শ্রমিক নেতা, সাবেক সাংসদ, শিক্ষক ও বীর মুক্তিযোদ্ধা আহ্‌সান উল্লাহ্‌ মাস্টারের সপ্তদশ মৃত্যুবার্ষিকী আজ শুক্রবার। ২০০৪ সালের এই দিনে একদল সন্ত্রাসী গাজীপুরের নোয়াগাঁও এমএ মজিদ উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যা করে তাকে। এ সময় তাকে রক্ষা করতে গিয়ে নিহত হয় স্কুলছাত্র রতন। পরে নৃশংস এ হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদ করতে গিয়ে পুলিশের গুলিতে আরও কয়েকজন নিহত হন। চাঞ্চল্যকর এ মামলায় ২০০৫ সালে ২২ আসামিকে মৃত্যুদণ্ডের রায় দেন বিচারিক আদালত। কিন্তু হত্যাকাণ্ডের ১৭ বছরেও আসামিদের দণ্ড কার্যকরের আইনি প্রক্রিয়া শেষ হয়নি।

আহ্‌সান উল্লাহ্‌ মাস্টারের জন্ম ১৯৫০ সালের ৯ নভেম্বর গাজীপুরের পুবাইল ইউনিয়নের (বর্তমান সিটি করপোরেশন) হায়দরাবাদ গ্রামে। তিনি গাজীপুর-২ (সদর-টঙ্গী) আসন থেকে ১৯৯৬ ও ২০০১ সালে সাংসদ, ১৯৯০ সালে গাজীপুর উপজেলা চেয়ারম্যান এবং ১৯৮৩ ও ১৯৮৭ সালে দুই দফায় পৌরসভা চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। আওয়ামী লীগের জাতীয় পরিষদ সদস্য ছাড়াও জাতীয় শ্রমিক লীগের কার্যকরী সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক ছিলেন তিনি। এ ছাড়া বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব লেবার স্টাডিজের (বিলস) চেয়ারম্যান ও শিক্ষক সমিতিসহ সমাজসেবামূলক বিভিন্ন সংগঠনের সঙ্গেও তিনি জড়িত ছিলেন।

কবে এ মামলার বিচারকাজ শেষ হবে, তা নিয়ে শঙ্কা ও প্রশ্ন রয়েছে পরিবার ও স্বজনদের। জানতে চাইলে আহ্‌সান উল্লাহ্‌ মাস্টারের ছেলে জাহিদ আহসান রাসেল এমপি বলেন, 'আল্লাহর কাছে এটাই কামনা- আমরা যেন বিচারটা দেখে যেতে পারি।'

সুপ্রিম কোর্টের তথ্যানুযায়ী, আপিল বিভাগে বর্তমানে ছয়জন বিচারপতি। এর মধ্যে বিচারপতি ওবায়দুল হাসান হাইকোর্টে আহ্‌সান উল্লাহ্‌ মাস্টার হত্যা মামলায় রায় দিয়েছিলেন। তাই বিধি অনুসারে তিনি এ মামলার শুনানি করতে পারবেন না। আরেকজন বিচারপতিও হাইকোর্টে এ মামলার শুনানিতে ছিলেন। এ জন্য ওই দুই বিচারপতিকে বাদ দিয়ে মামলাটি শুনানির জন্য প্রধান বিচারপতিকে আপিল বিভাগের অন্য বিচারপতিদের নিয়ে পৃথক বেঞ্চ গঠন করতে হবে।

মামলার ভলিউম পর্যালোচনায় দেখা যায়, বিচারিক (নিম্ন) আদালতের রায়ের বিরুদ্ধে আসামিপক্ষের করা আপিল এবং আসামিদের মৃত্যুদণ্ড অনুমোদনে (ডেথ রেফারেন্স) রাষ্ট্রপক্ষের করা পৃথক আবেদনের ওপর ২০১৬ সালের ১৫ জুন রায় দেন হাইকোর্ট। রায়ে বিএনপি নেতা নুরুল ইসলাম সরকারসহ ছয়জনের মৃত্যুদণ্ড বহালের পাশাপাশি ১১ আসামিকে খালাস দেওয়া হয়। পরে আসামিদের খালাসের বিরুদ্ধে আপিল করে রাষ্ট্রপক্ষ। অন্যদিকে, হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করে দণ্ডপ্রাপ্ত অন্যান্য আসামি। দীর্ঘ অপেক্ষার পর চলতি বছরের ৭ জানুয়ারি পৃথক ওই আপিল নিষ্পত্তির জন্য প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বাধীন আপিল বিভাগের বেঞ্চের কার্যতালিকায় আসে। কিন্তু শুনানির সময় আপিলটি কার্যতালিকা থেকে আপাতত বাদ দেন আপিল বিভাগ।

