দরজায় কড়া নাড়ছে ঈদুল ফিতর। এমন সময়ে রাত জেগে থাকার কথা কেরানীগঞ্জের পোশাকপল্লির। শবেবরাতের পর ২৫ রমজান পর্যন্ত পাইকারের ভিড়ে সরগরম থাকত এই পল্লি। অথচ গত শনিবার রাত সাড়ে ৮টায় গিয়ে দেখা গেল, পুরো এলাকা প্রায় ফাঁকা। অধিকাংশ দোকানে ঝুলছে তালা। অল্প কিছু দোকান খোলা থাকলেও নেই ক্রেতার দেখা।

রাজধানীর বাবুবাজার ব্রিজ পেরিয়ে কেরানীগঞ্জের পূর্ব আগানগরের পাকা সুপারমার্কেটের মোল্লা ফ্যাশন। মেয়েদের পোশাকের এই দোকানের চার কর্মচারী অলস সময় পার করছিলেন। এখানে কথা হয় মোল্লা ফ্যাশনের ম্যানেজার শফিকুল ইসলামের সঙ্গে। ছয় বছর ধরে তিনি এই দোকানে চাকরি করছেন। দেশে করোনা সংক্রমণ শুরুর পর থেকেই পোশাকপল্লির বিক্রি আগের মতো নেই জানিয়ে তিনি বলেন, রোজার মাস শুরু হলে চোখে ঘুম থাকত না। বেচাবিক্রি শেষ করে ভোরে ঘুমাতে যেতাম। তাও কয়েক ঘণ্টার জন্য। এখন শুয়ে-বসে দিন পার করতে হচ্ছে।

শুধু শফিকুল ইসলাম নন, ঈদ সামনে রেখে ভরা মৌসুমে এই পোশাকপল্লির অন্যান্য দোকানেরও একই অবস্থা। তাদের ব্যবসার সচল চাকা অচল করে দিয়েছে করোনা। এতে গতবারের মতো এবারও ঈদ মৌসুমে ব্যাপক লোকসানের আশঙ্কা করা হচ্ছে। এই ক্ষতির কারণে অভাব স্থায়ী হচ্ছে পোশাকপল্লির শ্রমিক, ব্যবসায়ীসহ সংশ্নিষ্টদের। এরই মধ্যে ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়েছেন বেশিরভাগ ব্যবসায়ী।

মোল্লা ম্যানশনের মনজু গার্মেন্টসের মালিক মনজু মাতব্বর বলেন, দুই বছর ধরে লোকসান গুনতে গুনতে তার এখন পথে বসার উপক্রম। আর ব্যবসা টানতে পারছেন না। দুই বছরে ২৭ লাখ টাকা ঋণগ্রস্ত হয়েছেন। তবুও সুদিনের আশায় এবারও ঈদকে কেন্দ্র করে নতুন উদ্যমে কারখানায় জিন্স প্যান্ট উৎপাদন করেছেন। কিন্তু লকডাউনের কারণে চোখে অন্ধকার দেখছেন। ঈদের আর অল্প কিছুদিন বাকি, এ সময়ও পরিবহন খুলে দিলে অন্তত কিছু বিক্রি বাড়ত। পোশাক ব্যবসায়ীদের বাঁচাতে সরকারের এগিয়ে আসা উচিত।'

সাজ প্যান্ট কর্নারের মালিক মাসুদুর রহমান ১২ বছর ধরে ব্যবসা করছেন। গত বছর করোনায় ২০ লাখ টাকা লোকসান হয়েছে তার। এবার লোকসানের পরিমাণ আরও বাড়বে বলে জানান তিনি। তিনি বলেন, 'গত বছরের ক্ষতি পোষাতে এ বছর ৩০ লাখ টাকা ধার করে পুনরায় বিনিয়োগ করেছি। করোনার কারণে এখন মূলধন হারানোর পাশাপাশি ভবিষ্যৎ নিয়ে শঙ্কায় রয়েছি।'

বুড়িগঙ্গার তীরঘেঁষা রাজধানীর সদরঘাটের ওই পাড়ে কেরানীগঞ্জের পোশাকপল্লি। পূর্ব আগানগর, আগানগর ছোট মসজিদ রোড, চর কালীগঞ্জ এলাকায় চার দশকের বেশি সময় ধরে গড়ে ওঠা এই পোশাকপল্লিতে ছোট ও মাঝারি আকারের ছয় হাজারের মতো কারখানা আছে। দোকানের সংখ্যা প্রায় আট হাজার। সব মিলিয়ে এখানে প্রায় দুই লাখ মানুষের কর্মসংস্থান। সারাদেশে বিক্রি স্থানীয় পোশাকের ৭০-৮০ শতাংশের জোগান দেন কেরানীগঞ্জের উৎপাদকরা। নিম্ন ও মধ্যবিত্তের পোশাক উৎপাদনের কেন্দ্রস্থল হিসেবে পরিচিত কেরানীগঞ্জের ব্যবসায়ীদের মূল পরিকল্পনা থাকে রোজার ঈদকে ঘিরেই। উৎপাদিত পোশাকের ৭০ শতাংশ বিক্রি হয় ঈদুল ফিতরে। সারাদেশ থেকে পাইকাররা এসে কিনে নিয়ে যায় এখান থেকে।

এখানকার ব্যবসায়ীরা বলছেন, ঈদের সময় দুই মাসের ব্যবসায় সব পুষিয়ে এক বছর চলার অবলম্বন পান তারা। করোনার কারণে গত বছর ব্যবসা না হওয়ায় কারখানা-শো রুমের ভাড়া, শ্রমিকদের বেতন, মেশিনারি ও কাঁচামাল ক্রয় ও ব্যাংক ঋণ পরিশোধ করতে গিয়ে বিপাকে পড়েছেন তারা। ঈদের আগে দোকান খুলে দেওয়া হলেও গণপরিবহন বন্ধ থাকায় ক্রেতা নেই।

কেরানীগঞ্জ ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি হাজি মুসলিম ঢালী বলেন, গত বছরও ভরা মৌসুমে ব্যবসায়ীরা মার খেয়েছেন। কিছুদিন ধরে মার্কেট খুললেও বেচাকেনা তেমন না থাকায় বড় ধরনের লোকসান গুনতে হবে।

মন্তব্য করুন