অন্য কোনো দপ্তর থেকে প্রেষণে কাউকে না এনে নিজেদের মধ্য থেকেই যোগ্যতার ভিত্তিতে পদোন্নতি ও পদায়নের দাবি তুলেছেন বহিরাগমন ও পাসপোর্ট অধিদপ্তরের (ডিআইপি) কর্মকর্তারা। মহাপরিচালক ও অতিরিক্ত মহাপরিচালক পদ পর্যন্ত না হলেও পরিচালক পদ পর্যন্ত অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের মধ্য থেকেই পদোন্নতি চান তারা। কিন্তু জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা চান, প্রেষণেই নিয়োগ হোক পরিচালকসহ গুরুত্বপূর্ণ পদগুলোতে।

এমন পরিস্থিতিতে পাসপোর্ট অধিদপ্তরের সাংগঠনিক কাঠামো পুনর্গঠন প্রক্রিয়া থেমে গেছে। জনবলের ঘাটতি নিয়ে কার্যক্রম চালাতে হচ্ছে।

সংশ্নিষ্ট সূত্র জানায়, ডিআইপির বিদ্যমান সাংগঠনিক কাঠামোতে একজন মহাপরিচালক, দু'জন অতিরিক্ত মহাপরিচালক, সাতজন পরিচালকসহ এক হাজার ১৮৪ জনবল রয়েছে। পাসপোর্ট ও ভিসা কার্যক্রম ঢেলে সাজাতে অধিদপ্তরের প্রস্তাবের পরিপ্রেক্ষিতে দুই বছর আগে নতুন করে বিভিন্ন ধরনের আরও ৯৭৭টি পদ তৈরিতে সম্মতি দেয় জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়। এসব নতুন পদে নিয়োগে বিধি তৈরির সময়ে অধিদপ্তর ও সেবা সুরক্ষা বিভাগের কর্মকর্তাদের মধ্যে দ্বিমত শুরু হয়। এ-সংক্রান্ত কমিটির বিভিন্ন বৈঠকে মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা ডিআইপিতে পরিচালকসহ বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ পদে পদোন্নতির পাশাপাশি ভিন্ন বিভাগ থেকে প্রেষণে নিয়োগের বিষয়ে মত দেন। তাতে অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা একমত না হয়ে পরিচালক পদে শতভাগ পদোন্নতির মাধ্যমে শূন্য পদ পূরণের দাবি তোলেন। এরপর নানা ফাইল চালাচালি হলেও নতুন পদে নিয়োগ বা পদায়ন হয়নি।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সুরক্ষা সেবা বিভাগের সিনিয়র সচিব মো. শহিদুজ্জামান গত ৩১ মার্চ সমকালকে বলেন, ডিআইপিতে প্রয়োজনীয় পদ সৃজন করে বিদ্যমান সাংগঠনিক কাঠামো পুনর্গঠনে একটি কমিটি কাজ করছে। তবে এটি একটি দীর্ঘ প্রক্রিয়া। আপাতত এ বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে না।

পাসপোর্ট অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা বলে আসছেন, অধিদপ্তরের সর্বোচ্চ প্রশাসনিক পদ হিসেবে অধিদপ্তরের মহাপরিচালক (ডিজি) পদটি প্রেষণে নিয়োগ দেওয়া হয়। প্রস্তাবিত চারটি অতিরিক্ত মহাপরিচালকের পদ বাস্তবায়নেও ওই পদগুলোতে প্রয়োজনে প্রেষণে নিয়োগ দেওয়া যেতে পারে। কিন্তু পরিচালক থেকে নিচের পদগুলোতে অন্য বিভাগ থেকে প্রেষণে নিয়োগ ও পদায়ন করলে অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের মধ্যে পদোন্নতিজটের সৃষ্টি হবে। যোগ্যতা থাকার পরও পরিচালক পদে পদায়ন পাবেন না অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা। এতে হতাশা বাড়বে এবং সেবা কার্যক্রমেও এর প্রভাব পড়তে পারে। এসব আশঙ্কা থেকেই তারা পরিচালক পর্যন্ত অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের মধ্য থেকে যোগ্যতার ভিত্তিতে পদোন্নতি ও পদায়ন চাচ্ছেন।