এ বিষয়ে আসামিপক্ষের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী খন্দকার মাহবুব হোসেন বলেন, 'আপিল বিভাগের একজন বিচারপতি হাইকোর্টে থাকাকালে এ মামলার বিচারক ছিলেন। আরেক বিচারপতিও হাইকোর্টে এ মামলার শুনানিতে ছিলেন। আইনগতভাবে তারা আপিল বিভাগে মামলাটি শুনতে পারবেন না। পৃথক বেঞ্চ গঠনের মাধ্যমে মামলাটির শুনানি হবে। তাই আপিল বিভাগ মামলাটি আপাতত কার্যতালিকা থেকে বাদ দিয়েছেন।'

এ বিষয়ে রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল বিশ্বজিৎ দেবনাথ বলেন, আপিল বিভাগ সাময়িকভাবে মামলাটি কার্যতালিকা থেকে বাদ দিয়েছেন। পরে এটি আবারও কার্যতালিকায় আসবে।

২০০৪ সালের ৭ মে গাজীপুরে এক জনসভায় সন্ত্রাসীদের ব্রাশফায়ারে নিহত হন আওয়ামী লীগের এমপি আহ্‌সান উল্লাহ্‌ মাস্টার। এ ঘটনায় পরদিন তার ভাই মতিউর রহমান টঙ্গী থানায় একটি হত্যা মামলা করেন। ২০০৪ সালের ১০ জুলাই এ মামলায় পুলিশ অভিযোগপত্র জমা দাখিল করে। পরে ঢাকার একটি দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল ২০০৫ সালের ১৬ এপ্রিল প্রধান আসামি বিএনপি নেতা নুরুল ইসলাম সরকারসহ ২২ আসামিকে মৃত্যুদ ও ছয় আসামিকে যাবজ্জীবন কারাদ দেন। খালাস দেওয়া হয় দুই আসামিকে। নিম্ন আদালতের রায় হওয়ার পরপরই ওই বছরের বিভিন্ন সময়ে হাইকোর্টে আপিল করে কারাগারে আটক আসামিরা। এরপর ন্যায়বিচার না পাওয়ার শঙ্কায় ১১ দফা আসামিপক্ষ ও রাষ্ট্রপক্ষের পৃথক আবেদনে হাইকোর্টের একাধিক বেঞ্চ মামলাটি শুনানিতে অপারগতা প্রকাশ করেন। এরই ধারাবাহিকতায় ২০১৬ সালের ১৫ জুন রায় দেন হাইকোর্ট। রায়ে নুরুল ইসলাম সরকারসহ ছয়জনের মৃত্যুদণ্ড বহাল, সাতজনের সাজা কমিয়ে যাবজ্জীবন এবং ১১ আসামিকে খালাস দেওয়া হয়।

কর্মসূচি :আহ্‌সান উল্লাহ্‌ মাস্টারের মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে ঢাকা, গাজীপুরসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে করোনার স্বাস্থ্যবিধি মেনে দু'দিনের কর্মসূচি নেওয়া হয়েছে। এর অংশ হিসেবে গতকাল বৃহস্পতিবার শহীদ আহ্‌সান উল্লাহ্‌ মাস্টার এমপি স্মৃতি পরিষদ জাতীয় প্রেস ক্লাবে 'সন্ত্রাসমুক্ত সমাজ গঠনে রাজনীতিবিদ ও জনপ্রতিনিধিদের ভূমিকা' শীর্ষক অলোচনা ও স্মরণসভা করেছে।

আজ শুক্রবার সকালে গাজীপুর সিটি করপোরেশনের হায়দরাবাদ গ্রামে আহ্‌সান উল্লাহ্‌ মাস্টারের কবরে শ্রদ্ধা নিবেদন, বিকেলে মিলাদ ও দোয়া মাহফিল, ইফতার ও তবারক বিতরণ, স্মরণিকা প্রকাশ, আলোচনা ও স্মরণসভাসহ বিভিন্ন কর্মসূচি পালিত হবে। গাজীপুর সাংবাদিক ইউনিয়ন (জিইউজে), বাংলাদেশ সাংবাদিক অধিকার ফোরাম (বিজেআরএফ), ভাওয়াল সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক পরিষদ, ভাওয়াল আইডিয়াল একাডেমি, হায়দরাবাদ জনকল্যাণ সমিতি এবং ভাওয়াল শিশু-কিশোর ফোরামসহ বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সামাজিক সংগঠন ও প্রতিষ্ঠান স্বাস্থ্যবিধি মেনে নানা কর্মসূচি পালন করবে।

ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী জাহিদ আহসান রাসেল এমপি তার বাবা আহ্‌সান উল্লাহ্‌ মাস্টারের মৃত্যুবার্ষিকীর বিভিন্ন কর্মসূচিতে অংশ নিতে সর্বস্তরের জনগণের প্রতি অনুরোধ জানিয়েছেন।

মন্তব্য করুন