গত বছরের মার্চে দেশে করোনা সংক্রমণ শুরুর পর প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর ৭৮ দশমিক ৮ শতাংশ পরিবার আর্থিক সংকটে পড়ে। এক বছর পর এর মধ্যে ৭৮ দশমিক ৫ শতাংশই এ সংকট থেকে বের হতে পারেনি। আয়ের সঙ্গে ব্যয় সমন্বয় করতে খাদ্য গ্রহণে আপস করে চলছে এসব মানুষের জীবন। প্রতিদিনকার প্রয়োজনীয় ব্যয় মেটাতে হাতের সঞ্চয় অনেক আগেই শেষ। এখন তারা নতুন ঋণের জালে। যাদের আগে থেকেই ঋণ ছিল তাদের ঋণের পরিমাণ বেড়েছে। দশটি প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর ওপর পরিচালিত এক জরিপে এমন ফল পেয়েছে এসডিজি বাস্তবায়নে নাগরিক প্ল্যাটফর্ম।\হবৃহস্পতিবার এক ভার্চুয়াল সংবাদ সম্মেলনে জরিপের ফল তুলে ধরার পাশাপাশি অতিমারির প্রভাব মোকাবিলায় প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য মধ্যমেয়াদি পরিকল্পনা নেওয়ার সুপারিশ করেছে নাগরিক প্ল্যাটফর্ম। নতুন করে সংক্রমণ বেড়ে যাওয়ায় একটি সামাজিক সংহতি তহবিল গঠনেরও প্রস্তাব করা হয়েছে।\হসংবাদ সম্মেলনে এসডিজি বাস্তবায়নে নাগরিক প্ল্যাটফর্মের আহ্বায়ক ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, বাজেট কাঠামোর মধ্যে এক বছরের জন্য পরিকল্পনা নিয়ে এ সমস্যার সমাধান হবে না। এজন্য মধ্যমেয়াদি পরিকল্পনা প্রয়োজন। তহবিলের রূপরেখা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্বের ভিত্তিতে এ তহবিলে সরকারের পাশাপাশি করপোরেট প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তি, এমনকি বিদেশি উন্নয়ন সহযোগীদের কাছ থেকে অনুদান নেওয়া যেতে পারে। বিভিন্ন দেশে এ ধরনের তহবিল কার্যক্রম আছে। প্রান্তিক মানুষের ওপর প্রভাব সংঘটিত জাতীয় প্রভাবের চেয়ে বেশি। প্রথাগতভাবে যারা আগে বিপন্ন ছিলেন না, তারাও এখন এ কাতারে যুক্ত হয়েছেন।\হসিপিডির সম্মাননীয় ফেলো অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, প্রথম দফা লকডাউনে ক্ষতগ্রস্ত প্রান্তিক জনগোষ্ঠী অন্তত দেড় বছরের মাথায় একটা স্বাভাবিক আয়-ব্যয়ের পর্যায়ে পৌঁছাবে বলে ধারণা করা হচ্ছিল। তবে নতুন করে সংক্রমণ বৃদ্ধি ও লকডাউনের কারণে তা সম্ভব হচ্ছে না। বরং নতুন করে ঋণের ফাঁদে পড়বেন তারা।\হএ গবেষণার জ্যেষ্ঠ গবেষক ইশতিয়াক বারি মূল প্রতিবেদন উপস্থাপন করেন। ১৬০০ খানার ওপর পরিচালিত জরিপে দেখা যায়, গত বছরের মার্চের তুলনায় গেল ফেব্রুয়ারিতে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর আয় কমছে ১৫ দশমিক ৮ শতাংশ। এ সময় তাদের ব্যয় কমেছে ৮ দশমিক ১ শতাংশ। সমীক্ষার আওতায় থাকা প্রায় ৬০ দশমিক ৮ শতাংশ পরিবারকে ঋণ নিতে হয়েছিল। এ ঋণ পরিশোধে আরও অন্তত দুই বছর সময় লাগতে পারে। ১০টি প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর মধ্যে ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসায়ী, প্রতিবন্ধী, বস্তিবাসী ও চরের মানুষ বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।\হজরিপে দেখা যায়, কভিডে অন্তত ৭০ শতাংশ পরিবারে একজন করে সদস্য কাজ হারিয়েছেন। তাদের অনেকেই আবার কাজে যোগদান করলেও আগের আয়ে ফিরতে পারেনি। করোনার আগে গত বছরের মার্চের আগ পর্যন্ত পরিবারপ্রতি আয় ছিল ২০ হাজার ৩৫ টাকা। গত ফেব্রুয়ারিতে তা কমে হয় ১৬ হাজার ৮৬১ টাকা। আয় কমে যাওয়ার কারণে ব্যয় কমাতে বাধ্য হয়েছে পরিবারগুলো। কভিডের আগে যেখানে মাসিক ব্যয় ছিল ১২ হাজার ৭৪২ টাকা। সে ব্যয় গত ফেব্রুয়ারিতে ১১ হাজার ৭১১ টাকায় নামিয়ে আনতে হয়েছে। ৮১ শতাংশ পরিবার খাদ্য ব্যয় কমিয়েছে। খাদ্যবহির্ভূত ব্যয় কমিয়েছে ৬৫ শতাংশ পরিবার। ঋণ করেছে ৬১ শতাংশ পরিবার। সরকারি সহায়তা পেয়েছে মাত্র ২৪ শতাংশ পরিবার। গবাদি পশু, স্বর্ণ ও জমি বিক্রি করেও বাঁচার চেষ্টা করছে কিছু পরিবার। অন্তত ৭৫ শতাংশ প্রান্তিক পরিবারে খাদ্য এবং অর্থ সহায়তা প্রয়োজন।\হনাগরিক প্ল্যাটফর্মের বর্তমান করোনাবিষয়ক গবেষণা ও প্রচার কার্যক্রমের অংশ হিসেবে এই সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়। এ কার্যক্রমের সহযোগী প্রতিষ্ঠান হিসেবে রয়েছে- ইউএনডিপি, অ্যাকশনএইড, কানাডা ফান্ড ফর লোকাল ইনিশিয়েটিভস, সিপিডি, ক্রিশ্চিয়ান এইড বাংলাদেশ, ইকো কোঅপারেশন, প্ল্যান ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ ও ওয়াটার এইড বাংলাদেশ। সংবাদ সম্মেলনে আরও বক্তব্য দেন সিপিডির সিনিয়র রিসার্চ ফেলো তৌফিকুল ইসলাম খান।

মন্তব্য করুন