রাজধানীর খিলগাঁওয়ের দক্ষিণ বনশ্রী মডেল হাই স্কুল অ্যান্ড কলেজ ঘিরে একটি দুষ্টচক্র গড়ে উঠেছে। শিক্ষক নিয়োগে রয়েছে জাল-জালিয়াতি। প্রতিষ্ঠানটির অর্থ আত্মসাতের ঘটনাও ঘটেছে। সরকারি দপ্তরের তদন্তে উঠে এসেছে দুষ্ট চক্রের অনিয়ম-দুর্নীতির তথ্য-প্রমাণ। এরপরও দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না। অদৃশ্য খুঁটির জোরে বহাল তবিয়তেই রয়েছেন তারা। এর সুরাহা চান শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটির শিক্ষার্থী ও অভিভাবকরা।

সংশ্নিষ্টরা জানান, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটির বর্তমান ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক আলম সরদার প্রায় সাত বছর আগে জালিয়াতির আশ্রয় নিয়ে সহকারী প্রধান শিক্ষক হিসেবে যোগদান করেছিলেন। পরে তিনিই অনিয়ম-দুর্নীতির জাল বিছিয়েছেন প্রতিষ্ঠানটিতে। তার বিরুদ্ধে জাল-জালিয়াতির প্রমাণ মিললেও কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। এতে শিক্ষকদের মধ্যে চরম ক্ষোভ সৃষ্টি হয়েছে। এর ফলে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি বিরাজ করছে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটিতে।

জানা গেছে, ২০১৪ সালের মার্চে একটি জাতীয় পত্রিকায় প্রতিষ্ঠানটির স্কুল শাখায় সহকারী প্রধান শিক্ষক নিয়োগের পুনর্বিজ্ঞপ্তি প্রকাশিত হয়। এতে বলা হয়, এমপিওভুক্ত স্কুলে ১০ বছরের শিক্ষকতার অভিজ্ঞতাসম্পন্ন ব্যক্তিরা আবেদন করতে পারবেন। আলম সরদারও ওই পদে আবেদন করেন। তখন তিনি ঢাকার দোহারের জয়পাড়া পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষক হিসেবে কর্মরত ছিলেন। তখনও এমপিওভুক্ত শিক্ষক হিসেবে তার ১০ বছর পূর্ণ হয়নি, ১৭ দিন বাকি ছিল। তাই নিয়ম অনুযায়ী আবেদন করার যোগ্যতা ছিল না তার। তথ্য গোপন করে আবেদন করেছিলেন। তা সত্ত্বেও নিয়োগ পান তিনি। এর আগে জয়পাড়া পাইলট উচ্চ বিদ্যালয় থেকে অব্যাহতিপত্র নিতেও জালিয়াতি করেছেন তিনি।

এসব জাল-জালিয়াতির প্রমাণ পেয়েছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদপ্তরের তদন্ত কমিটি। ২০১৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে শিক্ষা পরিদর্শক কাজী মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম এবং সহকারী শিক্ষা পরিদর্শক কাওছার হোসেন স্বাক্ষরিত তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়, 'এমপিওভুক্ত শিক্ষক হিসেবে ১০ বছরের অভিজ্ঞতা না থাকায় আলম সরদারের আবেদন বাতিলযোগ্য ছিল। আলম সরদার এই প্রতিষ্ঠানে যোগদান করেন ২০১৪ সালের ৮ জুলাই, অথচ তার আগের প্রতিষ্ঠান থেকে ছাড়পত্র দেওয়া হয় প্রায় এক মাস পরের তারিখে ৩ আগস্ট থেকে। এতে প্রমাণিত যে, তিনি নতুন প্রতিষ্ঠানে যোগদানের আগে আগের প্রতিষ্ঠানের ছাড়পত্র গ্রহণ করেননি। এতে দুই প্রতিষ্ঠান থেকেই তিনি জুলাই মাসের সরকারি বেতন-ভাতা উত্তোলন করেন।

তবে তদন্তকালে তদন্ত কমিটির কাছে আলম মিথ্যার আশ্রয় নিয়েছেন, দুই প্রতিষ্ঠান থেকে একই সময়ে বেতন-ভাতা গ্রহণ করেননি বলে লিখিতভাবে তদন্ত কমিটিকে জানান। কিন্তু একই মাসে দুই প্রতিষ্ঠান থেকে বেতন নেওয়ার বিষয়টি প্রমাণিত হওয়ার পর চালানের মাধ্যমে এক মাসের বেতন ফেরত দেন তিনি।

এদিকে, শিক্ষক নিবন্ধন সনদ জালিয়াতি করে দক্ষিণ বনশ্রী মডেল হাই স্কুল অ্যান্ড কলেজে শিক্ষক হিসেবে যোগদান করেছেন সায়লা হক ও ফিরোজা আক্তার। পরে বেসরকারি শিক্ষক নিবন্ধন ও প্রত্যয়ন কর্তৃপক্ষ (এনটিআরসিএ) নিশ্চিত হয়, তাদের নিবন্ধন সনদ ভুয়া। এ কারণে গত বছরের মার্চে তাদের বিরুদ্ধে সংশ্নিষ্ট থানায় মামলা করার নির্দেশ দিলেও কোনো ব্যবস্থা নেননি আলম সরদার।

আলম সরদারের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য গত ১৫ মার্চ মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালকের কাছে লিখিত অভিযোগ করেন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটির অ্যাডহক ম্যানেজিং কমিটির সাবেক সভাপতি (যুগ্ম সচিব, নৌ পরিবহন মন্ত্রণালয়) রফিক আহম্মদ সিদ্দিক। তিনি বলেন, প্রতিষ্ঠানটির ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক আলম সরদারের নিয়োগ বৈধ নয়। প্রতিষ্ঠানটিকে টিকিয়ে রাখার জন্য তার বিরুদ্ধে বিধি মোতাবেক ব্যবস্থা নেওয়া দরকার। জালিয়াতি করে নিয়োগ পাওয়া দু'জন শিক্ষককেও আশ্রয় দিচ্ছেন তিনি। এ ছাড়া ২০১৮ সালে ওই প্রতিষ্ঠানে ১৪ জন খণ্ডকালীন শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে, যার প্রয়োজন ছিল না। ১৪ জনের মধ্যে পাঁচজনের শিক্ষক নিবন্ধন সনদ নেই। এই পাঁচজনকে কমিটি বহিস্কার করেছিল। কিন্তু তাদের আবারও নিয়োগ দেওয়া হয়েছে বিধিবহির্ভূতভাবে। তিনি আরও বলেন, এই স্কুলের শিক্ষক মোফাজ্জল হোসেনের বিরুদ্ধে প্রায় ১৭ লাখ টাকা আত্মসাতের প্রমাণ পাওয়ার পর তাকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়। পরে চূড়ান্ত বরখাস্তের নির্দেশনা দেওয়া হলেও ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক তা বাস্তবায়ন করেননি।

অভিযোগের বিষয়ে আলম সরদার বলেন, এসব অভিযোগ তার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রের অংশ। সহকারী প্রধান শিক্ষক হিসেবে তার নিয়োগও বৈধ বলে দাবি করেন তিনি।

মন্তব্য করুন