দেশের বিমানবন্দরগুলোতে উন্নয়ন কাজে অনিয়মের অভিযোগে জড়িত কর্মকর্তাদের পদোন্নতি নিয়ে বেকায়দায় পড়েছে বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (বেবিচক)। উন্নয়ন কাজের অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ রয়েছে- পদোন্নতি পাওয়ার অপেক্ষায় থাকা এমন একডজনের বেশি কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ফৌজদারি ও বিভাগীয় মামলা চলমান আছে। এ অবস্থায় পদোন্নতির জন্য তাদের অপেক্ষা করতে হবে মামলা নিষ্পত্তি হওয়া পর্যন্ত।

বেবিচকের সদস্য (প্রশাসন) মিজানুর রহমান বলেছেন, কোনো কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ফৌজদারি ও বিভাগীয় মামলা চলাকালীন নিয়ম অনুযায়ী পদোন্নতি পাবেন না তারা। বর্তমানে বেবিচকের ১৪ প্রকৌশলীর বিরুদ্ধে এসব মামলার তদন্ত চলছে।

জানা গেছে, ২০১৭ সালে ঢাকায় বিমানবন্দরে সিভিল সার্কেলের প্ল্যানিং অ্যান্ড ডিজাইন কোয়ালিটি সার্ভিসের (পিঅ্যান্ডডি কিউএস) প্রবেশপথে স্টিলের একটি গেট নির্মাণ করা হয়। এই গেট নির্মাণে অনিয়মের বিষয়টি বেসামরিক বিমান মন্ত্রণালয়ের নজরে আসার পর তোলপাড় শুরু হয়। বিমান মন্ত্রণালয়ের একজন উপসচিব জানান, বিমানবন্দরে গেট নির্মাণের সঙ্গে অর্থ ব্যয়ের বাস্তব মিল আকাশ-পাতাল। অসাধু ঠিকাদার ও প্রকৌশলীর যোগসাজশে এ ক্ষেত্রে দুর্নীতি হয়েছে।

তিনি বলেন, মাত্র ৩০ ফুট উঁচু স্টিলের এই গেট নির্মাণে ব্যয় দেখানো হয়েছে এক কোটি ৭০ লাখ ৮৮ হাজার টাকা। এতে ৫৩ লাখ ৬৯ হাজার ৫১২ টাকার অতিরিক্ত খরচে আর্থিক অপচয় ও দুর্নীতি হয়েছে বলে মন্ত্রণালয়ের তদন্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

কমিটির তদন্ত প্রতিবেদনে এই অনিয়ম-দুর্নীতির জন্য বেবিচকের সিনিয়র উপসহকারী প্রকৌশলী (সিভিল) মো. কামরুজ্জামান, নিজাম আল হাসিব ও আবদুল্লাহ আল মামুন, সহকারী প্রকৌশলী নাসিম আল ইসলাম ও জহিরুল ইসলাম, নির্বাহী প্রকৌশলী শরিফুল ইসলাম ও মো. শহীদুজ্জামান, নির্বাহী প্রকৌশলী (কিউএল) এএইচ এমডি নুরউদ্দিন চৌধুরী এবং প্রধান প্রকৌশলী (বাধ্যতামূলক অবসর) সুধেন্দু বিকাশ গোস্বামীকে অভিযুক্ত করা হয়। তাদের একজন মো. কামরুজ্জামান সমকালকে বলেন, তদন্ত চলাকালীন কোনো মন্তব্য করা যাবে না।

বেবিচক কর্মকর্তারা জানান, এর আগে ২০১৪-১৫ অর্থবছরে কক্সবাজার বিমানবন্দরের জন্য একটি ৩০০ কেভিএ জেনারেটর কেনার জন্য পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়েছিল। কিন্তু বেবিচক ও বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষের কিছু কর্মকর্তা এবং ঠিকাদার যোগসাজশ করে জেনারেটরটি না কিনেই ক্রয় দেখিয়ে ৬০ লাখ ৫০ হাজার টাকা আত্মসাৎ করেন। এ অভিযোগ পেয়ে তদন্ত করে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। দীর্ঘ তদন্তে অভিযোগের সত্যতা পেয়ে দুদকের চট্টগ্রাম অঞ্চল-২ এর উপপরিচালক মাহবুবুল আলম বাদী হয়ে ২০১৯ সালের ৬ জানুয়ারি কক্সবাজার সদর মডেল থানায় মামলা করেন।

ওই মামলার আসামি করা হয় প্রকল্পের ঠিকাদার মেসার্স ঢাকা ইন্টারন্যাশনাল ট্রেডার্সের স্বত্বাধিকারী শাহাব উদ্দীন, বেবিচকের সাবেক সহকারী প্রকৌশলী ভবেশ চন্দ্র সরকার, নির্বাহী প্রকৌশলী মিহির চাঁদ দে, তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী শহীদুল আফরোজ ও কক্সবাজার বিমানবন্দরের সাবেক ব্যবস্থাপক হাসান জহিরকে। এ ছাড়া বেবিচকের কক্সবাজার বিমানবন্দরের সাবেক সিনিয়র উপসহকারী প্রকৌশলী শহিদুল ইসলাম মণ্ডলকে ওই মামলায় আসামি করা হয়েছে। বর্তমানে তারা বরখাস্ত এবং আদালত থেকে জামিনে আছেন।

প্রকৌশলী শহিদুল ইসলাম মণ্ডল সমকালকে বলেন, এ ঘটনায় তিনি পরিস্থিতির শিকার। পদোন্নতির তালিকায় অনেক আগেই তার নাম রয়েছে। কিন্তু মামলার কারণে পদোন্নতি হচ্ছে না।

নির্বাহী প্রকৌশলী মিহির চাঁদ দে বলেন, কক্সবাজার জেনারেটর ক্রয়ে সংশ্নিষ্ট ঠিকাদারসহ জড়িত প্রকৌশলীদের বিরুদ্ধে মামলার ক্ষেত্রে কোনো সহযোগিতা করছে না বেবিচক। আদালতের দেওয়া নির্দেশনাও আমলে নিচ্ছে না তারা।

এ ব্যাপারে বেবিচকের চেয়ারম্যান এয়ার ভাইস মার্শাল মফিদুর রহমান বলেন, বিমানবন্দরের উন্নয়নমূলক কাজে অনিয়মে জড়িত কোনো কর্মকর্তাকে ছাড় দেওয়া হবে না। বর্তমান সরকার কোনো অনিয়ম দুর্নীতি পছন্দ করে না। এ কারণে বেবিচকে যেসব কর্মকর্তা দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত, তাদের বিরুদ্ধে বিচারকাজ অব্যাহত আছে।

মন্তব্য করুন