ঈদের সময় যত ঘনিয়ে আসছে, শপিংমলগুলোতে ততই ক্রেতা সমাগম বাড়ছে। এবারের ঈদে সব বয়সী ক্রেতাদেরই পছন্দ ও চাহিদার শীর্ষে রয়েছে দেশি পোশাক। হালকা রঙের নরম সুতি, লিলেন ও সিল্ক্ক ওয়েভ মাসকট কটনের ওপর ম্যাচিং সুতোর অ্যামব্রয়ডারি, স্ট্ক্রিন প্রিন্ট করা পোশাকেই এবার নজর ক্রেতাদের। কারো কারোর পছন্দে রয়েছে তাঁতের কাপড়ে চুমকির বিন্যাস।

ব্যবসায়ীরা বলছেন, গত বছরের মতো এ বছরেও করোনাজনিত কারণে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর ও সীমান্ত বন্ধ থাকায় ভারতসহ অন্যান্য দেশ থেকে তারা পোশাক আনতে পারেননি। এদিকে গত বছরের অভিজ্ঞতা থেকে দেশি ফ্যাশন হাউসগুলো ছয় মাস আগে থেকেই ঈদের পোশাক নিয়ে কাজ শুরু করেছিল। এর ফলে বিদেশি কাপড়ের আমদানিনির্ভরতা অনেকটাই কমেছে এবার। দেশীয় ফ্যাশন হাউসগুলোও সুযোগ পেয়েছে পোশাকে বৈচিত্র্য আনার। তাই পোশাকের ডিজাইনে এসেছে ব্যাপক পরিবর্তন। অনেক ফ্যাশন হাউস এবার ওয়েস্টার্ন ডিজাইনের পোশাকও বানিয়েছে।

আড়ংয়ের সুপারভাইজার মোজাম্মেল হক জানান, ঈদসহ বিভিন্ন উৎসবে পাঞ্জাবি, সালোয়ার-কামিজ, এমনকি দেশি ভালো মানের শাড়ি পাওয়া গেলেও অনেক ক্রেতা ভারতীয় শাড়ির প্রতিও আগ্রহ দেখাতেন। তবে সময় বদলেছে। ক্রেতাদের মধ্যে এখন দেশি পোশাকের প্রতিও আগ্রহ বেড়েছে। এক্ষেত্রে ফ্যাশন হাউসগুলোর অবদান অনেক। কাপড়ের ভালো মান ও ডিজাইন, সেইসঙ্গে বিভিন্ন ট্রেন্ডের পোশাক উপস্থাপন করছে হাউসগুলো। এভাবে দিনে দিনে ফ্যাশন হাউসগুলো ক্রেতাদের আস্থা অর্জনে সক্ষম হয়েছে।

ঈদুল ফিতরকে কেন্দ্র করে আড়ং, বিশ্বরঙ, বাংলার রঙ, নবরূপা, ইয়োলো, কে ক্র্যাফট্‌, দেশী দশ, অঞ্জন'স, সেইলর, লা-রিভ, ফ্রি ল্যান্ড, ক্যাটস আই, ইজি, জেন্টাল পার্কসহ সব দেশীয় ফ্যাশন হাউসই গরমের কথা মাথায় রেখে পোশাকের ডিজাইন ও সুতিসহ আরামদায়ক ভিন্ন ম্যাটেরিয়ালের পোশাক এনেছে। ট্রেন্ডি পোশাকগুলোর প্যাটার্নে ওয়েস্টার্ন স্টাইলের সঙ্গে রয়েছে দেশীয় ঘরানার ফিউশন। টপস, শর্ট টপস, টিউনিক, টি-শার্ট, ডেনিম, সালোয়ার-কামিজ, গাউন, কুর্তি, হেরেম প্যান্ট, ডেনিম, সিগার প্যান্ট ও বাহারি ডিজাইন এবং পালাজ্জোতে এসেছে নতুনত্ব ডিজাইন। ছেলেদের জন্য রয়েছে পাঞ্জাবি, শার্ট, টি-শার্ট, পোলো শার্ট, ডেনিম ও টুইল প্যান্টের বৈচিত্র্যময় কালেকশন।

ক্যাটস আই-এর পরিচালক ও ডিজাইন বিভাগের প্রধান সাদিক কুদ্দুস বলেন, এবারের উৎসব যেহেতু রঙিন, তাই উজ্জ্বল নকশার নিরীক্ষাধর্মী কাটের আরামদায়ক কাপড়ের রেডি টু ওয়ার এনেছে ক্যাটস আই। গরমের কারণে পোশাকের নকশায় প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে আবহাওয়ার বিষয়টিও। তরুণীদের ঈদ পোশাকে এবার লং কাটের কুর্তি, টপস সবকিছুতেই আভিজাত্যের পাশাপাশি প্যাটার্নেও এসেছে নানা নিরীক্ষা। ঈদের পাঞ্জাবি, শার্ট, পলো, বটমেও ব্যাপক পরিবর্তন এসেছে। থাকছে কাবলিরও বিশেষ কালেকশন।

