রাজধানীর মেরুল বাড্ডা থেকে রিকশায় শাহবাগে যাচ্ছিলেন দুই যুবক। এক যুবকের হাতে ছিল একটি ব্যাগ। রিকশার সিটের ডান পাশে বসে ছিলেন তিনি। সন্ধ্যা পৌনে ৭টার দিকে রিকশাটি মৎস্য ভবন মোড় পার হয়ে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের দিকে যাওয়ার সময় একটি ট্যাক্সিক্যাব গতি কমায় তাদের পাশে। মুহূর্তের মধ্যেই সেটি থেকে এক ব্যক্তি হাত বাড়িয়ে যুবকের ব্যাগ হ্যাঁচকা টানে ছিনিয়ে নিয়ে গাড়ির গতি বাড়িয়ে পালিয়ে যায়।

ঘটনাটি ঘটে গত ৬ মে। ছিনতাইয়ের কবলে পড়া দুই যুবকের মধ্যে একজনের নাম মামুন। তিনি সমকালকে বলেন, ব্যাগে মোবাইল ফোন, এটিএম কার্ড, কিছু টাকা ও প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ছিল। ঘটনার পর তারা শাহবাগ থানায় মৌখিকভাবে বিষয়টি জানান। তবে জিডি বা মামলা করেননি।

ঈদুল ফিতরকে সামনে রেখে রাজধানী ঢাকায় ছিনতাইয়ের ঘটনা বেড়েছে। প্রায় প্রতিদিনই কোথাও না কোথাও ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটছে। যদিও বেশিরভাগ ঘটনায় মামলা হচ্ছে না। স্বল্প মূল্যের জিনিস কিংবা অল্প কিছু টাকা ছিনতাই হলে ভুক্তভোগীরা সাধারণত মামলা করতে আগ্রহ দেখান না। কেউ মামলা করতে আগ্রহ দেখালেও অনেক ঘটনায় মামলা করতে নিরুৎসাহিত করে পুলিশ। ছিনতাই হিসেবে উল্লেখ না করে হারানোর জিডি করতে অনেক ক্ষেত্রে ভুক্তভোগীকে বাধ্য করা হয়। সাধারণত ছিনতাইকারীর হাতে কেউ নিহত হলেই বিষয়টি আলোচনায় আসে। এ কারণে ছিনতাইয়ের প্রকৃত পরিসংখ্যান আর সামনে আসে না।

ঢাকা মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার কৃষ্ণ পদ রায় সমকালকে বলেন, 'কিছুদিন ধরে ছিনতাইয়ের প্রবণতা বেড়ে যাওয়ার ঘটনা আমরা লক্ষ্য করেছি। যেসব ঘটনা ঘটছে সেগুলোর তদন্ত করা হচ্ছে।' খোঁজখবর নিয়ে জানা গেছে- 'টানা পার্টি' 'সালাম পার্টি, 'বন্ধু পার্টি', 'গামছা পার্টি' নামে রাজধানীতে ছিনতাই চক্র দাপিয়ে বেড়াচ্ছে। পুলিশ বা ডিবি পরিচয়ে গ্রেপ্তার ও মামলার ভয় দেখিয়েও ছিনতাই হচ্ছে। গত ৫ মে সন্ধ্যায় রামপুরা বাজার থেকে কেনাকাটা করে হেঁটে পশ্চিম হাজিপাড়ার বাসায় ফিরছিলেন বিজিত পাল নামের এক ব্যক্তি। তিনি হাজিপাড়া তেলপাম্পের বিপরীতে পাশে পৌঁছলে পুলিশের পোশাক পরা এক ব্যক্তি তার পথরোধ করেন। নিজেকে পুলিশ পরিচয় দিয়ে তার ব্যাগ তল্লাশি করেন ওই ব্যক্তি। এর পর বিজিতের কাছ থেকে ১০ হাজার টাকা দাবি করা হয়। টাকা না দিলে মামলায় ফাঁসিয়ে দেওয়ার হুমকি দেওয়া হয়। এক পর্যায়ে বিজিত পালের মানিব্যাগে থাকা সাত হাজার টাকা ছিনিয়ে নিয়ে তিনি মোটরসাইকেল চালিয়ে বাড্ডার দিকে চলে যান। বিজিত পাল বলেন, এ ঘটনায় তিনি জিডি বা মামলা করতে আগ্রহী হননি।

