কোকেন মামলায় কিছুদিন পরপরই নতুন মোড়

প্রকাশ: ২৪ ফেব্রুয়ারি ২০২১

আহমেদ কুতুব, চট্টগ্রাম

কোকেন উদ্ধার মামলার এজাহার দায়ের থেকে শুরু করে তদন্ত, অধিকতর তদন্ত পর্যন্ত ঘটে গেছে নতুন নতুন ঘটনা। গোয়েন্দা পুলিশের তদন্তে বাদ পড়লেও র‌্যাবের অধিকতর তদন্তে অভিযোগপত্রভুক্ত হন প্রধান আসামি নুর মোহাম্মদ। এ মামলার এক আসামি হাইকোর্টে জামিন চাইতে গেলে ফের অধিকতর তদন্তের নির্দেশ দেন আদালত। ২০২০ সালের ৭ ডিসেম্বর চট্টগ্রাম মুখ্য মহানগর হাকিম মোহাম্মদ ওসমান গনির আদালত হাইকোর্টের নির্দেশমতো পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনকে (পিবিআই) মামলাটি ফের অধিকতর তদন্তের নির্দেশ দেন। যদিও সেই অধিকতর তদন্ত আর শেষ পর্যন্ত হয়ে ওঠেনি। রাষ্ট্রপক্ষের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে গত বছরের ১৭ ডিসেম্বর হাইকোর্টের অধিকতর তদন্তের নির্দেশ স্থগিত

করে মামলাটি ছয় মাসের মধ্যে নিষ্পত্তির নির্দেশ দেন আপিল বিভাগ। মামলায় অভিযোগ গঠনের এগারো মাস পর মঙ্গলবার ফের তিনজন আদালতে সাক্ষ্য দিয়েছেন। তারা হলেন- মো. মুছা, ফারুক হোসেন ও মনিরুল ইসলাম। তারা সবাই জব্দ তালিকার সাক্ষী।

এই তিনজন আদালতকে জানান, কোকেন আমদানি-সংক্রান্ত বিদেশ থেকে আসা ই-মেইলের কপি, নথিপত্র, কম্পিউটারের হার্ডডিস্কসহ অনেক কাগজ তাদের সামনে জব্দ করেছে পুলিশ। এসব নথি জব্দ করার সময় আসামিরাও তাদের সামনে উপস্থিত ছিলেন।

চট্টগ্রাম মহানগর পিপি অ্যাডভোকেট ফখরুদ্দিন চৌধুরী সমকালকে বলেন, কোকেন মামলায় যখন সাক্ষ্য নেওয়ার সব প্রস্তুতি সম্পন্ন করি, তখনই হঠাৎ ফের অধিকতর তদন্তের নির্দেশ পেয়ে হতভম্ব হয়ে যাই। পরে অ্যাটর্নি জেনারেল অফিসের সঙ্গে যোগাযোগ করে

আপিল করলে হাইকোর্টের ফের অধিকতর তদন্তের নির্দেশটি স্থগিত করে দেওয়া হয়। আসামিরা

প্রভাবশালী ও বিত্তশালী হওয়ায় মামলাটির শুরু থেকে এখন পর্যন্ত বিচারিক প্রক্রিয়ায় পদে পদে বাধার সম্মুখীন হতে হচ্ছে রাষ্ট্রপক্ষকে।

পিপি আরও জানান, পুলিশ তদন্ত করে প্রধান আসামি নুর মোহাম্মদকে বাদ দিয়ে অভিযোগপত্র দিলে রাষ্ট্রপক্ষ থেকে নারাজি দেওয়া হয়। শুনানি শেষে সেই মামলার অধিকতর তদন্তের জন্য র‌্যাবকে নির্দেশ দেন আদালত। র‌্যাব সুন্দরভাবে তদন্ত করে নুর মোহাম্মদসহ অপরাধের সঙ্গে জড়িত সবাইকে অভিযুক্ত করে অভিযোগপত্র দেয়। সেটি আদালত গ্রহণও করেন। পরে এক আসামি হাইকোর্টে জামিন নিতে আবেদন করেন। শুনানি শেষে হাইকোর্ট মামলাটি অধিকতর তদন্তের নির্দেশ দেন। সেই মোতাবেক চট্টগ্রাম মুখ্য মহানগর হাকিম পিবিআইকে অধিকতর তদন্ত করতে নির্দেশ দেন।

