বরগুনা মূল শহর থেকে পাথরঘাটা যেতে প্রায় ৩০ মিনিট লাগে। সেখান থেকে আরও ১৫ কিলোমিটার গিয়ে গাড়ি থেকে নামতে হয়। এরপর ইট বিছানো রাস্তা ধরে হেঁটে বা ইজিবাইকে করে যেতে হয় মোছাম্মত মিনারা বেগমের বাড়িতে। রাস্তার দুই পাশে ডালের বিস্তীর্ণ ক্ষেত। ধার ধরে লাগানো সারি সারি তালগাছ। ঝোপ হয়ে ফুটে থাকা ভাঁটফুল, আর গৃহস্থালি ঘর থেকে ভেসে আসা ঘুঁটে পোড়ানোর ঘ্রাণ মিলেমিশে এক অন্যরকম অনুভূতি।\হঘণ্টাখানেক হেঁটে পৌঁছাতে হয় মিনারার বাড়িতে। হলুদ রং করা দ্বিতল বাড়িতে ছেলে ও মেয়েকে নিয়ে\হমাত্র কয়েকদিন আগেই উঠেছেন। স্বামীর সঙ্গে তার ছাড়াছাড়ি হয়েছে।

মিনারার বাড়িটি ব্র্যাকের দেওয়া। এটি একই সঙ্গে বাড়ি ও মিনি সাইক্লোন শেল্টার। মিনারারা সারা বছর থাকতে পারবেন; আবার ঝড়ের সময়ে আশ্রয় মিলবে অন্যদেরও। বাড়িটির নিচতলা গবাদিপশুর আশ্রয়ের জন্য ফাঁকা রাখা হয়েছে। দ্বিতীয় তলায় রাখা হয়েছে দুটি কক্ষ। এখানেই সন্তানদের নিয়ে থাকছেন মিনারা। এর আগে তিনি পাশের একটি কাঁচা ঘরে থাকতেন। নতুন ঘর পেয়ে অতীত কষ্ট সরে গিয়ে তার মুখে এখন হাসি।\হস্বামীর সঙ্গে ছাড়াছাড়ির পর মিনারা পড়েছিলেন অনেক বিপদে। পরে ব্র্যাকের সহায়তায় নিজের পায়ে দাঁড়ানোর চেষ্টা শুরু করেন। ২০১৩ সালে 'আলট্রা পুওর গ্র্যাজুয়েশন প্রোগ্রাম' থেকে গরু পান। সেখান থেকে মুনাফা করে পরিবার চালিয়েছেন। এখন আছেন মাইক্রোফাইন্যান্সের 'দারিদ্র্য বিমোচন (দাবি)' কর্মসূচির অধীনে। সর্বশেষ পেলেন মিনি সাইক্লোন শেল্টার প্রকল্পের 'আমার বাড়ি, আমার ঘর' মডেল ভবন।\হমিনারা বলেন, 'আগে আমাদের ভালো ঘর ছিল না, দুই কিলোমিটার দূরের সরকারি জায়গায় যাওয়া লাগত। ঝড় অইলে এখন আল্লাহ-রসুলের নাম নিয়া আরও ১০ জনরে লইয়া থাকতে পারমু।'\হব্র্যাক কর্মকর্তারা জানান, এমন একটি ঘরে অনায়াসে আশপাশের অন্তত ৫টি পরিবার আশ্রয় নিতে পারবে।\হপ্রকল্পের ঘর পাওয়া আরেক নারী আয়েশা বেগম। তিনি বলেন, 'সিডরের সময়ে আমি বাদুরতলার সাইকোলোন শেল্টারে গেসিলাম। এইখান থিকা শেল্টারে যাইতে পেরায় দেড় ঘণ্টা লাগে। বন্যা শেষ অইলে ফিরার সময় অনেক বাইচ্চা বাইচ্চা পোলাপাইনরে রাস্তায় মইরে পইড়ে থাইকতে দেখছি। আমার মাইয়ার বয়সীরা রাস্তায় শুইয়া আছিলো। সব বয়সেরই আছিলো।' ব্র্যাকের 'আমার বাড়ি, আমার ঘর' পেয়ে তিনি এখন অনেক খুশি, 'এহন সিডর আইলে আমার কোনোখানে যাওয়া লাগবো না। পাড়া-পরতিবেশীরেও হেইসময় ঘরে রাখতে পারমু। এলাকার বেবাকেই খুশি আমার মতো দরিদ্র মহিলা ঘর পাওয়ায়।'\হস্থানীয় পুকুর গৃহস্থালি কাজের পানির চাহিদা মেটাতে পারলেও এই অঞ্চলের লোকজন বেশি ভোগে খাবার পানির অভাবে। বেশির ভাগই কয়েক কিলোমিটার দূরের কোনো নলকূপ থেকে খাবার পানি সংগ্রহ করে। ঘূর্ণিঝড় বা জলোচ্ছ্বাসে নলকূপগুলোতে নোনা পানি ঢুকে সে সুযোগও নষ্ট হয়ে যায়। তাই ব্র্যাকের মিনি সাইক্লোন শেল্টারে এই বিষয়টি মাথায় রেখে বৃষ্টির পানি ধরে রাখার ব্যবস্থা করা হয়েছে। এখান থেকে একটি পরিবার অনায়াসে ছয় মাসের খাবার পানির সংস্থান করতে পারবে। এ ছাড়া অস্বাস্থ্যকর পায়খানা ব্যবহারের কারণেও এ এলাকায় অনেককেই রোগে ভুগতে হয়। তাই প্রতিটি বাড়িতে আধুনিক পয়ঃনিস্কাশন ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে।\হব্র্যাক কর্মকর্তারা জানান, বাড়িগুলো ২৫০ কিলোমিটার বেগের ঘূর্ণিঝড়েও টিকে থাকতে পারবে। এ ছাড়া গত ১০০ বছরের জলোচ্ছ্বাসের উচ্চতার হিসাবকে মাথায় রেখে বাড়ির ভিটের উচ্চতা নির্ধারণ করা হয়েছে, তাই জলোচ্ছ্বাসে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ভয়ও নেই। ২০১৯ সালে শুরু হওয়া এই প্রজেক্টের আওতায় পটুয়াখালী, বরগুনা ও ভোলায় ৩০টি মডেল সাইক্লোন শেল্টার বানানো হয়েছে।

