ঈদযাত্রায় পদ্মাপাড়ে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের মানুষের ভোগান্তির অভিজ্ঞতা নতুুন নয়। প্রতি বছরই এই নদী পারাপারে তাদের দুর্ভোগ পোহাতে হয়। এ ছাড়া বিভিন্ন সময় বৈরী আবহাওয়া ও ঘন কুয়াশায় ফেরি বা অন্যান্য নৌযান চলাচল বন্ধ থাকলে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষায় থাকার অভিজ্ঞতা তাদের রয়েছে। কিন্তু গতকাল শনিবার যা ঘটে গেল, সে রকম দৃশ্য আগে কখনও দেখেনি কেউ। পদ্মাপাড়ে হাজার হাজার মানুষ ভিড় করলেও পারাপারের জন্য নেই কোনো ব্যবস্থা। করোনার সংক্রমণ ঠেকাতে অ্যাম্বুলেন্সসহ জরুরি সেবার কয়েকটি বাদে গতকাল ভোর থেকে হঠাৎ করেই ফেরি চলাচল বন্ধ করে দেয় বাংলাদেশ অভ্যন্তরণী নৌপরিবহন করপোরেশন (বিআইডব্লিউটিসি)। লকডাউনের কারণে লঞ্চ, ট্রলার ও স্পিডবোট আগে থেকেই বন্ধ রয়েছে। বাধ্য হয়ে নিষেধাজ্ঞা না মেনে জরুরি সেবার ফেরিতেই গাদাগাদি করে পদ্মা পাড়ি দেন হাজার হাজার যাত্রী। এমন দৃশ্য শিমুলিয়া-বাংলাবাজার ও দৌলতদিয়া-পাটুরিয়া উভয় ঘাটেই দেখা গেছে। পরে যাত্রীদের চাপ সামলাতে না পেরে কর্তৃপক্ষ বিকেলের দিকে কিছু ফেরি সচল করে।

শিমুলিয়া ঘাট থেকে প্রতিনিধি কাজী সাব্বির আহমেদ দীপু ও মিজানুর রহমান ঝিলু জানিয়েছেন, গতকাল ভোর থেকেই হাজার হাজার ঘরমুখো মানুষ মুন্সীগঞ্জের লৌহজংয়ে শিমুলিয়া ঘাটে অবস্থান নেন। ঢাকা থেকে সিএনজিচালিত অটোরিকশা, ইজিবাইক, মাইক্রোবাসে করে তারা ঘাটে আসেন। গণপরিবহন বন্ধ থাকায় রাস্তাজুড়ে ভোগান্তিতে পড়তে হয় তাদের। ঘাটে আসা অনেক যাত্রীই জানেন না ফেরি বন্ধের কথা। তাদের অভিযোগ, সরকার রাতে ফেরি বন্ধ ঘোষণা না দিয়ে এক দিন সময় নিলে এ রকম ভোগান্তিতে পড়তেন না তারা।

অ্যাম্বুলেন্সে থাকা সুরভী সুলতানা নামে এক নারী জানান, শুক্রবার রাত সাড়ে ১০টায় তার বাবা মারা যান। গ্রামের বাড়ি খুলনা। রাত ৩টার পরে ঘাটে এসে দেখেন ফেরি বন্ধ। তখন স্থানীয় পুলিশ, বিআইডব্লিউটিসির কর্মরত স্টাফরা তাকে পরামর্শ দেন দৌলতদিয়া ঘাট দিয়ে পারাপার হতে। তখনই ছুটে যান দৌলতদিয়া ঘাটে। সেখানেও একই অবস্থা। আবার অ্যাম্বুলেন্স নিয়ে ছুটে আসেন শিমুলিয়া ঘাটে। প্রচণ্ড রোদে লাশ নিয়ে অপেক্ষা করতে হয় ঘণ্টার পর ঘণ্টা। অবশেষে সুলতানা জরুরি সেবা ৯৯৯-এ কল দেন।  তিনি বলেন, চোখের সামনে বাবার লাশ ফুলে পচন ধরতে দেখতে পাচ্ছি, কিন্তু কিছু করতে পারছি না।

