'কাটে না সময় যখন আর কিছুতে, বন্ধুর টেলিফোনে মন বসে না/ জানলার গ্রিলটাতে ঠেকাই মাথা/ মনে হয়- বাবার মতো কেউ বলে না- আয় খুকু আয়...।' তপ্ত দুপুরে হেমন্ত মুখোপাধ্যায় ও শ্রাবন্তী মজুমদারের গাওয়া গানটি বাজছে বাবুয়ার মোবাইল ফোনে। ভদ্রলোকের ভালো নাম সুশান্ত সেনগুপ্ত। পক্ষাঘাতগ্রস্ত হওয়ায় হাঁটাচলার ক্ষমতা হারিয়েছেন বছর চারেক আগে। তাই বিছানা থেকে খুব প্রয়োজন ছাড়া নামেন না। এক সময় নারায়ণগঞ্জের নামকরা একটি পোশাক কারখানায় ছোট পদে চাকরি করতেন। ছিলেন শ্রমিক নেতা। নানা সংকটে তার দরাজ গলায় কাঁপত প্রতিষ্ঠান চত্বর। অথচ আড়াই বছর ধরে কাপাসিয়ার বীরউজলী গ্রামে 'আব্দুল আলী সেবাশ্রম'-এর একটা কক্ষেই সত্তর ছুঁই ছুঁই বয়সে সময় কাটাচ্ছেন; একা। ভেঙে কক্ষে প্রবেশ করতেই এ প্রতিবেদককে পাশে বসার আহ্বান জানিয়ে অস্পষ্ট স্বরে বলে ওঠেন, 'আইসো'। দীর্ঘ সময় পর গল্প করার মানুষ পেয়ে যেমন উৎফুল্ল হয়ে ওঠেন, তেমনি কথা বলতে গিয়ে মাঝেমধ্যে হাউমাউ করে কান্না জুড়ে দেন। মিনতি জানিয়ে বাবুয়া বলেন, 'এখান থেকে নিয়ে যাও মা। একটু চিকিৎসার ব্যবস্থা করে দাও। আমি সুস্থ হয়ে যাব!'

১৯৮০ সাল থেকে নারায়ণগঞ্জে পোশাক তৈরির কারখানায় চাকরি করেন। ১৯৮৭ সালে শ্রমিকদের অধিকার রক্ষায় প্রতিষ্ঠা করেন নারায়ণগঞ্জ দোকান ও প্রতিষ্ঠান কর্মচারী ইউনিয়ন। সেই থেকে তিনি সংগঠনের সভাপতি পদে দায়িত্ব পালন করেন। ২০১৬ সালে স্ট্রোক করলে পক্ষাঘাতগ্রস্ত হয়ে পড়েন। ২০১৭ সালে সভাপতি পদ থেকে অব্যাহতি নেন। বিপত্তি বাধে ২০১৮ সালে। ওই বছর তার স্ত্রী পদ্মা সেনগুপ্তর মৃত্যুর পর বাবুয়ার জীবনে নেমে আসে অন্ধকার। যে মানুষটা সর্বত্র দাপিয়ে বেড়াতেন, তাকেই একমাত্র ছোট ভাই রেখে যান এ বৃদ্ধাশ্রমে। সংগঠনের বর্তমান সভাপতি মো. মোজাম্মেল হক সমকালকে জানান, ছোট ভাই তার বৌ-বাচ্চা নিয়ে থাকে চট্টগ্রাম। 'প্রতিবন্ধী' মানুষের পরিচয় দিতেও যেন সে ভাই অস্বীকৃতি জানায়। তিনি বলেন, অনেক খোঁজাখুঁজির পর সেবাশ্রমের খবর পাই। পরে ছুটে যাই। বর্তমানে সংগঠন থেকে যতটুকু পারি, প্রতি মাসে ওষুধের জন্য খরচ পাঠাই।

নারায়ণগঞ্জের শীতলক্ষ্যাতীরে সিদ্ধিরগঞ্জের সুমিলপাড়ায় আদমজী জুটমিলে দীর্ঘ বছর কাজ করেছেন সৈয়দ আব্দুল মান্নান। তিনিও ছিলেন শ্রমিক নেতা। বরিশালের বানারীপাড়ার চাখার গ্রামে তার জন্ম। ছয় মেয়ে ও দুই ছেলে। এক ছেলে গাজীপুরের কোনাবাড়িতে এক গার্মেন্ট কারখানায় 'জুনিয়র ইঞ্জিনিয়ার' পদে চাকরি করেন। অন্য ছেলে ঠিকাদার। জীবনের এক ভুলে সব আনন্দ তার মাটি। দ্বিতীয় বিয়ে করেন কুমিল্লায়। সে ঘরে তার দু'সন্তান। অথচ প্রবীণ বয়সে কোনো সন্তানই বাবার দায়িত্ব নিতে চাচ্ছে না। তাই পরিবারহীন থাকতে হচ্ছে তাকে। দেড় বছর আগে ছোট ছেলে শুভ তাকে এই বৃদ্ধাশ্রমে রেখে যায়। এর পর থেকেই ছেলের ফোনের অপেক্ষা। এ প্রতিবেদককে ছেলের মোবাইল নম্বর দিয়ে মান্নান বলেন, 'আমার ছেলেরে একটু বুঝাও মা, আমারে যেন নিয়া যায়। একটা ঘরে চুপ করে পড়ে থাকমুনে। তাও যেন আমারে নিয়া যায়।' কথাগুলো বলেই কান্না জুড়ে দেন।

