হানা দিয়েছে। তারা লুট করেছে ২২৯ ভরি স্বর্ণ, নগদ অর্থসহ অন্তত এক কোটি ৮৫ লাখ ৯২ হাজার টাকার মালপত্র। এরই মধ্যে চক্রটিকে শনাক্ত করা হয়েছে। গোয়েন্দা জালে রয়েছে চক্রের হোতা হৃদয়।

ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) তেজগাঁও জোনাল টিমের অতিরিক্ত উপকমিশনার শাহাদত হোসেন সুমা সমকালকে বলেন, ডাকাতিতে জড়িত একটি চক্রের পাঁচজনকে গ্রেপ্তারের পর জিজ্ঞাসাবাদে অপর সদস্যদের বিষয়ে তথ্য পাওয়া যায়। সেসব তথ্য যাচাই-বাছাই করে ডাকাতদের অবস্থান শনাক্ত করার চেষ্টা চলছে।

ডিবি সূত্রে জানা যায়, হাতিরঝিল থানার দুটি ডাকাতির মামলায় ১৯ ফেব্রুয়ারি মোর্শেদ ওরফে হাড্ডি মোর্শেদ, জাহিদ শেখ, আরমান হোসেন, কবির হোসেন মনা ও রাসেলকে গ্রেপ্তার করা হয়। তারা সবাই পেশাদার ডাকাত। রাসেল ছাড়া বাকিদের বিরুদ্ধে একাধিক মামলা রয়েছে। দলনেতা মোর্শেদ পাঁচ বছর আগে শাহজাহানপুর থানার একটি ডাকাতির মামলায় গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে যায়। সেখানে যাত্রাবাড়ী থানার ডাকাতি মামলার আসামি হৃদয়ের সঙ্গে তার পরিচয় হয়। হৃদয়ও একটি ডাকাত দলের প্রধান। পরে কারাগার থেকে বেরিয়ে তারা একসঙ্গে কাজ শুরু করে। তখন থেকেই মূলত হৃদয় সমন্বিত ডাকাত দলটির নেতৃত্ব দিতে শুরু করে। ডাকাতির ব্যাপারে তথ্য সংগ্রহ, টার্গেট বাসা নির্ধারণ, রেকি করাসহ পুরো পরিকল্পনার দায়িত্ব তার। সব ঠিক হয়ে গেলে সে মোর্শেদকে জানায়, এবার কাজে নামতে হবে।

যেভাবে ডাকাতি করে ওরা :তদন্ত-সংশ্নিষ্টরা জানান, ডাকাতির রাতে সাধারণত সুবিধাজনক স্থানে নির্দিষ্ট সময়ে সবাইকে আসতে বলে হৃদয়। এরপর সে তার পরিকল্পনা অনুযায়ী সবাইকে নিয়ে টার্গেট করা বাড়িতে যায়। কীভাবে ঢুকতে ও বের হতে হবে, বেরিয়ে সবাই কোথায় একত্রিত হবে, ধরা পড়লে কী করতে হবে সব বুঝিয়ে দেওয়া হয়। পুরো বিষয়টি এত সুচারুভাবে সম্পন্ন হয় যে, ডাকাতিতে অংশ নিয়েও অন্যরা পরে বলতে পারে না কোন বাসায় তারা হানা দিয়েছিল। এতে দলের একজন ধরা পড়লেও তার কাছ থেকে বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যায় না। সেই সঙ্গে তারা একজন অন্যজনের সম্পর্কে কোনো তথ্য জানার চেষ্টা করে না। ডাকাতির সময় একসঙ্গে কাজ করলেও তারা জানে না কে কোথায় থাকে। এমনকি ছদ্মনামেও তারা পরস্পরের সঙ্গে পরিচিত হয়। এ কৌশল সাধারণত উগ্রপন্থিরা ব্যবহার করে থাকে।

৪ মাসে ৬ ডাকাতি :গত বছরের ২০ অক্টোবর থেকে চলতি বছরের ৭ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ছয়টি স্থানে হানা দিয়েছে এই ডাকাত দল। সর্বশেষ ৭ ফেব্রুয়ারি তারা বড় মগবাজারের ভদ্র গলি এলাকার এক বাসায় ডাকাতিতে ব্যর্থ হয়ে পরিবারের সদস্যদের কোপায়। জানুয়ারিতে লালমাটিয়ায় এক বাসা থেকে ২০ হাজার টাকা লুট করে। এ ছাড়া ২৮ ডিসেম্বর পান্থপথে ৪৫ ভরি স্বর্ণ ও নগদ ৩৪ লাখ টাকা, ২০ ডিসেম্বর মগবাজারের দিলু রোডে ৩৭ ভরি স্বর্ণ ও ২৫ লাখ টাকা, ৮ ডিসেম্বর হাতিরঝিলের মীরবাগে ৫৯ ভরি স্বর্ণ, একটি রিভলবার ও অর্ধশত রাউন্ড গুলি এবং ২০ অক্টোবর হাতিরঝিলের বিশাল সেন্টারের পেছনের একটি বাসা থেকে ৮৮ ভরি স্বর্ণ ও আড়াই লাখ টাকা লুট করে চক্রটি।

ডাকাত দলের ইতিবৃত্ত :ডিবির এক কর্মকর্তা জানান, সমন্বিত ডাকাত দলটির সদস্য সংখ্যা প্রায় ২০ জন। এর মধ্যে ১১ জনই সরাসরি হৃদয়ের সহযোগী। তারা বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বর্তমান অথবা সাবেক শিক্ষার্থী। আর বাকিরা মোর্শেদের লোক। মোর্শেদের গ্রামের বাড়ি কুমিল্লার মুরাদনগরে। ১০-১১ বছর বয়সেই সে বাড়ি ছাড়ে। আশ্রয় নেয় কমলাপুর রেলস্টেশনে। তখন থেকেই শুরু করে ছোটখাটো চুরি-ছিনতাই। ধীরে ধীরে নিজের দল গড়ে নেমে পড়ে ডাকাতিতে। তারা প্রায়ই বিপুল পরিমাণ স্বর্ণালংকার ডাকাতি করে। বাজারের চেয়ে অনেকটা কম দামে তা কিনে নেয় বিল্লাল নামে একজন। সে একসময় স্বর্ণের দোকানের কর্মী ছিল। পরে সে অপরাধী চক্রের লুণ্ঠিত স্বর্ণ কেনাবেচার কাজ শুরু করে। ডাকাতদের কাছ থেকে পাওয়া স্বর্ণালংকার সে দ্রুত গলিয়ে ফেলে। এরপর আত্মীয়স্বজনের মাধ্যমে তা বিভিন্ন স্বর্ণ ব্যবসায়ীর কাছে বিক্রি করে। এদিকে ডাকাত দলের সদস্য আরমান হোসেন ও কবির হোসেন মনা ডাকাতি থেকে পাওয়া অর্থ ইয়াবা কারবারে বিনিয়োগ করে।