ফ্যাশন ডিজাইনারদের মতে, এবার তারা রুচিশীলতার পাশাপাশি ভিন্নধারার মোটিভ নিয়ে কাজ করেছেন। এগুলোর মধ্যে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে জামদানি মোটিফকে। এছাড়া মসলিনের সালোয়ার-কামিজ সেট খুব চলছে। নতুন ট্রেন্ডে নারীদের জন্য থাকছে ড্র্যাপিং স্টাইল ইউনিক লং ড্রেস, ফ্লোর টাচ টু পিস সেট, জিপার অ্যাডেড সালোয়ার-কামিজ, সিগার প্যান্ট এবং কামিজ প্যাটার্ন পালাজ্জোসহ ফিউশনভিত্তিক শর্ট টপ অ্যান্ড পালাজ্জো উইথ এটাচড দোপাট্টা। যার নাম ট্র্যাডিশনাল হিপস্টার। মোটিফের ক্ষেত্রে জামদানি ছাড়াও ব্যবহার করা হয়েছে ইসলামিক মোটিফ, ফ্লোরাল মোটিফ, আলপনা, চিরায়ত দেশীয় উপাদান, ম্যান্ডালা ইত্যাদি। তারা জানান, উৎসবের আবহ ফুটিয়ে তুলতে পোশাকে এবার কফি, ডিপ মেরুন এবং গাঢ় নীলের রঙের প্রাধান্য বেশি। এছাড়াও ম্যাজেন্টা, ধূসর, কালো, সাদা, সবুজ, বেগুনি, গোলাপি ইত্যাদি রঙ ব্যবহার করা হয়েছে। মসলিন, কটন, লিনেন, জর্জেট ও শাটিন কাপড়ে তৈরি মূল পোশাকের সঙ্গে ওড়নায় ব্যবহার করা হয়েছে হাফ সিল্ক্ক এবং টাই-ডাইকৃত শিফন। এবারের পালাজ্জোগুলো এমনভাবে নকশা করা, যেন যে কোনো কামিজ, টিউনিক বা সিঙ্গেল পিসের সঙ্গে মানিয়ে যায়।

মেয়েদের সমকালীন পোশাকের সঙ্গে নিয়মিত সেটের কামিজে এবার এথনিক লুকের জন্য বিভিন্ন ধরনের ফ্লোরাল প্রিন্ট, কাঁথা স্টিচ ও গ্রামীণ পটভূমি ব্যবহার করা হয়েছে। অপটিক্যাল ইলিউশন তৈরি করতে আবার কোথাও ব্যবহার করা হয়েছে স্ট্রাইপ ও জিওমেট্রিক প্যাটার্ন। বটমে লেইস ডিটেইলিংয়ের সঙ্গে দোপাট্টায়ও যোগ করা হয়েছে নান্দনিকতার ছোঁয়া। ফ্যাশনসচেতন তরুণীদের জন্য টিউনিক কালেকশনে রয়েছে স্ট্ক্রিন প্রিন্ট ছাড়াও মেটালিক ওয়ার্ক, কারচুপি ডিটেইলিং, এমব্রয়ডারি, টাই-ডাই ও হ্যান্ড ওয়ার্কসমৃদ্ধ টিউনিক ও লং কামিজ।

শিশুদের পোশাক পরিকল্পনায় আরামের বিষয়টিকে সবচেয়ে বেশি প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে। তাই কটন ও কটন কাপড় ব্যবহার করা হয়েছে বেশি। বিভিন্ন প্রাকৃতিক অনুষঙ্গ, সম ও বিষম পাতার আকৃতি, বৃষ্টির পানির ফোঁটা, ফুল ইত্যাদি মোটিফে নকশা করা হয়েছে শিশুদের পোশাকে। শূন্য থেকে ১৮ মাসের নবজাতক ও শিশুদের আরামদায়ক পোশাকের পাশাপাশি দুই থেকে ১১ বছর বয়সী শিশুদের পোশাকে রং বাছাইয়ের ক্ষেত্রেও প্রাধান্য পেয়েছে উৎসবের ছোঁয়া। মেয়েশিশুদের পার্টি ফ্রকের প্যাটার্নের মধ্যে অন্যতম সার্কুলার ফ্লেয়ার ও র‌্যাপ প্যাটার্ন।

স্বাস্থ্যবিধি উপেক্ষিত :বৈশ্বিক মহামারি করোনার এই সংকটময় সময়েও মানুষ হুমড়ি খেয়ে ঈদের জামাকাপড় কেনাকাটায় ব্যস্ত। অনেকে দলবেঁধে পরিবারের সবাইকে নিয়ে কেনাকাটা করতে আসছেন। অনেকে পরিবারের ছোট্ট শিশুকেও সঙ্গে নিয়ে কেনাকাটা করতে আসছেন। স্বাস্থ্যবিধি না মানার কারণে করোনা সংক্রমণ বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

গতকাল সোমবার রাজধানীর বিভিন্ন শপিংমল ঘুরে দেখা গেছে, অনেক শপিংমলেই বিক্রেতার মুখে মাস্ক নেই, কারও কারও মাস্ক রয়েছে থুতনিতে। ক্যামেরা বা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর উপস্থিতি টের পেলেই মাস্ক পরিধান করছেন। অনেকে মাস্ক পরে থাকলেও শারীরিক দূরত্বের বিষয়টি একেবারে মানছেন না। মার্কেটগুলোতে ক্রেতার এতো ভিড় যে, কেউই শারীরিক দূরত্ব বজায় রাখতে পারছেন না।

মন্তব্য করুন