সত্তরোর্ধ্ব জয়নাল হাওলাদার। জীবনের অর্ধেকের বেশি সময় পার করেছেন নারায়ণগঞ্জের কুমুদিনী ওয়েলফেয়ার ট্রাস্ট অব বেঙ্গল (বিডি) লিমিটেডের পাট কারখানায়। দেশ স্বাধীন হওয়ার আগে বাবার সঙ্গে এ শহরে এসেছিলেন। তার সঙ্গেই কাজ শুরু করেন। থাকেন শহরের ঈশা খাঁ সড়কের উত্তর কুমুদিনী বাগানে। এই আবাসস্থল বেশিদিন টিকছে না। এই বাগানে প্রস্তাবিত কুমুদিনী মেডিকেল কলেজ ও ক্যান্সার রিসার্চ সেন্টারের ছাত্রী হোস্টেল নির্মাণ হবে। ফলে এ স্থান ছাড়তে হবে তাদের।

একসময় পাই (এক আনার ১২ ভাগের এক ভাগ) হিসাবে পাটের বোঝা টানতেন জয়নাল। ১০০ বোঝা টেনে পেতেন চার টাকা। বর্তমানে ৫০ কেজির বোঝা টানলে পান ছয় টাকা। বয়সের কারণে সর্বোচ্চ ৪০টা বোঝা টানতে পারেন। চার ছেলে ও এক মেয়ের জামাইও এ কারখানার শ্রমিক। সব মিলিয়ে কষ্টে দিন যাচ্ছিল জয়নালের পরিবারের। তবে উচ্ছেদের কথা শুনে তাদের মাথায় বাজ পড়েছে। কোথায় যাবেন, কীভাবে থাকবেন তা নিয়ে চিন্তিত জয়নাল। একই অবস্থা বাগানের প্রায় আড়াইশ শ্রমিক পরিবারের। এই পরিবারগুলোর অন্তত একজন কুমুদিনীর পাট কারখানার শ্রমিক। দৈনিক মজুরি ভিত্তিতে কাজ করেন তারা। মালিকপক্ষের অনুমতি নিয়ে নিজের টাকায় কাঁচা ও সেমিপাকা ঘর তুলে এই শ্রমিকরা থাকেন কুমুদিনী বাগানে।

শ্রমিকরা বলছেন, নারায়ণগঞ্জে কুমুদিনী ইন্টারন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব মেডিকেল সায়েন্স অ্যান্ড ক্যান্সার রিসার্চ স্থাপন করা হবে। গত ১৪ ফেব্রুয়ারি গণভবন থেকে ভার্চুয়ালি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এ প্রকল্পের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। এ প্রকল্পের আওতাধীন ছাত্রী হোস্টেল নির্মাণের জন্য ঈশা খাঁ সড়কের নারায়ণগঞ্জ তিনশ শয্যা হাসপাতালের পাশের উত্তর কুমুদিনী বাগানের জায়গা নেওয়া হবে। এ জন্য আগামী ৩০ মের মধ্যে বাগানের বাসিন্দাদের ঘর ছেড়ে দিতে বলেছে মালিকপক্ষ।

সরেজমিনে দেখা যায়, উত্তর কুমুদিনী বাগানের সামনে ছাত্রী হোস্টেল নির্মাণের বিষয়টি উল্লেখ করে একটি বড় ব্যানার সাঁটানো হয়েছে। বাগানের ঘরগুলোতে লাল চিহ্ন দেওয়া হয়েছে। শ্রমিকরা জানান, লাল চিহ্ন দেওয়া হয়েছে অন্তত আড়াইশ ঘরের সামনে। চিহ্নিত ঘরগুলো ছেড়ে না দিলে উচ্ছেদ করা হবে।

এখানকার বাসিন্দাদের দাবি, তাদের বাগান থেকে উচ্ছেদ করতে হলে শ্রম আইন অনুযায়ী পাওনা পরিশোধ করতে হবে। অথবা শ্রমিকদের বাসস্থানের জন্য অন্যত্র পুনর্বাসন করতে হবে।

