স্বামী আইনজীবী সহকারী ফারুক মিয়াকে হত্যার পর আসামিদের জীবননাশের হুমকিতে দুই সন্তান নিয়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছে আছমা বেগমের অসহায় পরিবার। সম্প্রতি কুমিল্লার দাউদকান্দির জামালকান্দি গ্রামে ফারুকের বসতবাড়ির টিনের ঘরও প্রকাশ্যে আগুনে পুড়িয়ে দিয়েছে আসামিরা। স্বামী ও বসতবাড়ি হারিয়ে সর্বস্বান্ত আছমা বিচারের আশায় পথে পথে ঘুরছেন। মামলা করেও কোনো কিনারা পাচ্ছেন না।

আছমা বেগম সমকালকে জানিয়েছেন, আসামিরা তার স্বামী ফারুক মিয়াকে নৃশংসভাবে কুপিয়ে হত্যা করে ক্ষ্যান্ত হয়নি, মামলা প্রত্যাহারেরও হুমকি দিচ্ছে। আদালত থেকে জামিনে বেরিয়ে আসামিরা তার নাবালক দুই সন্তানসহ তাকে প্রতিনিয়ত হত্যার হুমকি দিচ্ছে। আসামি মো. শুভ, দীন ইসলাম, মশিউর রহমান বাঁশিসহ কয়েকজন গত ২৯ ডিসেম্বর তার ঘর আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দিয়েছে।

মামলার বিবরণে জানা গেছে, ২০২০ সালের ২৬ মে ফারুক মিয়াকে এলাকার সোনাকান্দা ও খৈয়াখালী ব্রিজ-সংলগ্ন এলাকায় পূর্বপরিকল্পনা অনুযায়ী আসামিরা ধারালো অস্ত্র (দা, ছোরা, টেঁটা, রড) দিয়ে ফারুককে ঘেরাও করে। মামলার এক নম্বর আসামি তারেক জুনায়েদ জনির নির্দেশে অন্য আসামিরা তাকে এলোপাতাড়িভাবে আঘাত করে। এতে ফারুকের শরীরের বিভিন্ন স্থানে গুরুতর জখম হয়। আসামি সায়মন রিয়াদ জয় ও জিহানুল হক জিদানের হাতে থাকা লোহার রড দিয়ে ফারুককে হত্যার উদ্দেশ্যে পিটিয়ে হাড়ভাঙা জখম করে। ফারুকের সঙ্গে থাকা ২০ হাজার টাকা, মোবাইল ফোন এবং স্বর্নের আংটি ছিনিয়ে নেয় এবং তাকে রাস্তার পাশে ফেলে পালিয়ে যায় আসামিরা।

পরে তাকে রক্তাক্ত অবস্থায় স্থানীয় উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করা হয়। অবস্থা আশঙ্কাজনক হলে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকায় পঙ্গু হাসপাতালে পাঠানো হয়। সেখান থেকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হলে গত বছরের ১০ জুন চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান ফারুক। আহতের পর ফারুকের স্ত্রী আছমা বেগম বাদী হয়ে আসামিদের বিরুদ্ধে দাউদকান্দি মডেল থানায় প্রথমে জিডি করেছিলেন। পরে ফারুকের মৃত্যুর পর মামলাটি হত্যা মামলায় রূপান্তরিত হয়। ফারুক মিয়া (৩১) কুমিল্লা জেলা আইনজীবী সমিতির সহকারী (ক্লার্ক) হিসেবে কর্মরত ছিলেন।

এর আগে ২০১৮ সালের ১৪ ডিসেম্বর ফারুকের ঘরে প্রবেশ করে ইয়াবা সেবনের চেষ্টা করে আসামি জনি, জয়, জিদান ও জিলানী। বাধা দিলে ফারুকের স্ত্রী আছমা বেগমের তলপেটে লাথি মারে আসামি জনি। আহত অবস্থায় তাকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। পরে ফারুক বাদী হয়ে আসামিদের বিরুদ্ধে ভাঙচুর ও চুরি-ডাকাতির অভিযোগে আদালতে মামলা করেন। পিবিআই তদন্ত করে আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগের সত্যতা পেয়ে আদালতে প্রতিবেদন দাখিল করে। পরে আসামিরা ওই মামলায় আদালত থেকে জামিনে বেরিয়ে ফারুককে হত্যার পরিকল্পনা করে। মূলত এখান থেকেই শত্রুতা শুরু।

চাঞ্চল্যকর এ হত্যা মামলার পর আসামি বাঁশি ও দীন ইসলামকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। মামলার অপর আসামি জনি, জিদান, জয় ও শুভ আদালতে আত্মসমর্পণ করে। মামলার প্রধান আসামি জনি বর্তমানে কুমিল্লা কারাগারে। অপর আসামি জিদানকে গত ২৬ এপ্রিল জামিন দিয়েছেন কুমিল্লার জজ আদালত। অপর আসামি মো. জিলানী, জসিম হাসান ও জাহাঙ্গীর খান পলাতক।

গত বছর আলোচিত এ হত্যা মামলার আসামি বাঁশি ও দীন ইসলাম উচ্চ আদালতে জামিন আবেদন করলে ২ নভেম্বর হাইকোর্টের একটি বেঞ্চ তাদের জামিন নাকচ করেন। এরপর আসামিরা কুমিল্লা জেলা ও দায়রা জজ আদালত থেকে জামিন নেন। সেখানকার জেলা ও দায়রা জজ আতাবউল্লাহ মামলার আসামি বাঁশি, দীন ইসলাম, শুভ, গরীবে নেওয়াজ ও সায়মন রিয়াদ জয়কে জামিন দেন।

যেখানে হাইকোর্ট আসামিদের জামিন নাকচ করেছেন সেখানে কুমিল্লার আদালতের জামিন নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন মামলার বাদী ফারুকের স্ত্রী আছমা বেগম। তিনি দাবি করেন, গোপনে অর্থের বিনিময়ে বিচারক আসামি সায়মন রিয়াদ জয়, শুভ, মশিউর, মো. গরীবে নেওয়াজ ও দীন ইসলামকে জামিন দিয়েছেন। এ নিয়ে তিনি গত ২২ এপ্রিল প্রধান বিচারপতি ও সুপ্রিম কোর্টের রেজিস্টার জেনারেলের কাছে কুমিল্লার জেলা জজ আতাবুল্লাহ'র বিরুদ্ধে নৈতিক স্খলনের লিখিত অভিযোগ করেন।

মামলার তদন্ত কর্মকর্তা পুলিশ পরিদর্শক (গোয়েন্দা) মোকাদ্দেস হোসেন সমকালকে জানান, চলতি বছরের ১৮ মার্চ ১০ আসামিকে অভিযুক্ত করে আদালতে মামলার অভিযোগপত্র (চার্জশিট) দাখিল করা হয়েছে। হত্যা মামলাটি কুমিল্লার আদালতে বিচারাধীন এবং ঘর পোড়ানোর মামলাটিও তদন্ত করছে পুলিশ।

মন্তব্য করুন