'সর্বাত্মক লকডাউনের' মধ্যেই শুরু হয়েছে ঈদযাত্রা। দূরপাল্লার বাস ও আন্তঃজেলা গণপরিবহন বন্ধ থাকলেও, যে যেভাবে পারছে ঈদ করতে গ্রামে ছুটছে। নদীপথেও দেখা যাচ্ছে উপচেপড়া ভিড়। করোনা সংক্রমণ রোধে গ্রামমুখী যাত্রীর এ ঢল ঠেকাতে সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ) বা কোনো সংস্থাকেই ভূমিকা নিতে দেখা যাচ্ছে না।

করোনা সংক্রমণ রোধে যে যেখানে আছেন সেখানেই ঈদ করার জন্য অনুরোধ জানিয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। মানুষের গ্রামে যাত্রা ঠেকাতে সরকারিভাবেও নানা হুঁশিয়ারি দেওয়া হলেও তার ফল দেখা যাচ্ছে না। বিআরটিএ চেয়ারম্যান বলেছেন, যাত্রীরা নিজে সচেতন না হলে লাখো মানুষের ঢল ভ্রাম্যমাণ আদালত, আইন দিয়ে ঠেকানো যাবে না। ঈদ উপলক্ষে গ্রামমুখী জনস্রোতকে আটকাতে পুলিশ সদর দপ্তর ও প্রশাসনের সহায়তা চেয়ে চিঠি দেওয়া হয়েছে।

গতকাল শুক্রবার সকাল থেকেই গ্রামমুখী যাত্রীর ঢল নামে গাবতলী টার্মিনাল এলাকায়। দুপুরে সেখানে গিয়ে দেখা যায়, অন্তত হাজার মানুষ কাউন্টারগুলোতে খোঁজ করছে বাস ছাড়বে কিনা। তবে দূরপাল্লার বাস না ছাড়ায় যাত্রীরা গাবতলী সেতু পার হয়ে প্রাইভেটকার, মাইক্রোবাস, সিএনজিচালিত অটোরিকশা ভাড়া করে বিভিন্ন জেলার উদ্দেশে ছুটছেন। মোটরসাইকেলও জনপ্রতি ৫০০ টাকা ভাড়ায় পাটুরিয়া ঘাটে যাত্রী পৌঁছে দিচ্ছে। আবার ঢাকা জেলার অভ্যন্তরে চলা বাস নবীনগর পর্যন্ত যাত্রী পরিবহন করছে। সেখান থেকে বাস বদলে ঘাটে যাচ্ছেন সবাই।

গাবতলী সেতুর পশ্চিম প্রান্তে কথা হয় প্রাইভেটকার চালক মো. লিটনের সঙ্গে। তিনি জানালেন, লকডাউনের কারণে অ্যাপের যাত্রী পরিবহন বন্ধ থাকায় পেটের দায়ে পথে নেমেছেন। গাবতলী থেকে পাটুরিয়া ঘাট পর্যন্ত যাত্রী নিয়ে যাচ্ছেন। প্রতিবার চারজন যাত্রী নিচ্ছেন। জনপ্রতি ৫০০ টাকা ভাড়া। ঘাটে যাত্রী নামিয়ে আবার গাবতলী ফিরে আসছেন। ৫০০ থেকে ৬০০ টাকার গ্যাস লাগছে। বাকিটা তার রোজগার।

গাবতলী সেতুর ওপারে আমিনবাজারে এমন শতাধিক প্রাইভেটকার ও মাইক্রোবাস দেখা যায়। গাড়িগুলো পাটুরিয়া, যমুনা নদীর বঙ্গবন্ধু সেতু পর্যন্ত ভাড়ায় যাত্রী নিচ্ছে। মাইক্রোবাসে ১০ থেকে ১৬ জন যাত্রী নেওয়া হচ্ছে গাদাগাদি করে। সিএনজি অটোরিকশায় এসব দূরত্বে যাত্রী নেওয়া হচ্ছে। আবার অনেক প্রাইভেটকার, মাইক্রোবাস সিরাজগঞ্জ, বগুড়া, রংপুর, দিনাজপুর যাচ্ছে। তবে উত্তরের পথে যাত্রী পরিবহন বেশি করছে ট্রাক ও পিকআপের মতো পণ্যবাহী যানবাহন।

আগের রাতে ঢাকার মোহাম্মদপুরে সবজি নিয়ে আসা পিকআপ চালক রাসেল হোসেন জানান, যাত্রীরাই জোর করে তার গাড়িতে উঠেছেন। জনপ্রতি ১০০ টাকা নিচ্ছেন। পেছনে থাকা তিন যাত্রী 'হেলপারের' ভূমিকায় রয়েছেন। তারাই ডেকে যাত্রী তুলছেন। ২০-২২ জন হলেই পিকআপ ছেড়ে দেবেন।

বগুড়ার যাত্রী হাফিজুর রহমান জানালেন, ঢাকায় তিনি একা থাকেন। স্ত্রী, সন্তান বগুড়ায় থাকেন। লকডাউনের কারণে ঢাকায় একা থেকে কী করবেন। তাই যেভাবেই হোক বাড়ি চলে যেতে চান। যা পাবেন, তাতেই বাড়ি যাবেন। হাফিজুরের পরিকল্পনা হলো- গাবতলী থেকে পিকআপে চন্দ্রা যাবেন। সেখান থেকে যমুনার বঙ্গবন্ধু সেতু পর্যন্ত যাবেন। সেতু পার হতে না পারলে নৌকায় নদী পার হবেন। মোবাইল ফোনে খবর নিয়েছেন নদীর ওপার থেকে অটোরিকশা ও ভাড়ায় মোটরসাইকেল পাওয়া যায়। তাতে করে বগুড়ার আদমদীঘির গ্রামের যাবেন। করোনা হলেও কিছু করার নেই।

