চৌদ্দ বছর বয়সী আব্দুর রউফ পড়ে ষষ্ঠ শ্রেণিতে। এখন তার হেসে-খেলে দিন কাটানোর বয়স। কিন্তু তার শৈশবের আনন্দ কেড়ে নিয়েছে থ্যালাসেমিয়া। তিন মাস বয়সে তার এই রোগ ধরা পড়ে। তখন থেকেই পনেরো দিন পর পর এক ব্যাগ করে রক্ত নিতে হয় তাকে, সঙ্গে নিতে হয় আয়রন কমানোর ব্যয়বহুল ওষুধ। রক্ত নিলে খানিকটা সুস্থ-স্বাভাবিক থাকে সে। কিন্তু রক্ত কমে গেলেই শরীর দুর্বল হয়ে পড়ে। রউফের মা সবুজা বেগম জানান, ছেলের থ্যালাসেমিয়া রোগ ধরা পড়ার পর সংসারে নানা কটু কথা শুনেছেন তিনি। অবজ্ঞা-অবহেলায় তাকে আলাদা হয়ে যেতে হয়েছে স্বামীর কাছ থেকে। অন্যের বাড়িতে কাজ করে, কখনও মাঠে দিনমজুরি করে সামান্য যা আয় হয়েছে, তা দিয়েই ছেলের চিকিৎসা করিয়েছেন।

সবুজা বলেন, 'আমার ঘর-দরজা কিছুই নাই, টাকাপয়সা নাই, তারপরও আমার কাছে ছেলের মূল্যই সবচেয়ে বেশি। সবাই বলে, ছেলে তো বেশিদিন বাঁচবে না, চিকিৎসা করিয়ে কী হবে? অন্যের কথায় কান দেই না, ছেলেটা আমাকে মা বলে ডাকে। এতেই আমার শান্তি।' তিনি জানান, গত পাঁচ বছর ধরে থ্যালাসেমিয়া ফাউন্ডেশন হাসপাতালে বিনামূল্যে চিকিৎসা পাচ্ছে তার ছেলে।

আরও দুই শিশুর অভিভাবক- আলিয়া জাহান এবং জাহিদ লিটনের গল্পও একই রকম। থ্যালাসেমিয়া আক্রান্ত সন্তানকে বাঁচাতে লড়াই করে চলেছেন তারা। আলিয়া বলেন, 'রক্ত দেওয়ার পাশাপাশি প্রতি মাসে চার হাজারেরও বেশি টাকার ওষুধ খাওয়াতে হয়। যেখানে সংসার চালানোই কঠিন, সেখানে ছেলের সুস্থতার জন্যই প্রতি মাসে খরচ করতে হয় পাঁচ থেকে ছয় হাজারের বেশি টাকা। কারও কারও আট থেকে ১০ হাজারেরও বেশি টাকা লাগে। তবে যত টাকাই লাগুক আর যত কষ্টই হোক সন্তানকে সুস্থ করে তুলব।'

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার পরিসংখ্যানমতে, বাংলাদেশের জনসংখ্যার সাত শতাংশ, অর্থাৎ প্রায় এক কোটি ১০ লাখ মানুষ থ্যালাসেমিয়া রোগের বাহক। থ্যালাসেমিয়ার বাহক ছেলেমেয়ের মধ্যে বিয়ের ফলে প্রতিবছর নতুন করে জন্ম নিচ্ছে সাত হাজার থ্যালাসেমিয়ায় আক্রান্ত শিশু।

এমন এক পরিস্থিতিতে আজ শনিবার বিশ্বজুড়ে পালিত হচ্ছে বিশ্ব থ্যালাসেমিয়া দিবস। বৈশ্বিক মহামারি করোনার প্রেক্ষাপটে অনলাইনে জনসচেতনতা সৃষ্টির উদ্যোগ নেওয়ার মধ্য দিয়ে দিবসটি পালন করছে বাংলাদেশ থ্যালাসেমিয়া ফাউন্ডেশন, বাংলাদেশ থ্যালাসেমিয়া সমিতি হাসপাতাল, সন্ধানী, মেডিসিন ক্লাব ও পল্গ্যাটফর্ম। এ বছর এ দিবসের প্রতিপাদ্য বিষয়- 'বিয়ের আগে পরীক্ষা করলে রক্ত, সন্তান থাকবে থ্যালাসেমিয়া মুক্ত'। দিবসটি উপলক্ষে বাণী দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

ল্যাব ওয়ান ফাউন্ডেশন অব থ্যালাসেমিয়ার তথ্য মতে, দেশের মোট জনসংখ্যার এক কোটি ১০ লাখ মানুষ থ্যালাসেমিয়া রোগের জিন বাহক। এর মধ্যে চার শতাংশ এ রোগে আক্রান্ত। বেঁচে থাকার জন্য তাদের নিয়মিত রক্ত নিতে হয়।

চিকিৎসকরা জানান, থ্যালাসেমিয়া একটি বংশগত রক্ত রোগ। থ্যালাসেমিয়ায় আক্রান্ত রোগীদের শরীরে রক্তের লোহিতকণিকা পর্যাপ্ত পরিমাণে তৈরি হয় না। ফলে এদের মারাত্মক রক্তশূন্যতা দেখা দেয়। থ্যালাসেমিয়া রোগীরা প্রতি মাসে এক-দুই ব্যাগ রক্ত নিয়ে বেঁচে থাকে। চিকিৎসা না করানো হলে এই রোগী রক্তশূন্যতায় মারা যায়। মানবকোষে রক্ত তৈরির জন্য দুটি জিন থাকে। কোনো ব্যক্তির রক্ত তৈরির একটি জিনে ত্রুটি থাকলে তাকে থ্যালাসেমিয়ার বাহক বলে, আর দুটি জিনেই ত্রুটি থাকলে তাকে থ্যালাসেমিয়া রোগী বলে।

শিশু জন্মের এক থেকে দুই বছরের মধ্যে থ্যালাসেমিয়া রোগ ধরা পড়ে। এই রোগের লক্ষণগুলো হলো- ফ্যাকাসে হয়ে যাওয়া, দুর্বলতা, ঘন ঘন ইনফেকশন, শিশুর ওজন বৃদ্ধি না হওয়া, জন্ডিস, খিটখিটে মেজাজ ইত্যাদি। থ্যালাসেমিয়া রোগের কোনো সহজলভ্য স্থায়ী চিকিৎসা বা টিকা নেই। এ রোগ থেকে মুক্তির একমাত্র উপায় হচ্ছে প্রতিরোধ। স্বামী-স্ত্রী দুজনই যদি থ্যালাসেমিয়ার বাহক হন, শুধু তখনই সন্তানদের এ রোগ হতে পারে। কিন্তু স্বামী-স্ত্রীর একজন যদি বাহক হন এবং অন্যজন সুস্থ হন, তাহলে কখনও এ রোগ হবে না।

বাংলাদেশ থ্যালাসেমিয়া সমিতি হাসপাতালের উপদেষ্টা সৈয়দ দিদার বক্স বলেন, 'থ্যালাসেমিয়া বংশগত রক্ত রোগ। থ্যালাসেমিয়া আক্রান্ত রোগীর শরীরে রক্তে পর্যাপ্ত পরিমাণে হিমোগ্লোবিন তৈরি হয় না। চিকিৎসা না করানো হলে থ্যালাসেমিয়া রোগী ১০-১৫ বছরের মধ্যে মারা যায়।'

মন্তব্য করুন