তেইশ বছর ধরে রাজধানী ঢাকায় ফেরি করে আইসক্রিম বিক্রি করে আসছেন সেলিম শেখ। এটিই তার একমাত্র পেশা। গত বছরের মার্চের আগ পর্যন্ত অভাব-অনটন তেমন স্পর্শ করতে পারেনি তাকে। করোনার ওই বছর কোনোরকমে কাটিয়ে উঠতে পারলেও এ বছরটা যেন 'গলার কাঁটা' হয়ে উঠেছে তার কাছে। ভেবেছিলেন, একটি বছর অভাব-অনটনে কাটলেও এ বছর সবকিছুই স্বাভাবিক হয়ে যাবে। আগের মতোই ব্যবসা জমে উঠবে। সচ্ছলতা ফিরবে সংসারে। কিন্তু না, তার স্বপ্ন এখন দুঃস্বপ্ন; দুঃসময় এসে থামিয়ে দিচ্ছে তার সংসারের চাকা।

সেলিমের গ্রামের বাড়ি গোপালগঞ্জ জেলা সদরের হাটিয়াগরে। তিন মেয়ে ও এক ছেলে তার। বড় দুই মেয়ের বিয়ে হয়ে গেছে। এক ছেলে ও এক মেয়েকে নিয়ে স্ত্রী মাকসুদা বেগম গ্রামের বাড়ি থাকেন। ছেলে চতুর্থ শ্রেণি আর মেয়ে অষ্টম শ্রেণির শিক্ষার্থী। সেলিম থাকেন তেজগাঁওয়ের নাবিস্কো এলাকায়- একটি আইসক্রিম কারখানায়।

৪৫ বছর বয়সী সেলিম শেখের সঙ্গে গত ২৬ এপ্রিল দুপুরে কথা হয় হাতিরঝিলের পূর্ব পাশে। তখন তিনি আইসক্রিম ফেরি করছিলেন। আধাঘণ্টা তার সঙ্গে দাঁড়িয়ে কথা হয়। এর মধ্যে একজনও আইসক্রিম কেনার জন্য আসেননি। তিনি জানালেন, ফেব্রুয়ারির শেষের দিক থেকে আইসক্রিম বিক্রির মৌসুম ধরা হয়। চলে আগস্ট পর্যন্ত। মৌসুমে প্রতিদিন সাত-আট হাজার টাকার আইসক্রিম বিক্রি হতো তার। এতে আয় হতো ১২শ থেকে ১৩শ টাকা। কিন্তু বেচাকেনায় ছেদ পড়েছে গত বছরের মার্চ থেকে।

করোনা আসার পর থেকে স্কুল-কলেজ বন্ধ। অথচ স্কুল-কলেজের সামনেই আইসক্রিম বিক্রি বেশি হয়। এ অবস্থায় মাঝেমধ্যে পাড়া-মহল্লায় ঘুরে আইসক্রিম বিক্রি করেন। তবে কঠোর লকডাউনের সময় বের হওয়া যায় না। সেলিম জানান, এবার প্রথম লকডাউন দেওয়ার পর গ্রামের বাড়ি চলে গিয়েছিলেন তিনি। কিন্তু সাত-আট দিন থেকে আবার চলে এসেছেন। কারণ গ্রামে আয়ের কোনো পথ নেই তার। তাই রাজধানীতে ফিরে কয়েকদিন ধরে অল্প আইসক্রিম নিয়ে বের হচ্ছেন বিক্রির প্রত্যাশায়। মুশকিল হলো, করোনার কারণে আইসক্রিম এখন কেউ তেমন খেতে চায় না। শিশুরাই এখন তাদের ক্রেতা। দিনে আটশ থেকে এক হাজার টাকা বেচাবিক্রি হয় এখন। এতে দেড়-দুইশ টাকা লাভ থাকে। এই টাকা নিজের খাওয়া-দাওয়া করতেই শেষ হয়ে যায়। বাড়িতে টাকা পাঠাতে পারেন না বলে জানালেন তিনি।

সেলিম বলেন, '২৩ বছরের আইসক্রিম ব্যবসায় কখনও মন্দা ছিল না- যা শুরু হয়েছে গত বছরের মার্চ থেকে। আইসক্রিম ব্যবসায় মাসে ৩০-৩৫ হাজার টাকা আয় হতো। এখন চার ভাগের এক ভাগও হয় না। এ আয়ে সংসার চলে না। অথচ ছয় মাস ধরে আমার স্ত্রী অসুস্থ। তার পেটে পাথর। অপারেশন করাতে হবে। কিন্তু হাতে টাকা নেই। ভাবছিলাম করোনা কেটে যাবে এবং এবারের মৌসুমে আগের মতোই ব্যবসা হবে। কিন্তু কিছুই হচ্ছে না। কী করব ভেবে পাচ্ছি না। এভাবে চললে আমরা তো শেষ হয়ে যাব।'

মন্তব্য করুন