করোনা সংক্রমণ রোধে চলমান 'সর্বাত্মক লকডাউন' আর সর্বাত্মক নেই। লকডাউন আরও এক সপ্তাহ বাড়লেও যানবাহন ও পথচারী চলাচল নিয়ন্ত্রণে সড়কে পুলিশের তল্লাশি তৎপরতা কমেছে। 'সর্বাত্মক লকডাউনে'র ষষ্ঠ দিনে গতকাল সোমবার রাজধানীর প্রধান প্রধান সড়কে গণপরিবহন ছাড়া আর সব ধরনের যানবাহনই চলেছে। গলি মহল্লা ছিল আগের মতোই লোকারণ্য। গতকাল ধানমন্ডি, মগবাজার, মালিবাগ, রামপুরা, কাকরাইল, তেজগাঁওসহ বিভিন্ন এলাকা ঘুরে এ চিত্র দেখা গেছে। দুপুর ৩টার দিকে মগবাজার মোড়ে রিকশা, পিকআপ, প্রাইভেট গাড়ির নাতিদীর্ঘ সারি দেখা গেছে। মোড়ে অনেক পুলিশ থাকলেও কাউকে আটকাতে দেখা যায়নি মুভমেন্ট পাসের জন্য।

মগবাজার ওয়্যারলেস গেট থেকে ভেতরের অলিগলি ঘুরে দেখা যায়, লকডাউনের প্রভাব নেই। চলছে 'চোর পুলিশ খেলা'। ২টার দিকে পুলিশের গাড়ি এলে মগবাজার রেলগেটের দোকানি দ্রুত শাটার বন্ধ করেন। রাস্তার পাশের হকাররা রেললাইন ধরে সরে যান। পুলিশের গাড়ি চলে যেতেই ফের দোকান খোলেন, হকাররা সড়কের পাশে পসরা সাজিয়ে বসেন।

তরমুজ বিক্রেতা আবদুল হাকিম জানান, ১৫ হাজার টাকায় ১০০ তরমুজ কিনেছেন। চার দিনে মাত্র ৫০-৫৫টি বিক্রি করেছেন। যত দিন যাচ্ছে তরমুজ ততই শোকাচ্ছে। দাম কমছে। লোকসান থেকে বাঁচতে অপেক্ষা করার সুযোগ নেই। তাই পুলিশের ভয় উপেক্ষা করেই পথে নেমেছেন, যা হওয়ার হবে।

মগবাজার মোড়ে পুরোনো চীনা দূতাবাসের সামনে কথা হয় যাত্রীর অপেক্ষায় থাকা রিকশাচালকদের সঙ্গে। তারা জানান, লকডাউনে পেটেও লকডাউনের উপক্রম হয়েছে। শামীম নামের এক কিশোর রিকশাচালক জানান, সকাল থেকে মাত্র ৯০ টাকা আয় হয়েছে। তার তিন সদস্যের পরিবারের এক দিনের চালের দামও ওঠেনি। লকডাউনের প্রথম চার দিন ঘরেই ছিলেন শামীম। কিন্তু খাবার ফুরিয়ে আসায় গত রোববার থেকে রিকশা চালাচ্ছেন। পথে পুলিশ ধরে, কখনও রিকশা নিয়ে নেয়। কাকুতি-মিনতি করে রিকশা উদ্ধার করেন। রোববার ২২০ টাকা আয় হয়েছে।

রামপুরা ও হাতিরঝিল এলাকার গলি মহল্লাও লোকে গিজ গিজ করছে। দোকানপাট খোলা। লকডাউন আরও এক সপ্তাহ বাড়ায় ক্ষুব্ধ মধুবাগ এলাকার হকার রেজাউল করিম। কিশোরগঞ্জের ভৈরব থেকে বছর সাতেক আগে ঢাকায় আসা এই তরুণ হাতিরঝিলে বাদাম ও চানাচুর বিক্রি করেন। তিনি বললেন, লকডাউনের কারণে হাতিরঝিলে বেড়াতে আসা লোকজন নেই, তার বিক্রিও নেই। একেবারে বেকার হয়ে গেছেন। বাড়ি চলে যেতে চেয়েছিলেন, ট্রেন বন্ধ থাকায় যেতে পারছেন না। এলাকার পরিচিতদের সঙ্গে রিকশার গ্যারেজে আড্ডা দিয়ে দিন পার করছেন। আশায় ছিলেন বুধবার লকডাউন উঠবে। সে আশায় গুড়েবালি। এখন পর্যন্ত চলছেন সঞ্চয় ভেঙে। আগামী দিনগুলো কীভাবে চলবে, বাড়িতে স্ত্রী-সন্তানদের জন্য কী করে টাকা পাঠাবেন, জানা নেই রেজাউলের।

গত কয়েক দিন ধরে করোনায় মৃত্যুর সংখ্যা রেকর্ড গড়ছে। সংক্রমণ কিছুটা কমলেও বিপদ কমার সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে না। তাই সরকারের তরফ থেকে বারবার বলা হচ্ছে, ঘরে থাকতে। সামাজিক দূরত্ব মানতে। কিন্তু পথে-ঘাটে এ নির্দেশনার প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে না। বরং যত দিন যাচ্ছে ততই ঢিলেঢালা হচ্ছে লকডাউন। জীবন ও জীবিকার দ্বন্দ্বে পথে রোজগারের সন্ধানে মানুষ বাড়ছে। মোড়ে মোড়ে অসহায় মানুষকে দেখা যাচ্ছে সাহায্য-ত্রাণের আশায়। ক্ষুধার জ্বালা তাদের ঘরে থাকতে দিচ্ছে না।