পাওনা পরিশোধ অথবা পুনর্বাসনের দাবিতে প্রধানমন্ত্রী বরাবর স্মারকলিপি ও মালিকপক্ষকে লিগ্যাল নোটিশ পাঠিয়েছেন শ্রমিকরা। এতে শ্রমিকরা উল্লেখ করেছেন, 'আমরা শ্রমিকগণ দীর্ঘ ৩০/৪০ বছর হতে কমবেশি বিভিন্ন মেয়াদে কুমুদিনী ওয়েলফেয়ার ট্রাস্টের অন্তর্ভুক্ত বেঙ্গল (বিডি) লিমিটেড কারখানায় চাকরি করছি। বেঙ্গল বিডি লিমিটেড একটি লাভজনক পাটজাত শিল্পকারখানা ও ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান, যার শ্রমিকগণ বাংলাদেশ শ্রম আইন দ্বারা পরিচালিত এবং এই আইনের সকল প্রকার সুযোগ-সুবিধা পাওয়ার অধিকারী। অত্র আইনের নির্দেশনা অনুযায়ী কোনো শ্রমিকের চাকরির অবসান করলে প্রাপ্য পাওনাদি পরিশোধ করা কোম্পানি বা প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব। এ ছাড়া এই আইনের ধারা ৩২-এর উপধারা ধারা (২) এ উল্লিখিত আছে, শ্রমিকের পাওনা পরিশোধ না করে কোনো শ্রমিককে বাসস্থান হতে উচ্ছেদ করা যাবে না।'

শ্রমিকদের পক্ষে লিগ্যাল নোটিশ দিয়েছেন শ্রম আইন বিশেষজ্ঞ ও শ্রমিক নেতা মাহবুবুর রহমান ইসমাইল। তিনি বলেন, 'এই শ্রমিকদের বাপদাদারাও এইখানে কাজ করেছেন। সেই সূত্রে তারা এখানে বসবাস করে কাজ করছে। শ্রম আইনের ৩২ ধারায় উচ্ছেদের পূর্বে পাওনাদি পরিশোধের বিষয়টি স্পষ্টভাবে উল্লেখ আছে।' তিনি আরও বলেন, 'শ্রমিকদের কোনো সঞ্চয় নেই। তা ছাড়া এই কভিডকালীন পরিস্থিতিতে অন্য কোথাও বাসা ভাড়া নিয়ে থাকার মতো আর্থিক সংগতি তাদের নেই। কুমুদিনী ট্রাস্টের অনেক ভূসম্পত্তি রয়েছে। সেই জায়গার কোথাও এই শ্রমিকদের পুনর্বাসন করা হোক।'

এ বিষয়ে কথা বলতে কুমুদিনী ওয়েলফেয়ার ট্রাস্টের পরিচালক মহাবীর পতির মোবাইল নম্বরে ফোন করে তাকে পাওয়া যায়নি। তবে শ্রমিকরা জানান, কারখানা কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা হলে তাদের স্থানীয় কাউন্সিলর মাকছুদুল আলম খন্দকার খোরশেদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে বলেন। কারখানা কর্তৃপক্ষ কাউন্সিলর খোরশেদের মাধ্যমে প্রতি শ্রমিক পরিবারকে ১০ হাজার করে টাকা দেবে। তবে এ বিষয়ে কাউন্সিলর মাকছুদুল আলম খন্দকার খোরশেদ বলেন, 'কারখানা কর্তৃপক্ষ শ্রমিকদের বাসস্থান পরিবর্তন সাপেক্ষে মালামাল পরিবহনের জন্য তিন হাজার টাকা প্রস্তাব করেছিল। শ্রমিকদের দাবি ছিল ১৫ হাজার টাকা। আমি স্থানীয় জনপ্রতিনিধি হিসেবে উভয় পক্ষের মধ্যে মধ্যস্থতা করে দিয়েছি। যারা স্থান ছেড়ে যাবেন, তাদের মালামাল পরিবহনের জন্য ১০ হাজার টাকা প্রদান করবে কারখানা কর্তৃপক্ষ। শ্রমিকরাও এতে রাজি হয়েছে।'

মন্তব্য করুন