ভুক্তভোগী রেজাউল করিম বলেন, সরকার ফেরি বন্ধের ঘোষণা দিয়েছে আমরা কেউ জানি না। রাস্তায় কোনো পুলিশ বা প্রশাসনও আমাদের বাধা দেয়নি। সেতুর টোলপ্লাজায় চাঁদাও দিয়েছি। ঢাকা থেকে আসতে অনেক টাকা খরচ হয়েছে। এখন ঢাকায় ফেরত যাওয়াও সম্ভব না। বৃদ্ধ সামাদ শেখ বলেন, 'আমার বয়স ৭০ না হলে পদ্মা নদী সাঁতার কেটেই চলে যেতাম। রোজা রাখছি বাপু, এত রোদ, এত কষ্ট সহ্য হয় না। আল্লাহর ওপর ছেড়ে দিয়েছি। করোনায় মানুষ মরবে না, মানুষ মরবে এ রকম ভোগান্তিতে।'

সকালে ঢাকা থেকে ঘাটে এসে ফেরিতে উঠতে না পেরে শিমুলিয়া ঘাটের পাশের চর, পদ্মার শাখা

নদীর জশলদিয়া ও কনকসার হয়ে জেলেদের ইঞ্জিনচালিত নৌকায় পার হয়েছেন অনেক যাত্রী। এভাবে নদী পার হতে গিয়ে  জেলেদের ৬টি নৌকা আটক করে ফেরত পাঠিয়েছে মাওয়া নৌপুলিশ। বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন মাওয়া নৌপুলিশের ইনচার্জ সিরাজুল কবির। 

এদিকে সকাল ৯টার দিকে ফেরি কুঞ্জলতা অ্যাম্বুলেন্স নিয়ে বাংলাবাজার ঘাটের উদ্দেশে রওনা দিলে তাতে শত শত যাত্রী উঠে পড়েন। এরপর দুপুর সাড়ে ১২টার দিকেও রো-রো ফেরি এনায়েতপুরী ও পৌনে ১টার দিকে শাহপরান ছেড়ে গেলে তাতেও শত শত যাত্রীর উপস্থিতি দেখা গেছে।

বিআইডব্লিউটিসি শিমুলিয়া ঘাটের ব্যবস্থাপক (বাণিজ্য) সাফায়েত আহমেদ সড়কে যাত্রীদের না আটকানোতে এই অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। এখন লাশবাহী অ্যাম্বুলেন্সের সঙ্গে ফেরিতে অসংখ্য যাত্রী উঠে পড়ছে। মানবিক কারণে বিকেল পৌনে ৪টায় আরও ৭টি ফেরি চালু করে যাত্রী পারাপার স্বাভাবিক রাখা হয়। 

পাটুরিয়া ঘাট থেকে নিরঞ্জর সূত্রধর জানান, পাটুরিয়া ও আরিচা ঘাটে এসে যাত্রীরা ফেরি ও লঞ্চ না পেয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষায় থেকে ট্রলারে নদী পার হচ্ছেন। বিআইডব্লিউটিসির ডিজিএম জিল্লুর রহমান জানান, গতকাল ভোর ৫টা থেকে দুপুর ১টা পর্যন্ত ফেরি চলাচল বন্ধ ছিল। কিন্তু যাত্রীদের উপচে পড়া ভিড়ের কারণে ১টার পর ছোট ৪টি ফেরি দিয়ে যাত্রী ও ছোট যানবাহন পারাপার করা হচ্ছে।

দৌলতদিয়া থেকে শিকদার মুহা. আসজাদ হোসেন আজু জানান, ঢাকা থেকে আসা যাত্রী আ. করিম চৌধুরী বলেছেন, জীবনের এই প্রথম ঈদ করতে এমন ভোগান্তিতে পড়েছি। ঢাকা থেকে ভেঙে ভেঙে এসে ঘাটে ফেরি বন্ধ। তারপর অনেক কষ্টে ছোট ফেরিতে পার হতে পেরেছি। এখন আবার মোটরসাইকেল ভাড়া করে যেতে হবে ঝিনাইদহ। অপর যাত্রী আহমেদ হোসেন বলেন, সরকার ফেরি বন্ধের সিদ্ধান্ত নিয়েছে ভালো কথা। কিন্তু সেটা দু-একদিন আগে জানালে কী হতো।

মন্তব্য করুন