গত এক বছরেরও বেশি সময় ধরে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় শিশুদের শিক্ষাব্যবস্থায় বড় ধরনের সংকট দেখা দিয়েছে। সমাজের দরিদ্র শিশুদের অবস্থা আরও সংকটাপন্ন। অনেকদিন ধরে বন্ধ থাকার ফলে শিক্ষায় ঘাটতি, শিক্ষার্থীদের ঝরে পড়া, মানসিক এবং অর্থনৈতিক সমস্যাসহ দীর্ঘমেয়াদি নানান ঝুঁকি বাড়ছে। গবেষণা সংস্থা পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টার (পিপিআরসি) এবং বেসরকারি ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্র্যাক ইনস্টিটিউট অব গর্ভন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (বিআইজিডি) পরিচালিত এক জরিপে এমন ফলাফল এসেছে। গবেষণা প্রতিবেদন বলছে, স্কুল বন্ধ থাকলেও শিক্ষার্থীদের বাইরে যাওয়া বন্ধ নেই, অর্ধেকেরও বেশি শিক্ষার্থী কোচিং সেন্টারে যাচ্ছে।

গবেষণার ফলাফল যৌথভাবে উপস্থাপন করেন পিপিআরসির চেয়ারম্যান ড. হোসেন জিল্লুর রহমান এবং বিআইজিডির নির্বাহী পরিচালক ড. ইমরান মতিন। ফলাফলে দেখা গেছে, শিক্ষণ ঘাটতির মুখে রয়েছে প্রাথমিক স্তরের ১৯ শতাংশ এবং মাধ্যমিক স্তরের ২৫ শতাংশ শিক্ষার্থী। কয়েক বছর ধরে পরিচালিত গবেষণার অংশ হিসেবে তৃতীয় ধাপের দ্বিতীয় অংশের চার হাজার ৯৪০টি পরিবারের স্কুলগামী শিশুদের ওপর এ জরিপ করা হয়। হতদরিদ্র, মাঝারি দরিদ্র, ঝুঁকিপূর্ণ দরিদ্র এবং দরিদ্র নয়, এমন পরিবার জরিপে অন্তর্ভুক্ত ছিল।

কভিড-১৯-এর কারণে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরের শিশুদের মাঝে সৃষ্ট শিক্ষণ ঘাটতি পর্যবেক্ষণে এই সমীক্ষা একটি গুরুত্বপূর্ণ কাঠামো তৈরি করেছে। দেখা গেছে, এই ঝুঁকি সৃষ্টি হয়েছে পড়াশোনা না করা এবং সঠিক পদ্ধতিতে পড়াশোনা না করার কারণে। যেমন- তদারকি ছাড়া নিজে নিজেই পড়া ও অনিয়মিত পড়া। সঠিক ব্যবস্থা না নেওয়া হলে এর ফলে ভবিষ্যতে শেখার ক্ষমতা কমে যাবে এবং ঝরে পড়ার হার বাড়বে। অতি দরিদ্র পরিবারের মাধ্যমিক স্কুলগামী ৩৩ শতাংশ ছেলে শিক্ষার্থীর কভিড-সৃষ্ট অর্থনৈতিক ধাক্কায় স্কুল ছেড়ে দেওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

ফলাফলে আরও দেখা গেছে, দূরবর্তী শিক্ষণের জন্য যে সুবিধা থাকা দরকার তা আছে বা ব্যবহার করছে মাত্র ১০ শতাংশ শিক্ষার্থী। ফলে সরকারি ও বেসরকারি চ্যানেলের মাধ্যমে এই বন্ধে লেখাপড়া শেখার হার খুব কম। পড়াশোনায় যুক্ত থাকার আরেকটি পদ্ধতি হলো পিতামাতা বা ভাইবোনের সহায়তায় পড়া। যদিও ৯৫ শতাংশ অভিভাবক তাদের সন্তানকে স্কুলে ফের পাঠাতে আগ্রহী, তবুও অর্থনৈতিক অবস্থা এক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। গত দুই বছরে শিক্ষা ব্যয় বেড়েছে ১২ গুণ।

হোসেন জিল্লুর বলেন, করোনা মহামারির অভিঘাত দেশের স্বাস্থ্য ও অর্থনীতি খাতে কতটুকু প্রভাব ফেলেছে, তা নিয়ে গত এক বছরে বহু আলোচনা হয়েছে এবং ভবিষ্যতে আরও হবে। কিন্তু এ আলোচনার পাশাপাশি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় মানবসম্পদের ক্ষেত্রে যে ক্ষতি হয়ে যাচ্ছে, তা নিয়ে আলোচনা শুরু করা দরকার। এ ক্ষতি কীভাবে পোষানো যায়, সে বিষয়ে আলোচনা হতে হবে।

ড. ইমরান মতিন বলেন, স্কুলগামী শিশুদের একটি বড় অংশ শিক্ষণ ঘাটতির ঝুঁকিতে রয়েছে। সুতরাং, শিক্ষার ঘাটতি পূরণে এবং পরিবর্তিত পরিস্থিতির সঙ্গে শিশুদের খাপ খাওয়াতে স্কুল ফের খোলার সময় প্রতিকারমূলক ব্যবস্থার একটি মিশ্র পদ্ধতি গ্রহণ করা দরকার।

গবেষণায় আরও দেখা গেছে, শহরের ১০ থেকে ২০ বছর বয়সী ১৫ দশমিক ৭ শতাংশ শিক্ষার্থী মানসিক চাপে রয়েছে, যা গ্রামের (৮.৪%) তুলনায় দ্বিগুণ। অভিভাবকদের দেওয়া তথ্যানুযায়ী মানসিক চাপের লক্ষণগুলো হলো- অধৈর্য হওয়া, রাগ বা উগ্রভাব এবং বাইরে যেতে ভয় পাওয়া। ঘরের বাইরে যেতে ভয় পাওয়ার ব্যাপার আবার গ্রামের চেয়ে শহরের শিক্ষার্থীদের মধ্যে বেশি।

সমাপনী বক্তব্যে হোসেন জিল্লুর স্কুল বন্ধের ফলে সৃষ্ট তিনটি প্রধান সংকট তুলে ধরেন। এগুলো হলো- শিক্ষণ ঘাটতি, শিক্ষা ব্যয় বৃদ্ধি এবং বিভিন্ন স্তরের সামাজিক দূরত্ব। কভিডের দ্বিতীয় ঢেউ আমলে নিয়ে পিপিআরসি-বিআইজিডির পরামর্শ হচ্ছে শিক্ষার ঘাটতি ঠেকাতে, শিক্ষায় অনাগ্রহ কমাতে এবং অভিভাবকদের শিক্ষাসংক্রান্ত আশঙ্কা দূর করতে ফের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলে দেওয়া দরকার।

মন্তব্য করুন