৭৫ বছর বয়সী পুতুল ভট্টাচার্যেরও একই বায়না। ফরিদপুরের গোয়ালচামটে তার বসতি ছিল। শৈশবে বাবা পুতুলকে ডলি নামে ডাকতেন। বাবা ফণিভূষণ চক্রবর্তীর সেই আদরের ডলি গোয়ালচামটে সুখের সংসার গড়েছিলেন। চার সন্তানের মধ্যে দুই মেয়ের লেখাপড়া শেষে বিয়ে দিয়ে দেন। দুই ছেলেকে স্বাবলম্বী করে তুলেছেন। সংস্কৃতিমনা পুতুলের এক ছেলে আলোকচিত্রী, আরেক ছেলে আর্টিস্ট। একটা সময় বাপ-দাদার 'স্টুডিও' বড় ছেলের নামে করে দেন। কিন্তু বিয়ের পর ছেলেদের মধ্যে পরিবর্তন আসে। মাকে বোঝা মনে করে দেড় বছর আগে এই বৃদ্ধাশ্রমে রেখে যান।

২০১১ সালে কাপাসিয়ার টোক ইউনিয়নের বীরউজলী গ্রামে এই বৃদ্ধাশ্রমটি প্রতিষ্ঠা করেন ড. মো. শাজাহান কবির। বৃদ্ধাশ্রমের নামকরণ হয় তার প্রয়াত বাবার নামে। এ বৃদ্ধাশ্রমে বাবুয়ার মতো আরও ১৩জন প্রবীণ ব্যক্তি রয়েছেন। তারা হলেন- মনছুর আলী বেপারী, হালিম শহিদ, রজব আলী, রাজিয়া খাতুন, মহরাজ বেগম, এক বাক প্রতিবন্ধী, শামসুল হুদা, ফজুরী খাতুন, আব্দুল কামাল মিয়া, মো. সিরাজুল ইসলাম ও আব্দুল লতিফ। বৃদ্ধাশ্রমে তাদের আসার পেছনের গল্পটা প্রায় সবারই এক রকম। স্বজনের কাছে 'বোঝা' হয়ে ওঠার পর এখানে আসতে বাধ্য হন তারা।

ড. মো. শাজাহান কবির বলেন, পরিবারের প্রতিটি সদস্য সুখে-শান্তিতে থাকতে চায়। কিন্তু সে সুখ সবার কপালে সইলেও কেউ কেউ পরিবারের সে বন্ধন পায় না। এ জন্য নানা কারণে আপন নিবাস ছেড়ে তার স্থান হয় বৃদ্ধাশ্রমে। আমরা এখানে থাকা প্রত্যেককেই পরম মমতায় রাখি।

এদিকে, সম্প্রতি আব্দুল আলী সেবাশ্রমে সুবিধাবঞ্চিত এই বাবা-মায়েদের মাঝে উপহার সামগ্রী বিতরণ করেছে 'স্টোরিটেলারস অব বাংলাদেশ' অর্থাৎ 'বাংলাদেশের গল্পকাররা' নামক ফেসবুকভিত্তিক একটি সংগঠন। একই সঙ্গে সংগঠনের স্বেছাসেবীরা স্মৃতি হিসেবে একটি 'লবঙ্গ' গাছের চারা রোপণ করেন প্রবীণদের সঙ্গে নিয়ে। 'স্টোরিটেলারস অব বাংলাদেশ' সংগঠনের প্রতিষ্ঠাতা ড. হাসান মোহাম্মদ মাহাদী সমকালকে বলেন, 'বৃদ্ধ বয়সে মানুষ তার দ্বিতীয় শৈশবে পদার্পণ করে। এ সময় একজন বৃদ্ধ সবচেয়ে যে জিনিসটি চায়, সেটি হলো কারও সাহচর্য। সে দিকটি খেয়াল করেই আমরা সেই বৃদ্ধাশ্রমে সারাদিন কাটিয়েছি। তাদের আবেগমাখা স্মৃতিচারণ শুনেছি। কেউ হয়তো তার বৃদ্ধাশ্রমে আসার বেদনাপূর্ণ গল্প বলতে গিয়ে অশ্রুসিক্ত হয়েছেন। শত কষ্টেও সেই অশ্রু ধরে রাখতে পারিনি আমরাও। সন্তানের অবহেলার যন্ত্রণা যে কতটা বিষাক্ত, তা তাদের চাহনিতেই স্পষ্ট। আবেগাপ্লুত হয়েছি আমরাও।'

প্রত্যেক প্রবীণ ব্যক্তিকে শাড়ি, লুঙ্গি, পাঞ্জাবি, গেঞ্জি, টাওয়েল, জুতাসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় শুকনো খাবার, দুধ, চা, চিনি, সুগার ফ্রি সুইটেনার ও প্রয়োজনীয় ওষুধ দেওয়া হয়েছে। তাদের সঙ্গে ইফতারি ও রাতের খাবারও খেয়েছেন স্বেচ্ছাসেবীরা।

মন্তব্য করুন