গত ৫ মে সকালে কমলাপুরে বিআরটিসি বাস ডিপোর সামনে ছিনতাইকারীদের হ্যাঁচকা টানে সুনিতা রানী দাস নামে এক নারী রাস্তায় পড়ে মারা যান। ছিনতাইকারীরা তার ব্যাগটি ছিনিয়ে নিয়ে প্রাইভেটকারে পালিয়ে যায়। ঘটনার পর পুলিশ জানিয়েছে, সুনিতা রানী দাসের বাসা গোপীবাগের ঋষিপাড়ায়। স্বামী সুজন চন্দ্র দাস অসুস্থ থাকায় সংসারের হাল ধরতে হয় সুনিতাকে। তিনি বাসাবোর বৌদ্ধমন্দিরসহ বিভিন্ন স্থানে পরিচ্ছন্নতাকর্মী হিসেবে কাজ করতেন। ৫ মে সকালে তিনি ভাগ্নে সুজিতকে সঙ্গে নিয়ে রিকশায় কর্মস্থলে যাচ্ছিলেন। তাদের অনুসরণ করছিল একটি প্রাইভেটকার। কমলাপুরে বিআরটিসি বাস ডিপোর সামনে হঠাৎ সেটি রিকশার ঠিক পাশে চলে আসে। পরের মুহূর্তে সুনিতার হাতে থাকা ভ্যানিটি ব্যাগ ধরে টান দেয় গাড়িতে থাকা এক ছিনতাইকারী। হ্যাঁচকা টানে রিকশা থেকে পড়ে যান সুনিতা। মাথায় আঘাত লেগে প্রাণ হারান তিনি। এর আগেও রাজধানীতে চলন্ত প্রাইভেটকার আরোহী ছিনতাইকারীদের হ্যাঁচকা টেনে বেশ কয়েকজনের মৃত্যু হয়েছে।

গত ৬ মে কুড়িল ফ্লাইওভারে দুবাই প্রবাসী সুভাষ চন্দ্র সূত্রধরকে (৩২) হত্যা করে লাশ ফেলে রেখে যায় দুর্বৃত্তরা। নিহতের স্বজনরা জানিয়েছেন, সুভাষের বাড়ি বগুড়ার শিবগঞ্জ থানার বড় নারায়ণপুরে। দুবাইয়ে থাকতেন তিনি। দেশে আসেন গত নভেম্বরে। ফের তার দুবাই যাওয়ার কথা ছিল। সেজন্য তিনি ৫ মে গ্রামের বাড়ি বগুড়া থেকে ঢাকায় রওনা হন করোনা টেস্ট করাতে। দুবাই যাওয়ার টিকিট কেনার টাকাসহ ৬০-৭০ হাজার টাকাও ছিল তার কাছে। রাতেই তিনি ছিনতাইকারীর কবলে পড়েন বলে ধারণা করছে পুলিশ। তার লাশের পাশে একটি গামছা পাওয়া গেছে- যেটি তার নয়। পুলিশের ধারণা, গামছা দিয়ে তাকে শ্বাসরোধে হত্যার পর গাড়িতে করে লাশ সেখানে ফেলে রেখে গেছে দুর্বৃত্তরা। তার সঙ্গে থাকা টাকাপয়সাও খোয়া গেছে। এর আগেও এই ফ্লাইওভারে ছিনতাইকারীদের হাতে প্রাণ হারিয়েছেন বেশ কয়েকজন।

মন্তব্য করুন