করোনা সংক্রমণ রোধে ৫ এপ্রিল থেকে শুরু হওয়া লকডাউনে গণপরিবহন চলাচল বন্ধ ছিল। মাঝে কয়েকদিন মহানগর এলাকায় অর্ধেক আসন খালি রেখে বাস চলাচল করে। ১৪ এপ্রিল থেকে শুরু হওয়া 'সর্বাত্মক লকডাউনে' দূরপাল্লার সঙ্গে সব ধরনের গণপরিবহন চলাচল বন্ধ করা হয়। এতে কর্মহীন হয়ে পড়া মালিক-শ্রমিকদের আন্দোলনে গত বৃহস্পতিবার থেকে জেলার অভ্যন্তরে গণপরিবহন চালুর অনুমতি দেয় সরকার। স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক জানিয়েছিলেন, নানা চাপের কারণে গণপরিবহন চালুর অনুমতি দেওয়া হয়েছে।

মালিক-শ্রমিক নেতারা এখন চাইছেন আন্তঃজেলা এবং দূরপাল্লার বাস চলাচলের অনুমতিও দেওয়া হোক। এ দাবিতে আজ শনিবার সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশনের সভাপতি শাজাহান খান ও সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির মহাসচিব খন্দকার এনায়েত উল্যাহ সংবাদ সম্মেলন করবেন।

বাস মালিকরা বলছেন, আন্তঃজেলা ও দূরপাল্লার বাস বন্ধ রাখায় করোনা ঝুঁকি আরও বেড়েছে। ঢাকা-রংপুর রুটের আগমনী পরিবহনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোস্তফা আজাদ চৌধুরী সমকালকে বলেছেন, দূরপাল্লার বাস বন্ধ থাকায় যাত্রীরা এখন ভেঙে ভেঙে যাচ্ছেন। এতে সংক্রমণ বাড়ছে।

যাত্রীকল্যাণ সমিতির মহাসচিব মোজাম্মেল হক চৌধুরী বলেছেন, আর কয়েকদিন পর কোনো নিয়ম-কানুনই থাকবে না। যাত্রীরা যেভাবে পারবেন, যাবেন। তার চেয়ে সেনাবাহিনীর তত্ত্বাবধানে গণপরিবহন চালু করা দরকার।

শিমুলিয়া-বাংলাবাজার নৌপথে উপচেপড়া ভিড় :লৌহজং (মুন্সীগঞ্জ) সংবাদদাতা জানান, গতকাল সকাল থেকে মুন্সীগঞ্জের শিমুলিয়া ও মাদারীপুরের বাংলাবাজার নৌপথে দক্ষিণাঞ্চলমুখী যাত্রী ও যানবাহনের প্রচণ্ড চাপ ছিল। ফেরিতে যাত্রীর চাপ সামলাতে হিমশিম খেতে হয় ঘাট কর্তৃপক্ষের। তবে এদিন দুপুরের পর থেকে যাত্রীর চাপ কিছুটা কমতে থাকে।

স্বাস্থ্যবিধি ছাড়াই ফেরিতে গাদাগাদি করে যাত্রী পারাপার করায় করোনা সংক্রমণের ঝুঁকি আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। শিমুলিয়া ফেরিঘাটের ব্যবস্থাপক (বাণিজ্য) সাফায়াত আহম্মেদ বলেন, মানুষের মধ্যে করোনা নিয়ে কোনো ভাবনা নেই। এত বলাবলি করেও যাত্রীদের সচেতন করা যাচ্ছে না।

দৌলতদিয়ায়ও নেই সামাজিক দূরত্ব :গোয়ালন্দ (রাজবাড়ী) প্রতিনিধি জানান, গোয়ালন্দ উপজেলার দৌলতদিয়া ঘাটেও ঘরমুখো মানুষের ঢল দেখা যায়। তবে স্বাস্থ্যবিধি মানার বালাই নেই। এছাড়া দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ২১ জেলার প্রবেশদ্বার দৌলতদিয়া-পাটুরিয়া নৌপথে ট্রাক বুকিং কাউন্টারে পণ্যবাহী ট্রাকের টিকিটে অতিরিক্ত টাকা আদায়ের অভিযোগ পুরোনো। গতকাল নির্ধারিত ফির অতিরিক্ত টাকা নেওয়ার অভিযোগে বিআইডব্লিউটিসির কর্মকর্তা গোলাম মোস্তফাকে ২০ হাজার টাকা জরিমানা করেন ভ্রাম্যমাণ আদালত।

বিআইডব্লিউটিসি দৌলতদিয়া ঘাট শাখার সহকারী ব্যবস্থাপক মজিবার হোসেন মোল্লা জানান, ঘাটে ছোট-বড় মিলিয়ে ১৬টি ফেরির মধ্যে ৬টি দিয়ে সীমিত আকারে জরুরি যানবাহন পারাপার করা হচ্ছে। ওপর মহলের নির্দেশ পেলে সব ফেরিই চালু করা হবে।

মন্তব্য করুন