পোশাক শ্রমিক নার্গিস এসেছেন রাজধানীর চন্দ্রিমা সুপার মার্কেটে ঈদের কাপড় কিনতে। কোলে করে নিয়ে এসেছেন তিন মাসের বাচ্চাকে। দু'জনের কারও মুখেই নেই মাস্ক। হাজারো মানুষের ভিড়ে ধাক্কাধাক্কি করেই পরিবারের সবার জন্য পোশাক কিনছিলেন তিনি। মাস্ক ছাড়া কেন বাইরে এসেছেন জিজ্ঞেস করলে উত্তর দেন, 'কয় টাকা আর ইনকাম করি, প্রতিদিন মাস্ক কিনব কীভাবে? আর আমরা গরিব মানুষ, সব আল্লাহর ইচ্ছা।' বলেই তিনি ঢুকে পড়েন ভিড়ের মধ্যে।

গতকাল শুক্রবার রাজধানীর বাজারগুলো ঘুরে এমন দৃশ্যই চোখে পড়েছে বেশি। করোনাভাইরাস সংক্রমণের ঝুঁকি নিয়েই রাজধানীতে জমে উঠেছে ঈদবাজার। বিপণিবিতানগুলোয় ছিল ক্রেতার উপচেপড়া ভিড়। তবে স্বাস্থ্যবিধি মানার ক্ষেত্রে উদাসীনতা ছিল চোখে পড়ার মতো। ক্রেতারা সামাজিক দূরত্ব মোটেই মানছেন না, যদিও তাদের বেশিরভাগের মুখে মাস্ক লক্ষ্য করা গেছে। এ ছাড়া কয়েকটি মার্কেটের প্রবেশপথে জীবাণুনাশক টানেল থাকলেও হ্যান্ড স্যানিটাইজার ব্যবহার চোখে পড়েনি। তবে বিক্রি ভালো হওয়ায় খুশি নিউমার্কেট, চাঁদনীচক ও গাউছিয়া মার্কেটের বিক্রেতারা।

চন্দ্রিমা মার্কেটে স্ত্রী ও দুই সন্তান নিয়ে কেনাকাটা করতে আসা শফিউল বারী বলেন, 'প্রতিটি দোকানে ভিড়। যে কারণে কারও পক্ষেই স্বাস্থ্যবিধি বা সামাজিক দূরত্ব মানা সম্ভব নয়। ঈদে নিজেদের জন্য না হলেও বাচ্চাদের জন্য নতুন জামা-কাপড় কিনতে হবে। তাই ঝুঁকি থাকলেও বাজারে এসেছি।'

দোকান মালিকরা বলেন, 'যতটুকু সম্ভব স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলছি। তবে ক্রেতাদের দূরত্ব বজায় রেখে কেনাকাটা করতে অনুরোধ করলেও তারা শুনছেন না। বলতে গেলে বরং বিপরীত ফল হয়।'

নিউমার্কেটের থার্টি ফ্যাশনের কর্ণধার মো. মামুনুর রশীদ বলেন, 'এ বছরের আজকের দিনটাতেই সর্বোচ্চ বিক্রিবাট্টা হচ্ছে। বৃহস্পতিবারও মোটামুটি বিক্রি হয়েছে। বেশিরভাগ চাকরিজীবীর বৃহস্পতিবার বেতন হওয়ায় ছুটির দিনে চাপটা বেশি। এক্ষেত্রে আমরা স্বাস্থ্যবিধি মানার চেষ্টা করলেও ক্রেতারা মানছেন না।'

এম এস খান ফ্যাশন হাউসের বিক্রয়কর্মী সাকিবুল হাসানেরও একই ভাষ্য। তিনি বলেন, 'করোনা মহামারির কারণে এতদিন তেমন বিক্রি হয়নি। আজ ছুটির দিন হওয়ায় ক্রেতার ভিড় অনেক।'

