ক্রমাগত দখল-দূষণে এমনিতেই বিপর্যস্ত কুমিল্লা-চাঁদপুরের খরস্রোতা ডাকাতিয়া। নাব্য সংকটে এই নদী রূপ নিয়েছে এখন সরু খালে। সেই ডাকাতিয়ার বুকে বিদ্যুতের তিনটি টাওয়ার নির্মাণ করা হচ্ছে। হাইকোর্টের নির্দেশনা ও জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনের বিধান উপেক্ষা করে নদীর চাঁদপুরের ইচলিঘাট এলাকায় বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ) থেকে ইজারা নিয়ে পানিপ্রবাহের স্থানেই এসব টাওয়ার নির্মাণ করছে চাঁদপুর পাওয়ার জেনারেশন। নদীর পানিপ্রবাহ ঠিক রাখতে সব ধরনের অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদসহ টাওয়ার নির্মাণ বন্ধের দাবি জানিয়েছেন পরিবেশবাদীরা।

অনুসন্ধানে জানা যায়, ডাকাতিয়া বাংলাদেশ-ভারতের একটি আন্তঃসীমান্ত নদী। নদীটির দৈর্ঘ্য ১৪১ কিলোমিটার ও ১৩০ ফুট চওড়া। এটি ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের পাহাড় থেকে উৎপন্ন হয়ে কুমিল্লার সদর দক্ষিণ, লালমাই, লাকসাম, চৌদ্দগ্রাম ও মনোহরগঞ্জ হয়ে চাঁদপুর দিয়ে মেঘনায় মিলেছে। নদীটির অধিকাংশ এলাকা অবৈধ দখলদারদের কবলে। একসময় নদীতে চলত স্টিমার ও বড় বড় নৌকা। কৃষক পেত সেচ সুবিধা। বর্ষা মৌসুমে ডাকাতিয়ার গর্জন শুনতে দুই ধারে চোখে পড়ত পর্যটকের ভিড়। এখন ডাকাতিয়ায় নেই পর্যটকের আনাগোনা, নেই পানির গর্জন। ডাকাতিয়ায় একসময় দেশীয় প্রজাতির বিভিন্ন সুস্বাদু মাছ পাওয়া গেলেও বর্তমানে গভীরতা ও প্রশস্ততা কমে যাওয়ায় খুব বেশি মাছও পাওয়া যায় না। নদী ভরাট করে বিভিন্ন স্থাপনা নির্মাণ করা হচ্ছে। অবৈধ ইটভাটা, অটোরাইস মিলসহ বিভিন্ন কারখানার দূষিত বর্জ্য নদীতে ফেলে ভরাট করা হচ্ছে। ফলে পানি ধারণের জায়গা কমে গেছে নদীতে। এতে গ্রীষ্ফ্মে পানি সংকট থাকলেও বর্ষায় দেখা দেয় উল্টো চিত্র।

নদী এলাকার কুমিল্লার বাগমারা বাজার, দৌলতগঞ্জ বাজার, মনোহরগঞ্জ, চাঁদপুরের ইচলিঘাটসহ অধিকাংশ স্থানে নদীর বিভিন্ন অংশ দখল হয়ে গেছে। ১৩০ ফুট চওড়া নদীটি কোথাও কোথাও ৬০ ফুটে পরিণত হয়েছে। মনোহরগঞ্জ বাজার, আমতলী, চিতোশী, চাঁদপুরের ইচলিঘাটসহ বিভিন্ন স্থানে ডাকাতিয়ার দুই তীরে প্রকাশ্যে দখল-বাণিজ্য চললেও দেখার যেন কেউ নেই।

সর্বশেষ ডাকাতিয়ার ইচলিঘাটসহ আশপাশের এলাকায় নদীতে তিনটি এবং বাইরে তিনটি বিদ্যুতের টাওয়ার নির্মাণ করছে চাঁদপুর পাওয়ার জেনারেশন। এ ব্যাপারে শনিবার চাঁদপুর পাওয়ার জেনারেশনের প্রজেক্ট ইঞ্জিনিয়ার জাহাঙ্গীর আলম সমকালকে বলেন, 'আমরা বিআইডব্লিউটিএর অনুমোদন ও ইজারা নিয়েই এসব টাওয়ার নির্মাণ করছি। এরই মধ্যে প্রায় ৫০ শতাংশ কাজ শেষ হয়েছে। জনস্বার্থে স্থাপন করা এসব টাওয়ারের মাধ্যমে জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ যাবে। তিনটি টাওয়ার নদীর জমিতে নির্মাণ করা হলেও পানিপ্রবাহে কোনো সমস্যা হবে না। অনেকে না বুঝেই বিষয়টি নিয়ে প্রতিবাদ করছেন।'

এ বিষয়ে বিআইডব্লিউটিএ চাঁদপুরের উপপরিচালক (বন্দর ও পরিবহন) কাইসুরুল ইসলাম বলেন, 'জনস্বার্থে বিদ্যুৎ প্রকল্পের জন্য নদীর তীরবর্তী স্থানে নদীর স্বার্থ সংরক্ষণ করে টাওয়ার নির্মাণের অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। এখন কিছু অভিযোগ আসছে। শিগগিরই সরেজমিনে গিয়ে আমরা এসব অভিযোগ খতিয়ে দেখব। তারা নদীর কোনো ক্ষতি করে টাওয়ার নির্মাণ করলে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।'

বাংলাদেশ পরিবেশ আইনজীবী সমিতির অ্যাডভোকেট আলী মোস্তফা খান বলেন, নদীর ভেতর বিদ্যুতের টাওয়ার নির্মাণ পরিবেশ আইনের বিরোধী কাজ। আমরা এর নিন্দা জানাই। নদীর পানিপ্রবাহ ঠিক রাখতে এসব টাওয়ার অবিলম্বে অপসারণ করতে সরকারের কাছে দাবি জানাচ্ছি।

বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক শরীফ জামিল বলেন, নদী হচ্ছে জীবন্ত সত্তা। নদীর জায়গা কাউকে ইজারা দেওয়ার বিধান নেই। নদীর পানিপ্রবাহ ঠিক রাখতে অবিলম্বে ডাকাতিয়া থেকে নির্মাণাধীন সব বিদ্যুতের টাওয়ার অপসারণ করতে হবে।

মন্তব্য করুন