গৃহবধূ জাহানারা বেগম প্রাইভেটকারে পরিবারের পাঁচ সদস্য নিয়ে গতকাল শনিবার সকালে কুমিল্লার দেবিদ্বারে যাচ্ছিলেন। গাড়িটি সুলতানা কামাল সেতু পার হওয়ার পর পুলিশ সেটি আটকালে তারা চলাচলের বৈধ অনুমতিপত্র বা 'মুভমেন্ট পাস' দেখাতে পারেননি। পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে জাহানারা জানান, তার স্বামী অসুস্থ হয়ে ঢাকার একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। তাই টাকা আনতে গ্রামে যাচ্ছেন। পুলিশও যাচাই করে জানতে পারেন, তার কথা সত্য। শেষ পর্যন্ত মানবিক কারণেই গাড়িটি ঢাকা ছাড়ার অনুমতি পায়।

'সর্বাত্মক লকডাউনের' চতুর্থ দিন গতকাল ঢাকার গুরুত্বপূর্ণ সড়কগুলোতে অহরহই এ রকম ব্যক্তিগত গাড়ি চলতে দেখা গেছে। প্রায় সব সড়কেই ছিল রিকশা আর ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা। সিএনজিচালিত অটোরিকশা আর ভাড়ায় চালিত মোটরসাইকেলের চলাচলাও ছিল চোখে পড়ার মতো। বাস-ট্রেনের মতো গণপরিবহন না থাকলেও আর সবই যেন স্বাভাবিক হয়ে পড়ছে। ঢাকার অলিগলি আর পাড়া-মহল্লা ঘুরে দেখা গেছে, লকডাউনের কার্যক্রম ঢিলেঢালা হয়ে পড়েছে। দোকানপাট খোলা, জীবনযাত্রাও কার্যত স্বাভাবিক।

করোনাভাইরাস সংক্রমণের ঊর্ধ্বগতি ঠেকাতে গত বুধবার থেকে কঠোর লকডাউনের ঘোষণা দেয় সরকার। এটা চলার কথা ২১ এপ্রিল মধ্যরাত পর্যন্ত। মাঠ পর্যায়ে এই লকডাউন বাস্তবায়নে পুলিশ দায়িত্ব পালন করলেও গতকাল রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় ছাড় দেওয়ার দৃশ্যও দেখা গেছে।

পুলিশ সদর দপ্তরের মুখপাত্র সহকারী মহাপরিদর্শক (মিডিয়া) সোহেল রানা জানান, বিনা কারণে বের হওয়া এবং জরুরি সেবায় নিয়োজিত ব্যক্তির মধ্যে পার্থক্য নিরূপণ করতে গিয়ে এবং অহেতুক কাজে বের হওয়া থেকে মানুষকে বিরত রাখতে গিয়ে পুলিশ সদস্যদের গলদঘর্ম হতে হচ্ছে।

পুলিশ সদর দপ্তরের একজন কর্মকর্তা জানান, শনিবার সকাল ১১টা পর্যন্ত মুভমেন্ট পাসের জন্য অন্তত ১৭ কোটির বেশি হিট বা চেষ্টা হয়েছে। এ থেকেই বোঝা যায় কত বিপুলসংখ্যক মানুষ মুভমেন্ট পাস পেতে চেষ্টা করছেন। এ সময় পর্যন্ত পাস পেতে নিবন্ধন করেছেন ৬ লাখ ৫৬ হাজারের বেশি লোক। তাদের মধ্যে ৪ লাখ ৯৫ হাজার ২৭০ জনকে অনুমতি দেওয়া হয়েছে। সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টায় চলাচলের অনুমোদন দেওয়া হয়েছে প্রায় এক লাখ লোককে। গতকাল দুপুরে মালিবাগ মোড়ে ভাড়ায় চালিত অন্তত ছয়টি মোটরসাইকেল নিয়ে চালকদের অপেক্ষা করতে দেখা গেছে। তাদের একজন নূর মোহাম্মদ বলছিলেন, গত বছরের লকডাউনের পর তার চাকরি গেছে। এরপর অ্যাপসে মোটরসাইকেল চালিয়ে সংসার চালানো শুরু করেন। ঝুঁকি জেনেও বাধ্য হয়েই তিনি রাস্তায় বের হয়েছেন। গত দু'দিনের তুলনায় যাত্রীও পাচ্ছেন বেশি।

মাঠ পর্যায়ে দায়িত্ব পালন করা পুলিশ কর্মকর্তারা বলছেন, প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ আক্রান্ত হচ্ছেন, দু'দিন ধরে দৈনিক মৃত্যু হয়েছে শতাধিক লোকের। তা সত্ত্বেও সাধারণ মানুষের ভেতর আতঙ্ক বা সচেতন হওয়ার বালাই নেই। সবার ভাবসাব এমন যে, মিথ্যা কথা বলে দায়িত্বরত আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের ফাঁকি দিতে পারলেই তারা করোনা থেকে মুক্তি পেয়ে যাবেন। অবশ্য রাজধানীর মূল সড়কগুলোতে চেকপোস্ট দিয়ে অননুমোদিত চলাচল প্রায় নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হলেও পাড়া-মহল্লার অলিগলি সেভাবে সম্ভব হয়নি। এজন্য এলাকার লোকজনকে এগিয়ে আসতে হবে।

পুলিশের ডেমরা জোনের অতিরিক্ত উপকমিশনার দীন মোহাম্মদ সমকালকে বলেন, তারা মূল সড়কগুলোতে অনুমোদনহীন সব গাড়িই আটকে দিচ্ছেন। তবে এলাকায় ইজিবাইক ও ব্যাটারিচালিত রিকশা বেশি থাকায় নিয়ম মানাতে সমস্যা হচ্ছে। বাধ্য হয়ে এলাকার অনেক রাস্তায় বাঁশ দিয়ে ব্যারিকেড দিয়ে রাখছেন। মানুষকে সচেতন করার চেষ্টা করছেন।

পুলিশের দারুস সালাম জোনের সহকারী কমিশনার মিজানুর রহমান বলেন, ঢাকার অন্যতম প্রবেশ ও বাহির পথ গাবতলী-আমিনবাজার এলাকা দিয়ে জরুরি সেবায় নিযুক্ত গাড়ি ছাড়া কোনো গাড়ি ঢুকতে বা বের হতে দেওয়া হচ্ছে না।

মন্তব্য করুন