২০১৫ সালের ৭ জুন চট্টগ্রাম বন্দরে থাকা একটি কনটেইনার জব্দ করে সিলগালা করে দেয় কাস্টমসের শুল্ক্ক গোয়েন্দা অধিদপ্তর। পরে পরীক্ষা করে সেখানে কোকেনের অস্তিত্ব পাওয়া যায়। ২৮ জুন বন্দর থানায় আমদানিকারক খানজাহান আলী লিমিটেডের চেয়ারম্যান নুর মোহাম্মদ ও সোহেলকে আসামি করে মাদক আইনে একটি মামলা করে পুলিশ। পরে আদালতের নির্দেশে মামলায় চোরাচালানের ধারা যুক্ত করা হয়। মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ তদন্ত করে নুর মোহাম্মদকে বাদ দিয়ে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করে। পরে রাষ্ট্রপক্ষের বিরোধিতায় মামলাটি অধিকতর তদন্তের নির্দেশ দেন আদালত। র‌্যাব অধিকতর তদন্ত করে নুর মোহাম্মদকে অভিযুক্ত করে সম্পূরক অভিযোগপত্র দাখিল করে। ২০১৯ সালের ২৯ এপ্রিল অভিযোগ গঠনের মাধ্যমে চট্টগ্রাম মহানগর দায়রা জজ আদালতে মামলাটির বিচার শুরু হয়। পরের বছর ১৮ ফেরুয়ারি মামলার বাদী ওসমান গনির সাক্ষ্য গ্রহণের মাধ্যমে প্রথম সাক্ষ্যপর্ব শুরু হয়। ওই বছরের ৩ মার্চ আলামত জব্দ তালিকা প্রস্তুতকারী শাহাদাত হোসেন এবং ১৮ মার্চ মামলাটির সর্বশেষ দু'জন সাক্ষীর সাক্ষ্য গ্রহণ করা হয়। ১৮ মার্চ পুলিশ সদস্য বদিউর রহমান ও সাইফ পাওয়ারটেকের সুপারভাইজার জসিম উদ্দিনের সাক্ষ্য নেওয়া হয়েছিল। এরপর এক মাস ধরে সাক্ষ্য গ্রহণ

বন্ধ ছিল। এ মামলার অভিযোগপত্রে মোট ৬৭ জন

সাক্ষী রাখা হয়েছে।

সাক্ষ্য গ্রহণ শুরুর পর মামলার কারাবন্দি আসামি গোলাম মোস্তফা সোহেল জামিন চেয়ে হাইকোর্টে একটি মিস মামলা করেন। ২০১৯ সালের ৯ ডিসেম্বর হাইকোর্ট মামলাটির শুনানি শেষে অধিকতর তদন্তের আদেশ দেন। পরে রাষ্ট্রপক্ষ হাইকোর্টের আদেশের বিরুদ্ধে লিভ টু আপিল করে। একই বছরের ১৭ ডিসেম্বর আপিল বিভাগ হাইকোর্টের অধিকতর তদন্তের নির্দেশ স্থগিত করে মামলাটি ছয় মাসের মধ্যে নিষ্পত্তির নির্দেশ দেন।

২০১৯ সালে মামলার অভিযোগ গঠনের আগে পালিয়ে যায় প্রধান আসামি নুর মোহাম্মদ। তার ভাই মোস্তাক আহমেদ এবং অপর দুই আসামি লন্ডন প্রবাসী ফজলুর রহমান ও বকুল মিয়া পলাতক। বাকি ছয় আসামির মধ্যে গোলাম মোস্তফা সোহেল ও আতিকুর রহমান কারাগারে, চার আসামি জামিনে রয়েছে।