আকস্মিক লকডাউন যে জীবন ও জীবিকায় এভাবে আচমকা তালা ঝুলিয়ে দেবে, তা দুঃস্বপ্নেও ভাবেননি কেরানীগঞ্জের পোশাকপল্লির ব্যবসায়ী মনজু মাদবর। গত বছর করোনা সংক্রমণের শুরুর দিকে কোনোরকমে ব্যবসা চালিয়ে নিলেও লকডাউন দীর্ঘ হতেই চোখের সামনে অন্ধকার নেমে আসতে শুরু করে তার। পুরো বছর দোকান ও কারখানা ভাড়া, কর্মচারীর বেতন এবং সংসার চালাতেই হিমশিম খেয়েছেন তিনি। এবার ঈদুল ফিতরকে ঘিরে আশার আলো দেখছিলেন। শবেবরাতের আগেই রাত-দিন খেটে কারখানায় ২৫ লাখ টাকার জিন্স প্যান্ট তৈরি করেছেন। সেই পণ্য দোকানে তুলতেই ঘোষণা আসে লকডাউনের। টানা এক সপ্তাহ বন্ধ দোকান। এরপর খুলে দেওয়া হয়। কিন্তু গণপরিবহন বন্ধ থাকায় ঢাকার বাইরে থেকে আসছেন না পাইকাররা। ফলে ঈদের আগের তৈরি করা পণ্য নিয়ে তিনি এখন বিপাকে পড়েছেন।

মনজু বলেন, 'গত দুই বছরে ব্যবসা চালাতে গিয়ে ২৭ লাখ টাকা ঋণগ্রস্ত হয়েছি। ঋণ শোধের চিন্তায় রাতে ঘুম আসে না। ভাগ্যটাই খারাপ। বিদেশ থেকে চলে আসলাম, করোনার কারণে ব্যবসাও শেষ। টিকে থাকার শেষ ভরসা পাচ্ছি না।'

ঋণের বোঝা মাথায় নিয়ে ব্যবসা টিকিয়ে রাখা তো দূরের কথা, সংসার চালাতেই হিমশিম খাচ্ছেন মনজু। তবুও সুদিনের আশায় দোকান খুলে বসে থাকেন। পাওনাদাররা আসেন, কর্মচারীরা আসেন- তাদের কাছ থেকে অনেকটা পালিয়ে বেড়ান তিনি।

কেরানীগঞ্জের আগানগরের মোল্লা ম্যানশনে মনজু মাদবরের দোকান। সেখানে গিয়ে দেখা যায়, ক্রেতাশূন্য দোকানে বসে আছেন তিনি। চেহারায় বিষণ্ণতার ছাপ। শোনালেন জীবনের নানা বাঁকের গল্প। ১২ বছর আগে স্বপ্ন পূরণের আশায় ধার-দেনা করে পাড়ি দেন লিবিয়ায়। স্বপ্ন ধরা দেওয়ার আগেই ওই দেশে শুরু হয় যুদ্ধ। বাধ্য হয়ে ফিরে আসেন দেশে। ২০১০ সালের শেষ দিকে পরিবারের সদস্যদের সহযোগিতা ও ঋণ নিয়ে প্রতিষ্ঠা করেন জিন্স প্যান্টের কারখানা। ১০ জন কর্মচারী দিয়ে শুরু করা মনজুর প্রতিষ্ঠান এক বছরের মধ্যেই লাভের মুখ দেখে। কর্মচারীর সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ৪৭ জন। ব্যবসা চালাতে গিয়ে ১৫ লাখ টাকা পাইকারি ব্যবসায়ীদের কাছে বকেয়াও পড়ে যায়। তবুও ভালোই চলছিল ব্যবসা। কিছু সঞ্চয়ও করেছেন। আশা ছিল ব্যবসা আরও বড় করার। কিন্তু গত বছর থেকে দেশে শুরু হয় করোনার সংক্রমণ। বন্ধ হয়ে যায় ব্যবসা। লোকসান গুনতে গুনতে শেষ হয়ে যায় সব সঞ্চয়।

মনজু বলেন, এক সময় ঈদের আগে দৈনিক দেড়-দুই লাখ টাকা বিক্রি হলেও এখন ৪-৫ হাজার টাকা বিক্রি করতে কষ্ট হচ্ছে। সবকিছু বদলে গেছে। সংসার চালাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে। মনজুর প্রশ্ন, 'এভাবে কত দিন?'

কষ্টের কথা বলতে গিয়ে চোখ ছলছল করছিল মনজুর। বলেন, 'সংসারে আমরা ৮ ভাই বোন। আছেন মা-বাবা। এখনও বিয়ে করিনি। ব্যবসা চালাতে পরিবার নানা সময়ে অর্থনৈতিক সহায়তা দিলেও তাদের জন্য কিছুই করতে পারলাম না। রাতে ঘরে গেলে নিজেকে অপরাধী মনে হয়। কারও দিকে চোখ রেখে কথা বলতে পারি না।'

তবে এমন দুঃসময়েও হাল ছাড়তে চান না এই যুবক। বলেন, 'সুদিনের আশায় ব্যবসাটা ধরে রাখব। এ ছাড়া আর কোনো উপায় নেই। একদিন হয়তো অন্ধকার কেটে যাবে।'

মন্তব্য করুন