পাসপোর্ট অধিদপ্তরের পরিচালক পদের দু'জন কর্মকর্তা সমকালকে বলেন, পাসপোর্ট ও ভিসা কার্যক্রম এখন শতভাগ প্রযুক্তিনির্ভর হয়ে পড়েছে। নানা ধরনের কারিগরি কাজ যুক্ত হয়েছে। অধিদপ্তরের একজন কর্মকর্তা এসব কাজে ২০ বছর ধরে দায়িত্ব পালনের পর পরিচালক পদে পদোন্নতি পান। এতে ভিসা ও পাসপোর্ট-সংক্রান্ত সব অভিজ্ঞতা হয় সংশ্নিষ্ট কর্মকর্তার। সেখানে অন্য বিভাগ থেকে প্রেষণে পরিচালক পদে নিয়োগ দিলে সামগ্রিক বিষয়ে অভিজ্ঞতার ঘাটতি দেখা দেবে। পুরো অধিদপ্তর বা বিভাগীয় কার্যালয়গুলো বাইরের টেকনোলজি অপারেটর বা অফিস সহকারী নির্ভর হয়ে পড়বে। এতে সার্ভারে নিরাপত্তা ঝুঁকিও তৈরি হবে। এ জন্যই তারা পরিচালক পদে অধিদপ্তর থেকে শতভাগ পদোন্নতি ও পদায়নের কথা বলে আসছেন।

জনবল কাঠামো-সংক্রান্ত বিভিন্ন নথি থেকে দেখা যায়, বাস্তবতার নিরিখে নতুন অফিস ও প্রয়োজনীয় পদ সৃষ্টি করে সাংগঠনিক কাঠামো পুনর্গঠনের জন্য ২০১৮ সালে অধিদপ্তর থেকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সুরক্ষা সেবা বিভাগে প্রস্তাব পাঠানো হয়। এতে মোট দুই হাজার ৯৫৩টি পদ সৃজন ও ১৪৭টি পদ শূন্য হওয়া সাপেক্ষে বিলুপ্তি করে সাংগঠনিক কাঠামো পুনর্গঠনের প্রস্তাব করা হয়েছিল। সুরক্ষা সেবা বিভাগ থেকে সেটি জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হলে পর ৯৭৭টি নতুন পদ তৈরিতে সম্মতি মেলে। তা অর্থ মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হলে সেখান থেকে ১১টি বিষয়ে পর্যবেক্ষণ দিয়ে সুরক্ষা সেবা বিভাগের মাধ্যমে অধিদপ্তরে ফেরত পাঠানো হয়। পরে সেটি প্রয়োজনীয় সংশোধন করে জমা দেওয়া হয়।

ডিআইপির প্রথম প্রস্তাবে পরিচালক পদে বিদ্যমান সাতটি পদের সঙ্গে আরও পাঁচটি, নতুন ২৩টি অতিরিক্ত পরিচালক, বিদ্যমান উপপরিচালকের ২০ পদের সঙ্গে আরও ৯১টি, সহকারী পরিচালকের ৮২টি পদের সঙ্গে আরও ৭৮টি, উপসহকারী পরিচালকের বিদ্যমান ৩৭টি পদসহ আরও ১২৬টি, প্রধান সহকারীর নতুন পদ ১০৪টি, কম্পিউটার অপারেটরের ছয়টি পদের সঙ্গে আরও ৩৫টি, অফিস সহকারী কাম কম্পিউটার মুদ্রাক্ষরিক বিদ্যমান ৩২২টির সঙ্গে আরও ১১৯টি এবং অফিস সহায়ক ১১১টি পদের সঙ্গে আরও ১৪৩টিসহ বিভিন্ন ধরনের মোট ৯৭৭টি পদ সৃষ্টির প্রস্তাব করা হয়েছিল।

ডিআইপির এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে পর্যবেক্ষণসহ ওই প্রস্তাবটি ফেরত এলেও তা সংশোধন করে ফের অতিরিক্ত মহাপরিচালকের নতুন দুটি পদ, পরিচালকের আরও দুটি নতুন পদসহ জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সম্মতি দেওয়া ৯৭৭টি পদের সঙ্গে আরও ১৫টি অতিরিক্ত জনবলের সংযুক্তি দিয়ে মোট ৯৯২ জনবলের সংশোধিত প্রস্তাব পাঠানো হয়। এর পর থেকেই পুরো প্রস্তাব ঝুলে রয়েছে।

মন্তব্য করুন