করোনাভাইরাসের সংক্রমণে দেশে একের পর এক রেকর্ড সৃষ্টি হলেও জনসচেতনতা বাড়ছে না। বিশেষজ্ঞরা বারবার সামাজিক দূরত্ব ও মাস্ক পরার পরামর্শ দিলেও তা আমলে নিচ্ছেন না নগরবাসী। গণপরিবহনে তা ব্যাপক হারে উপেক্ষিত হচ্ছে। চালক-কন্ডাক্টর-হেল্পার-যাত্রীদের মাস্ক পরতে দেখাই যাচ্ছে না বলা চলে। কারও কারও কাছে মাস্ক থাকলেও তা থুতনিতে ঝুলিয়ে রাখছেন। যাত্রীরা মাস্ক খুলে পকেটে রাখছেন। গণপরিবহনের অর্ধেক আসন খালি রাখার দৃষ্টান্তও সব পরিবহনে দেখা যাচ্ছে না। বরং আসনের চেয়ে বেশি যাত্রী নেওয়ার দৃশ্যও চোখে পড়ছে।

গতকাল শনিবার রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা ঘুরে এমন চিত্র পাওয়া গেছে। পাশাপাশি আগামী ১৪ এপ্রিল থেকে শুরু হতে যাওয়া 'কঠোর লকডাউন' সামনে রেখে অনেককে রাজধানী ছাড়তে দেখা গেছে। দূরপাল্লার বাস, ট্রেন-লঞ্চ বন্ধ থাকলেও নানা কৌশলে ঢাকা ছাড়ছেন তারা।

দেশে করোনা সংক্রমণ বাড়ার সবচেয়ে বড় কারণ হিসেবে গণপরিবহন ও বাজারকে চিহ্নিত করা হলেও এ দুটি ক্ষেত্রেই স্বাস্থ্যবিধি অনুসরণের চিত্র বেশ নাজুক। ক্রেতা বেশির ভাগের মুখে মাস্ক থাকলেও বিক্রেতাদের মুখে মাস্ক চোখে পড়ছে না। অনেকে পকেটে রেখে দিচ্ছেন বা থুতনিতে নামিয়ে রাখছেন।

কেবল সিটি করপোরেশনগুলোর ভেতরে গণপরিবহন চালানোর অনুমতি দেওয়া হলেও তা পুরোপুরি বাস্তবায়িত হচ্ছে না। ঢাকার সঙ্গে আশপাশের প্রতিটি জেলারই প্রায়-স্বাভাবিক যোগাযোগ চলছে। প্রথম দিনগুলোতে স্বাস্থ্যবিধি অনুসরণে সিটি করপোরেশন, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পক্ষ থেকে ভ্রাম্যমাণ আদালত ও সচেতনতামূলক  অভিযান চালানো হলেও গতকাল সেই অভিযানও চোখে পড়েনি।

পরিবহন মালিক সমিতির নেতারা বলছেন, গণপরিবহনের জন্য দেওয়া নির্দেশনাগুলো বাস্তবায়নের দায়িত্ব সরকারের দায়িত্বশীল সংস্থাগুলোর।

মালিক সমিতির তেমন কিছু করার নেই বলে জানান বাংলাদেশ বাস মালিক সমিতির মহাসচিব খন্দকার এনায়েত উল্যাহ। তিনি বলেন, নির্ধারিত ভাড়ার চেয়ে বেশি না নেওয়ার ব্যাপারে নির্দেশ দেওয়া আছে। এরপর যদি কেউ বেশি ভাড়া দাবি করে যাত্রীরা যেন সেই অতিরিক্ত ভাড়া না দেন।

গতকাল রাজধানীর বেশ কয়েকটি এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, স্বাভাবিক সময়ের চেয়ে গণপরিবহনসহ অন্যান্য যানবাহন কিছুটা কম। গণপরিবহনগুলোর হেল্পারের হাতে হ্যান্ড স্যানিটাইজার থাকার কথা থাকলেও তা ছিল না। কিছু যাত্রীকে মাস্ক ছাড়াই বাসে উঠতে দেখা গেছে। দুই-একজন হেল্পার যাত্রীদের এ ব্যাপারে দৃষ্টি আকর্ষণ করলে যাত্রীরা পকেট থেকে মাস্ক বের করে দেখান