দুপুরে বসুন্ধরা শপিংমলে গিয়ে দেখা যায়, তপ্ত রোদেও ক্রেতারা দীর্ঘ লাইন ধরে স্বাস্থ্যবিধি মেনে বিপণিবিতানে ঢুকছেন। স্বাস্থ্যবিধি মেনে কেনাকাটার চেষ্টা থাকলেও ক্রেতার চাপে তা মানার সুযোগ নেই কারও। বিক্রেতারা বলছেন, ক্রেতার চাপে সামাজিক দূরত্ব মানা মুশকিল হয়ে পড়েছে। তবে বিক্রি বৃদ্ধি পাওয়ায় খুশি ব্যবসায়ীরা।

চলমান লকডাউনে ব্যবসায়ীদের কথা বিবেচনা করে গত ২৫ এপ্রিল থেকে ঢাকার দোকানপাট ও বিপণিবিতান খুলে দেয় সরকার। কিন্তু তখন বন্ধ ছিল গণপরিবহন। তাই ক্রেতাও ছিল কম। তবে, ৫ মে থেকে বাস চালুর পর পরিস্থিতি অনেকটা পাল্টেছে।

মিরপুর, ধানমন্ডি, মালিবাগ, শান্তিনগরের বিভিন্ন মার্কেটসহ যমুনা ফিউচার পার্কে স্বাস্থ্যবিধি মানার ক্ষেত্রেও পার্থক্য দেখা যায়। অভিজাত মার্কেট ও শপিংমলগুলোর প্রবেশমুখে ক্রেতাদের জীবাণুমুক্ত করা হচ্ছিল। মাস্ক ছাড়া প্রবেশ করতে দেওয়া হয়নি। অনেক মার্কেটে মাইকে ক্রেতাদের স্বাস্থ্যবিধি মানার অনুরোধ করা হলেও ক্রেতাদের মধ্যে তা অনুসরণের প্রবণতা তেমন দেখা যায়নি। মার্কেটের ভেতরে সামাজিক দূরত্ব মানার ক্ষেত্রেও ক্রেতাদের মধ্যে সচেতনতা লক্ষ্য করা যায়নি।

এদিকে, রাজধানীর বিভিন্ন ফুটপাতে গড়ে তোলা ভ্রাম্যমাণ দোকানে তেমন ভিড় দেখা যায়নি। ক্রেতাদের উপস্থিতি গত বছরগুলোর তুলনায় অনেক কম। বিক্রেতারা ক্রেতাদের অপেক্ষায় সময় পার করছেন। শুক্রবার ঢাকা কলেজের সামনের অংশ, মিরপুর ১০, ফার্মগেট, গুলিস্তানসহ বিভিন্ন এলাকায় এ চিত্র দেখা যায়। গুলিস্তানের জুতার দোকানের ব্যবসায়ী আলামিন বলেন, 'সাধারণত ঈদের বাজারে কখনও এত কম বিক্রি হয় না। চাহিদা অনুযায়ী কোনো ক্রেতা আসছে না। ফুটপাতে ঈদ ছাড়াও সবসময় অনেক ভিড় থাকে; কিন্তু এখন ঈদ সামনে রেখেও তেমন ভিড় দেখা যাচ্ছে না।

ঢাকা কলেজের সামনে ছেলেদের প্যান্ট বিক্রি করেন রুবেল। তিনি বললেন, 'গত সাত বছর ধরে এখানে প্যান্ট বিক্রি করি। এই রকম লোকসানের মধ্যে কখনও পড়তে হয়নি। খুব খারাপ অবস্থায় যাচ্ছে দিন। করোনার আগে ঋণ করে দোকানে ঈদের মালামাল উঠিয়েছিলাম। কিন্তু এখন দেখি চালানটাই ঠিকমতো ওঠাতে পারছি না।'

ফার্মগেট এলাকায় ফুটপাতের ব্যবসায়ীরা বলেন, 'ক্রেতারা দেখে দেখে চলে যাচ্ছে। কেউ তেমন কিছু কিনছে না। ফুটপাতে বসতে হলেও আমাদের চাঁদা দিয়ে বসতে হয়। বেচা-বিক্রি চাহিদামতো হচ্ছে না। অথচ চাঁদার টাকা ঠিকই দিতে হচ্ছে। এতদিন সব বন্ধ ছিল। বড় ইচ্ছা ছিল ঈদের আগে কিছু বিক্রি হবে। চালানটা ঠিকমতো ওঠাতে পারব। সেটাও হচ্ছে না।'

মন্তব্য করুন