দেশের উপকূলীয় অঞ্চলের ১৫ জেলার ২ কোটির বেশি মানুষ ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের ঝুঁকিতে আছে। এখন পর্যন্ত সরকারিভাবে সব মিলিয়ে আশ্রয় সক্ষমতা আছে ৫১ লাখ মানুষের। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরের উদ্যোগে ২০১৬ থেকে ২০১৯ সালের মধ্যে ২২০টি বহুমুখী ঘূর্ণিঝড় আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণ করা হয়। এর প্রতিটি তৈরিতে খরচ হয়েছে ২ কোটি ১০ লাখ টাকা, যেখানে আশ্রয় নিতে পারবে ৮০০ জন। ব্র্যাকের একটি বাড়ি তৈরিতে খরচ হয়েছে সাড়ে ৬ লাখ টাকা।\হব্র্যাকের জলবায়ু পরিবর্তন কর্মসূচির পরিচালক ড. মো. লিয়াকত আলী সমকালকে বলেন, 'প্রথমত সরকারি সাইক্লোন শেল্টারে ব্যবস্থাপনার একটা ঘাটতি আছে। শেল্টারটিকে সারাবছর সেভাবে পরিচর্যা করা হয় না। বিপদে পড়লে ঘূর্ণিঝড় আক্রান্ত মানুষ সেখানে আশ্রয় নেয়, তবে তাদের সম্পদ নিয়ে সেখানে যেতে পারে না। ক্ষয়ক্ষতি অনেক বেশি হয়।'\হব্র্যাকের সাইক্লোন শেল্টারের সুবিধা উল্লেখ করে ড. লিয়াকত বলেন, আমরা যদি এটা সবার জন্য করে দিতে পারি তাহলে একটি দরিদ্র পরিবার সমাজে মাথা উঁচিয়ে বাঁচতে পারবে। আশপাশের পরিবারগুলোও তাতে আশ্রয় পাবে।

মন্তব্য করুন