পুকুরের শহর বলে খ্যাত কুমিল্লা থেকে বিশেষ করে গত কয়েক বছর ধরে হারিয়ে যাচ্ছে চোখজুড়ানো সব দিঘি। প্রভাবশালীরা ভরাট করে চলেছেন একের পর এক জলাশয়। তবে সম্প্রতি এ ভরাটকারীদের তালিকায় যুক্ত হয়েছে সরকারি প্রতিষ্ঠান সড়ক ও জনপথ (সওজ) বিভাগের নাম।

কুমিল্লা নগরীতে সওজের জায়গায় থাকা বহু বছরের পুরোনো একটি পুকুর ভরাট করছে সরকারি এই প্রতিষ্ঠান। ভরাটের পর সেখানে সওজের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলীর জন্য বাসভবন নির্মাণ করা হবে। এরই মধ্যে পুকুরটির প্রায় ৮০ শতাংশ ভরাট হয়ে গেছে। এ নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে চরম ক্ষোভ দেখা দিয়েছে, শুরু হয়েছে বিতর্ক ও সমালোচনা।

তবে সওজ কর্তৃপক্ষের ভাষ্য, দেখতে পুকুর বা ডোবার মতো মনে হলেও দলিল ও খতিয়ানে এটা পুকুর নয়, বসতবাড়ির শ্রেণিভুক্ত। তাই এটি ভরাটের ক্ষেত্রে কোনো বাধা নেই। এদিকে পরিবেশ অধিদপ্তর ও সিটি করপোরেশন জানাচ্ছে, পুকুর ভরাটের বিষয়ে তারা কিছু জানেন না। পরিবেশ অধিদপ্তর ও স্থানীয় প্রশাসনের দাবি, এ ধরনের ঘটনার খবর পেলে তারা বাধা দিয়ে থাকেন।

বুধবার দুপুরে এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে সড়ক ও জনপথ বিভাগ কুমিল্লার নির্বাহী প্রকৌশলী ড. মোহাম্মদ আহাদ উল্লাহ সমকালকে বলেন, 'ওই জায়গাটি এক একরের। বিএস জরিপসহ সব দলিলপত্রে এটি বাড়ি। পুকুরের কথা কোথাও বলা হয়নি। অতীতে হয়তো কোনো কর্মকর্তা সেখানে নিজের উদ্যোগে এই পুকুর বা ডোবাটি তৈরি করেছিলেন।' তিনি বলেন, 'এটি ভরাট করে ভবন নির্মাণের কয়েকটি কারণও রয়েছে। ডোবাটির চারপাশের মানুষ তাদের বাড়ি নির্মাণের সময় ওঠা পাইলিংয়ের কাদামাটি ডোবাটির চারপাশে ফেলেছে। বর্জ্য ও ময়লা পানিও এখানে ফেলা হয়েছে। এসব কারণে এ পুকুরের পানি নোংরা ও বিষাক্ত হয়ে যায়। এটি পরিণত হয় মশার কারখানায়। যারা এখন ময়লা ফেলতে পারবে না, তারাই আপনাদের নানা ভুল তথ্য দিয়ে অভিযোগ করছেন। এ ক্ষেত্রে কোনো অনিয়ম হয়নি।'

বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) কুমিল্লা জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক আলী আকবর মাসুম বলেন, কাগজপত্রে যা-ই থাকুক, আমরা এটিকে পুরোনো একটি পুকুর বলেই জানি। সরকারি প্রতিষ্ঠান হিসেবে তারা কোনোভাবেই পুকুরটি ভরাট করতে পারে না। সরকারি প্রতিষ্ঠানই যদি আইনের কোনো তোয়াক্কা না করে. তা হলে সাধারণ মানুষ তো পুকুর ও জলাশয় ভরাটে আরও বেশি উৎসাহিত হবে। এর আগে তারা সড়ক নির্মাণের জন্য টমছমব্রিজ এলাকার বিশাল ড্রেনটির (কান্দিখাল) বেশিরভাগ অংশ ভরাট করেছে। তখন আমরা প্রতিবাদ করার পর বলা হয়েছিল, এ নিয়ে ঠিকাদারের সঙ্গে কথা বলে ব্যবস্থা নেবে। কিন্তু ব্যবস্থা নেওয়ার নামে আমাদের থামিয়ে দিয়ে ঠিকই তারা ভরাটের কাজ চালিয়ে গেছে। এসব ঘটনার জন্য তাদের জবাবদিহির আওতায় আনা উচিত।

পরিবেশ অধিদপ্তর কুমিল্লার উপপরিচালক শওকত আরা কলি বলেন, বিষয়টি আমাদের কেউ জানায়নি। সওজ তো সরকারি প্রতিষ্ঠান, খুব প্রয়োজন হলে সরকারি অনুমোদন নিয়ে ভরাট করতে পারত। তাদের জন্য অনুমোদন নেওয়াও সহজ ছিল। বিষয়টি খোঁজ নিয়ে দেখছি।

কুমিল্লা সিটি করপোরেশনের মেয়র মো. মনিরুল হক সাক্কু বলেন, 'এভাবে পুকুর ভরাট করা অন্যায় এবং অবৈধ। আইন সবার জন্যই সমান। আমি ঢাকায় আছি, বিষয়টি দেখতে সিটি করপোরেশনের লোক ঘটনাস্থলে পাঠাচ্ছি। সওজ কর্তৃপক্ষ আমাকে বলেছিল, তারা একটি ভবন করতে চায়। আমি তাদের পরিকল্পনা জমা দিতে বলেছিলাম। কিন্তু তারা যে পুকুর ভরাট করে সেখানে ভবন নির্মাণ করবে, সেটা তো বলেনি।'

মন্তব্য করুন