কক্সবাজার সৈকতে কিটকট (পর্যটকদের বাসার চেয়ার) ভাড়া দিয়ে জীবন জীবিকা চালায় রশিদ আহমদ। গত ১ এপ্রিল থেকে তার এই ব্যবসা বন্ধ। করোনা পরিস্থিতিতে কক্সবাজারে পর্যটক আসা বন্ধ করে দিয়েছে প্রশাসন। ফলে বন্ধ হয়ে গেছে রশিদের মতো পর্যটন সংশ্নিষ্ট আরও বহু ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী হকারের ব্যবসা। রশিদ জানালেন- করোনাকালে বিপাকে পড়েছেন তিনি। একই সঙ্গে সংকটে তার দুই কর্মচারীর পরিবার। তাদের জীবন-জীবিকা এখন অচল।

সৈকতে পর্যটকদের ছবি তুলে জীবিকা নির্বাহ করেন হাফিজ। পর্যটকশূন্য সৈকতে ছবি তোলার কাজ বন্ধ। ধার-দেনা করে চলছেন হাফিজ। জানালেন, অনিশ্চিত এই জীবন আর কতদিন এভাবে চলবে। হাফিজ জানালেন, সৈকতে দুই শতাধিক ফটোগ্রাফার রয়েছেন। করোনাকালে গভীর সংকটে এরা। অনেকে জীবিকার হাতিয়ার ক্যামেরাটিও বিক্রি করে দিয়েছেন।

সৈকতের সুগন্ধা পয়েন্টে ক্ষুদ্র ঝুপড়ি দোকানে ঝিনুক সামগ্রী দিয়ে তৈরি স্যুভেনির বিক্রি করেন মো. ইছহাক। জানালেন- গত বছর প্রায় সাত মাস বন্ধ ছিল পর্যটন সংশ্নিষ্ট ব্যবসা। সেপ্টেম্বর থেকে শুরু হলে আশার আলো দেখেছিলেন। এপ্রিল থেকে ফের ব্যবসা বন্ধ হয়ে গেলে তার মতো ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা এখন অন্ধকার দেখছেন।

ইছহাক জানালেন- কক্সবাজার সৈকত এবং আশপাশের এলাকায় প্রায় পাঁচ হাজার হকার ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী রয়েছেন। এই করোনাকালে তাদের ব্যবসা দীর্ঘদিন বন্ধ থাকলেও সরকারিভাবে কোনো সাহায্য-সহযোগিতা পাননি।

কক্সবাজার সৈকতে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও হকার সমিতির সভাপতি মাহবুবুর রহমান জানালেন- সৈকতে ঘোড়া চালনা, ফটোগ্রাফি, কিটকট ব্যবসা, ঝিনুক ব্যবসা, ডাব বিক্রেতা, স্যুভেনির ব্যবসাসহ নানা ব্যবসায় জড়িত এমন হকারের ঘরে চরম দুর্দিন যাচ্ছে। খেয়ে না খেয়ে, ধার দেনা করে তাদের জীবন চলছে। সরকারিভাবে কোনো সাহায্য-সহযোগিতা পাননি এই হকাররা।

কক্সবাজার জেলা শ্রমিক কর্মচারী ফেডারেশনের সভাপতি গিয়াস উদ্দিন আহমেদ বলেন, জেলায় হোটেল মোটেল গেস্ট হাউসে প্রায় ৩০ হাজার কর্মী এখন বেকার। করোনাকালে এসব কর্মীর বেশির ভাগ গত দুই মাস ধরে বেতন-ভাতা পায়নি। কর্মী ছাঁটাই চলছে প্রতিনিয়ত। তিনি বলেন, পর্যটন শহরে শ্রম অধিকার চরমভাবে লঙ্ঘিত হচ্ছে। করোনার এই দুর্দিনে স্থানীয় প্রশাসন শ্রমজীবীদের কোনো ধরনের প্রণোদনা দেয়নি। খেটে খাওয়া এই মানুষদের পেটের খবর নেয়নি কেউ।

কক্সবাজার দোকান কর্মচারী ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক সাহাব উদ্দিন বলেন, লকডাউনে ঈদের বোনাস তো দূরের কথা, অধিকাংশ শ্রমিক মার্চ-এপ্রিলের বেতনও পাননি। কর্মহীন হয়ে গেছেন অনেকে। পবিত্র রমজান মাসেও এদের পাশে দাঁড়ায়নি কেউ।

কক্সবাজার হোটেল মোটেল গেস্ট হাউস কর্মকর্তা সমিতির সাধারণ সম্পাদক করিম উল্লাহ কলিম বলেন, পর্যটন শহরের আবাসিক হোটেলগুলো বন্ধ রয়েছে এপ্রিল থেকে। এসব হোটেল মোটেলে শ্রমিকদের খোঁজ নেওয়ার যেন কেউ নাই। করোনাকালে সরকারের তরফ থেকে শ্রমিকদের প্রণোদনা দেওয়ার দাবি জানান করিম উল্লাহ। তিনি বলেন প্রতি বছর ঈদের বন্ধে ব্যাপক পর্যটকের উপস্থিতি ঘটে কক্সবাজারে। এবারের ঈদে পর্যটন শিল্প চালু হবে কিনা এখনও অনিশ্চিত। ফলে এই শিল্পে নিয়োজিত কর্মীদের অনেকে পেশা পরিবর্তন করছেন। এই শিল্পের জন্য তা অশনিসংকেত। এই অবস্থা দীর্ঘায়িত হলে কক্সবাজারের পর্যটন শিল্প বন্ধ হয়ে যাবে স্থায়ীভাবে।

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক মো. মামুনুর রশীদ বলেন, সৈকতে শতাধিক হকার ও শ্রমিকদের সরকারিভাবে ত্রাণসামগ্রী দেওয়া হয়েছে। পর্যায়ক্রমে আরও অনেককে এই সহায়তার আওতায় নিয়ে আসা হবে।

মন্তব্য করুন