নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠন আনসার আল ইসলামের নেতা মুফতি জসীমুদ্দীন রাহমানী গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে থাকলেও উস্কানিমূলক ও উগ্রবাদী বক্তব্য থেমে নেই। কয়েকজন 'ধর্মীয় বক্তার' দেওয়া উস্কানিমূলক এসব বক্তব্যে তরুণদের অনেকেই জঙ্গিবাদের দিকে ঝুঁকছে। এরই মধ্যে তাদের তালিকা তৈরির কাজ শুরু হয়েছে। ওই তালিকা ধরে শিগগির গ্রেপ্তার অভিযান চালানো হবে। জঙ্গি দমনে যুক্ত পুলিশের কাউন্টার টেররিজম ইউনিট সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।

কাউন্টার টেররিজম ইউনিটের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, তারা অনুসন্ধান করে দেখেছেন ওয়াজের কথা বলে একটি গ্রুপ এতটাই উগ্রবাদী ও উস্কানিমূলক বক্তব্য দিচ্ছে যে, ওই বক্তব্য শুনে বেশকিছু তরুণ ফের উগ্রবাদে জড়িয়ে পড়েছে। তরুণদের ওই গ্রুপটি উগ্রবাদের চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছে ফের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং সংসদ ভবনের মতো স্থাপনাতেও হামলার পরিকল্পনা করছিল। সংসদ ভবন এলাকায় পুলিশের ওপর তলোয়ার ব্যবহার করে হামলার জন্য ঢাকার বাইরে থেকে এক উগ্রবাদী তরুণ সিরাজগঞ্জ থেকে ঢাকায় আসে। তার আক্রমণ ঠেকানোর পাশাপাশি তাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

কাউন্টার টেররিজম ইউনিটের ইনভেস্টিগেশন বিভাগের উপকমিশনার মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম সমকালকে বলেন, ধর্মীয় বক্তব্য বা ওয়াজের নামে একদল লোক উগ্রবাদ ও ধর্মীয় চরমপন্থা ছড়াচ্ছে। তালিকা ধরে একজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তিনি বলেন, এই ধরনের উগ্রবাদ প্রচারে জড়িত অন্তত ৮ জনের নাম-ঠিকানা সংগ্রহ করে তাদের ওপর নজরদারি করা হচ্ছে। জঙ্গিদের ব্যবহূত বিভিন্ন গোপন সাইটগুলো নজরদারি করে দেখা গেছে, এসব উগ্রবাদী বক্তা জঙ্গিদের কাছে খুবই জনপ্রিয়। তাদের বক্তব্য শুনে জঙ্গিবাদে উদ্বুদ্ধ হয়ে নাশকতার পরিকল্পনাও করেছিল কেউ কেউ। তবে জঙ্গি দমনে যুক্ত সংস্থাগুলো সক্রিয় থাকায় এ ধরনের অনেক নাশকতা রুখে দেওয়া গেছে।

জঙ্গি দমনে যুক্ত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিভিন্ন ইউনিটের সূত্রগুলো বলছে, উগ্রবাদী বক্তব্য প্রচারে জড়িত ব্যক্তিরা ইউটিউবসহ বিভিন্ন অনলাইন মাধ্যমে তাদের বক্তব্য ছড়িয়ে দিচ্ছে। এ ছাড়া বই আকারেও তাদের বক্তব্যগুলো সংকলিত হচ্ছে। এসব বক্তার অনেকে সরাসরি জঙ্গিবাদে যুক্ত। আবার শনাক্ত হওয়া কয়েকজন ধর্মভিত্তিক সংগঠন হেফাজতে ইসলামে সক্রিয়। ওই অংশটি ধর্মের ভুল ব্যাখ্যা দিয়ে তরুণদের উস্কানি দেওয়ার কাজটি করে আসছে।

কাউন্টার টেররিজম ইউনিটের একজন কর্মকর্তা বলেন, দেশে অনেক আগে থেকেই মুফতি জসীমুদ্দীন রাহমানী তার বক্তব্যের মাধ্যমে ধর্মীয় চরমপন্থা ছড়াচ্ছিলেন। তার বক্তব্যে উদ্বুদ্ধ হয়েই ২০১৩ সালে মিরপুরে অনলাইন অ্যাক্টিভিস্ট আহমেদ রাজীব হায়দারকে আনসারুল্লাহ বাংলাটিমের (এবিটি) একদল জঙ্গি হত্যা করে। ওই হত্যাকাণ্ডে সরাসরি জড়িত কয়েক জঙ্গির ফাঁসির রায় হলেও জসীমুদ্দীন রাহমানীর পাঁচ বছরের সাজা হয়। অবশ্য এবিটি নিষিদ্ধ হওয়ার পর সংগঠনটি আনসার আল ইসলাম নামে তাদের অপতৎপরতা চালিয়ে আসছে।

পুলিশ সূত্র জানায়, জঙ্গিবাদ ছড়িয়ে দিতে যে ক'জন ধর্মীয় বক্তা উগ্রবাদী বক্তব্য দিচ্ছেন, তাদের মধ্যে অন্যতম রাজবাড়ীর একটি মাদ্রাসার শিক্ষক আলী হাসান উসামা (২৭)। উগ্রবাদীদের মধ্যে তিনি 'বাঙলার ওসামা' নামে পরিচিত। এই ওসামা রাজবাড়ী বাজার কেন্দ্রীয় জামে মসজিদের খতিবের দায়িত্বও পালন করে আসছিলেন। তার বক্তব্যে অনুপ্রাণিত হয়েই গত বুধবার রাতে সিরাজগঞ্জ থেকে আল সাকিব নামে এক তরুণ সংসদ ভবন এলাকায় হামলা চালাতে আসে। সিরাজগঞ্জ সরকারি কলেজে পদার্থ বিজ্ঞান বিভাগের অনার্স প্রথম বর্ষের ছাত্র সাকিব আনসার আল ইসলামের সক্রিয় সদস্য। তাছাড়া ওসামা যে মাদ্রাসাটির শিক্ষক, সেটির উপদেষ্টা পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার হওয়া হেফাজত নেতা মুফতি হারুন ইজহার। এরই মধ্যে ওসামা ও সাকিবকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

মন্তব্য করুন