বিহঙ্গ পরিবহনের চালক আলিফ ইসলাম বলেন, আমরা স্বাস্থ্যবিধি মেনে গাড়ি চালানোর চেষ্টা করছি। অর্ধেকের বেশি যাত্রী পরিবহন করছি না। কিছু ক্ষেত্রে যাত্রীরা জোর করে বাসে উঠে পড়ছেন। তখন তাদের নামানো যাচ্ছে না।

দিশারী পরিবহনের যাত্রী উজ্জ্বল বিশ্বাস জানান, মিরপুর থেকে গুলিস্তানের ভাড়া ছিল ২৫ টাকা। এখন ৪০-৫০ টাকা নিচ্ছে।

অ্যাপসভিত্তিক রাইড শেয়ার মোটরবাইক বন্ধ থাকলেও পার্সেল বহনকারী রাইডগুলোকে যাত্রী পরিবহন করতে দেখা গেছে। এছাড়া অ্যাপসভিত্তিক অন্য মোটরবাইক চালকরা চুক্তিতে যাত্রী পরিবহন করছেন। রাইড শেয়ারের প্রাইভেট কারগুলো যথারীতি চলছে।

সন্ধ্যা ৬টার পর গণপরিবহন চলাচলের নিষেধাজ্ঞা থাকলেও বেশির ভাগ পরিবহন চালকই তা অনুসরণ করেননি। নির্ধারিত সময়ের পরও গণপরিবহন চলতে দেখা গেছে। ট্রাফিক বিভাগেরও এ ব্যাপারে তেমন কোনো তৎপরতা চোখে পড়েনি।

এদিকে সরকারের নির্দেশনায় ঢাকায় বাইরে থেকে কোনো যানবাহন ঢুকতে ও বের হতে দেওয়া হবে না বলে বিধিনিষেধ ছিল। এ নিয়ে বিভিন্ন স্থানে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে পরিবহন মালিক-শ্রমিকদের বচসার ঘটনা ঘটে। কয়েকজন পরিবহন শ্রমিক জানান, অনেক বাস আছে গাজীপুর থেকে সায়েদাবাদ চলাচল করে। কিন্তু টঙ্গীতে পৌঁছলেই সেগুলোকে পুলিশ আটকে দেয়। ফলে যাত্রীদের দুর্ভোগে পড়তে হয়। একই ঘটনা ঘটে আমিনবাজার ও বাবুবাজার ব্রিজ এলাকায়। বচসার পর কিছু কিছু পরিবহনকে চলার সুযোগও দিয়েছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। অনেক ক্ষেত্রে দূরপাল্লার যানবাহনও কিছু চলেছে।

দূরপাল্লার বাস না চললেও বাস টার্মিনালগুলোতে যাত্রীর ভিড় দেখা গেছে। কয়েকজন মিলে মাইক্রোবাস ভাড়া করে গন্তব্যের উদ্দেশে রওনা দিচ্ছেন। কেউ আবার খোলা ট্রাকে উঠে পড়ছেন। অনেকে মোটরবাইকেও ঢাকা ছাড়ছেন।

এদিকে একটা ট্রিপ শেষ হওয়ার পর পুরো বাস জীবাণুনাশক দিয়ে স্প্রে করার কথা থাকলেও কোথাও সেই দৃশ্য চোখে পড়েনি।

থুতনিতে মাস্ক পরে যাত্রীদের ডাকতে দেখা গেছে চালকের সহকারীদের। তারা বলেন, মাস্ক মুখে থাকলে যাত্রীদের ডাকা যায় না। আর প্রচণ্ড গরমে মাস্ক ভিজে যায়।

হোটেল-রেস্টুরেন্টে বসে খাবার খাওয়া থেকে বিরত থাকার সরকারি নির্দেশনা থাকলেও বেশিরভাগ জায়গায় তা মানা হয়নি। গত সোমবার লকডাউন শুরুর পর কিছু রেস্টুরেন্ট মালিককে এ কারণে জরিমানা করা হলেও গতকাল ভ্রাম্যমাণ আদালত দেখা যায়নি।

মন্তব্য করুন