গত বছরের লকডাউনে পথে নামা লোকজন ও পুলিশকে শরীরমোড়া 'পিপিই' পরতে দেখা গেলেও এবার এমনটা দেখাই যাচ্ছে না। পুলিশকে দেখা যাচ্ছে মাস্ক ছাড়া। করোনার ভয় দিনে দিনে কমছে। হাতিরঝিলে ভরদুপুরে সময় কাটাতে আসা কারওয়ান বাজারের 'বিখ্যাত' মফিজ পাগলাও সেই কথাই বললেন। তিনি বললেন, 'আর কত মানুষ ডরাইব? ঘরে থাইক্যা তো লাভ নেই। দুই-চার পয়সা রুজিও তো দরকার।'

স্বাস্থ্যবিধির বালাই নেই :লকডাউন কোথাও মানা হচ্ছে, কোথাও মানা হচ্ছে না। রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে লকডাউনের আওতাভুক্ত ও আওতাবহির্ভুত দোকানপাট খোলা হচ্ছে, আবার কোথাও কোথাও নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তায় দোকানপাট বন্ধ রাখা হচ্ছে। সরেজমিন রাজধানীর বিভিন্ন স্থান ঘুরে দেখা গেছে, কোথাও লকডাউন আছে, কোথাও নেই। রাজধানীর বিভিন্ন স্থান ঘুরে দেখা গেছে, কাঁচাবাজার, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মুদি দোকান ছাড়াও হার্ডওয়্যার, ক্রোকারিজ, তৈরি পোশাক, থান কাপড়, ফার্নিচার, প্লাস্টিক পণ্যসহ অনেক ধরনের দোকান খোলা রয়েছে। স্থানীয়রা জানান, কোথাও কোথাও স্বাস্থবিধির বালাই নেই। তারা আরও জানান, এভাবে চলতে থাকলে লকডাউনের সুফল পাওয়া যাবে না। করোনাভাইরাসের সংক্রমণ রোধ করা যাবে না।

সরেজমিনে রাজধানীর বৃহত্তম কাঁচাবাজার কারওয়ান বাজারে নানা ধরনের কাঁচা পণ্য, নিত্যপ্রয়োজনীয় শাকসবজি, মনিহারি দোকানের পাশাপাশি, হার্ডওয়্যার, ক্রোকারিজ, প্লাস্টিক, সিলভার, সিরামিক, ওয়ালপেপার, পলিথিনসহ লকডাউনের আওতাভুক্ত অনেক দোকানও খোলা দেখা গেছে। মোহাম্মদপুরের রায়েরবাজার এলাকার সাদেক খান রোড, হাসেম খান রোডের দু'পাশে সব ধরনের দোকানপাট খোলা দেখা গেছে। আবার নিউমার্কেট, গাউছিয়া, গুলিস্তান এলাকার চিত্র ভিন্ন। এসব এলাকার মার্কেট, ফুটপাত পুরোটাই সিল করে দেওয়া হয়েছে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, কোথাও কোথাও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কড়া নিরাপত্তা ব্যবস্থা রয়েছে, আবার কোথাও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর উপস্থিতি নেই বললেই চলে।

কারওয়ান বাজারের দক্ষিণ পাশে প্লাস্টিক ড্রাম ও হার্ডওয়্যার দোকানগুলো অবাধে খোলা রাখা হয়েছে। কিচেন মার্কেটের নিচতলায় ও দোতলায় নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য ছাড়াও অন্য পণ্যের দোকানগুলো খোলা রাখা হয়েছে। এই মার্কেটের নিচে প্লাস্টিক ড্রাম ও হার্ডওয়্যার দোকানি মো. রবিউল সমকালকে বলেন, 'আমাদের দোকানটি কিচেন মার্কেটের সঙ্গে, এই মার্কেটটি খোলা আছে সে কারণে আমরাও দোকান খোলা রেখেছি।'

রায়ের বাজার এলাকায় সাদেক খান রোড়ে অবাধে সব ধরনের দোকানপাট খোলা রাখা হয়েছে। সকাল থেকে সারাদিন লোকসমাগম লেগেই আছে। মানুষে মানুষে ঠাসাঠাসি দেখা গেছে সেখানে।

বাংলাদেশ হকার সংগ্রাম পরিষদের নেতা আবুল কালাম জুয়েল সমকালকে বলেন, রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় লকডাইনের আওতার বাইরে থাকা অনেক পণ্যসামগ্রীর দোকানপাট খোলা হচ্ছে। তারা গুলিস্তান এলাকার ফুটপাতে দোকান করেন। তাদের এলাকায় হকাররা দোকান খোলা রাখা তো দূরের কথা, ফুটপাত দিয়ে চলাফেরাও করতে পারছে না। লকডাউনে এই বৈষম্য থেকে কেউ কেউ সুবিধা পাচ্ছে, আবার কেউ কেউ বঞ্চিত হচ্ছে। বায়তুল মোকাররম, পল্টন, মতিঝিল, নয়াপল্টন, কাকরাইল এলাকা ঘুরে বিভিন্ন মার্কেট ও ফুটপাতের দোকানগুলো বন্ধ দেখা গেছে।

মন্তব্য করুন