গুলশানের লেকশোর হোটেলে গত বছরের ২৫ জানুয়ারি ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) মেয়র পদপ্রার্থী হিসেবে নির্বাচনী ইশতেহার ঘোষণা করেছিলেন আতিকুল ইসলাম। আর ২৯ জানুয়ারি আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে ইশতেহার ঘোষণা করেছিলেন ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) মেয়র পদপ্রার্থী ব্যারিস্টার শেখ ফজলে নূর তাপস। দু'জনই আওয়ামী লীগের মনোনয়নে গত বছরের ১ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে মেয়র নির্বাচিত হন। ব্যারিস্টার তাপসের মূল নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি ছিল পাঁচটি- ঐতিহ্যের ঢাকা, উন্নত ঢাকা, সুশাসিত ঢাকা, সচল ঢাকা ও সুন্দর ঢাকা। আর আতিকুল ইসলামের প্রতিশ্রুতি ছিল সুস্থ-সচল আধুনিক ঢাকা। গত ১৩ মে মেয়র হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার এক বছর পূরণ করেছেন আতিকুল ইসলাম। গতকাল ১৬ মে এক বছর পূর্ণ করেছেন ব্যারিস্টার তাপস। নির্বাচনী ইশতেহারে বর্তমান দুই মেয়র পাঁচ বছর দায়িত্ব পালন শেষে যেসব ওয়াদা বাস্তবায়নের আশ্বাস দিয়েছিলেন, গত এক বছরে সেসবের অগ্রগতি অনেক কম।

ঢাকার দুই সিটির মেয়র ও শীর্ষ কর্মকর্তারা বলছেন, করোনা মহামারির ঢেউয়ের মধ্যে তারা দায়িত্ব নিয়েছিলেন। তাই কাঙ্ক্ষিত কাজ করা শতভাগ সম্ভব হয়নি। তার পরও অনেক কিছুই পরিবর্তন হয়েছে। পার্ক-খেলার মাঠের আধুনিকায়ন হয়েছে। অবৈধ দখল উচ্ছেদ করা হচ্ছে। জলাবদ্ধতা নিরসনের কাজ চলছে। এলইডি বাতি সংযোজন করা চলছে। ড্রেনেজ ব্যবস্থাকে আধুনিকায়ন করা হচ্ছে।

আতিকুল ইসলামের নির্বাচনী ইশতেহারে সর্বাধিক গুরুত্ব পেয়েছিল মশা। মশার যন্ত্রণা বর্তমানে নিয়ন্ত্রণে থাকলেও বিভিন্ন সময়ে মশার যন্ত্রণা প্রকট আকার ধারণ করেছে। তবে মশার ওষুধ নিয়ে যে সিন্ডিকেট ছিল, ভেজাল ওষুধ সরবরাহ করা হতো, মশার ওষুধ আমদানির ক্ষেত্রে যেসব প্রতিবন্ধকতা ছিল, সেই সিন্ডিকেট ভাঙতে পেরেছেন দুই মেয়র। এটাকে সফলতা হিসেবে দেখছেন দুই সিটি করপোরেশনের শীর্ষ কর্মকর্তারা। বিপরীতে গণপরিবহনে শৃঙ্খলা ফেরানোর ওয়াদার কার্যত দৃশ্যমান অগ্রগতি নেই। তবে মেয়র আতিকুল ইসলাম বলছেন, এরই মধ্যে ঘাটারচর থেকে কাঁচপুর পর্যন্ত বাসরুট ফ্র্যাঞ্চাইজ করার সিদ্ধান্ত হয়েছে। খুব শিগগিরই পরীক্ষামূলকভাবে চালু করা হবে।

এদিকে দূষণমুক্ত নগর উপহার দেওয়ার যে ওয়াদা আতিকুল ইসলাম দিয়েছিলেন, তার কোনো কিছুই অগ্রগতি হয়নি; বরং গত এক বছরের মধ্যে মাঝেমধ্যেই রাজধানী ঢাকার নাম বিশ্বের সবচেয়ে দূষিত শহরের তালিকায় ঠাঁই পেয়েছে।

অবশ্য গত ৩১ ডিসেম্বর ঢাকা ওয়াসার কাছ থেকে রাজধানীর ড্রেনেজ ব্যবস্থা দুই সিটির কাছে হস্তান্তরের পর দুই মেয়রই খাল উদ্ধারে দৃশ্যমান তৎপরতা শুরু করেছেন। বেশ কয়েকটি খালে অভিযান চালিয়ে দখলমুক্ত করেছেন। নন্দীপাড়া খাল দখলমুক্ত করে কিছু অংশ নৌকায় ভ্রমণও করেছিলেন দক্ষিণের মেয়র ব্যারিস্টার শেখ তাপস। আতিকুল ইসলামও খাল উদ্ধারে সরাসরি অংশ নিয়েছেন। পাশাপাশি ঐতিহ্যের ঢাকা গড়ার কিছু উদ্যোগও চোখে পড়েছে মেয়র তাপসের। ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনার মধ্য দিয়ে এবার ডিএসসিসির প্রতিটি ওয়ার্ডে সাকরাইন উৎসব পালন করা হয়েছে ডিএসসিসির উদ্যোগে। আন্তঃওয়ার্ড ক্রীড়া প্রতিযোগিতা আয়োজনও প্রশংসা পেয়েছে। এ ছাড়া ম্যারাথন আয়োজনের উদ্যোগকেও নগরবাসী সাধুবাদ জানিয়েছেন। তারা বলছেন, মাদকমুক্ত যুবসমাজ গড়তে এই আয়োজন সারা বছরই প্রয়োজন। এ ছাড়া খেলার মাঠ ও পার্কগুলোকে আধুনিকায়নের কাজ চলছে দুই সিটিতে। পাশাপাশি দুই সিটিতেই প্রায় প্রতিদিন চলছে উচ্ছেদ অভিযান। কিন্তু গুলিস্তান-মতিঝিল-উত্তরা-মহাখালীর অনেক জায়গার ফুটপাতই দখলমুক্ত করতে পারেনি দুই সিটি করপোরেশন। পুরো গুলিস্তান দীর্ঘদিন ধরেই হকারদের দখলে রয়েছে। তবে কয়েকটি মার্কেট থেকে অবৈধ দোকানপাট উচ্ছেদ করতে সক্ষম হয়েছে ডিএসসিসি। সম্প্রতি সেগুলো আবার বেদখল হয়ে যাওয়ারও অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে। পাশাপাশি পুরান ঢাকায় রাসায়নিক গুদাম এখনও রয়ে গেছে। ফলে মাঝেমধ্যেই ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে ঘটছে প্রাণহানির ঘটনা। এ ছাড়া বছরজুড়ে খোঁড়াখুঁড়ি ও ভাঙাচোরা রাস্তাঘাটের বিষয়েও মাঝেমধ্যেই অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে। অপরিকল্পিত ও ঘিঞ্জি এলাকাগুলোকে পরিকল্পিভাবে গড়ে তোলার উদ্যোগও তেমন নেই।

তবে আদি বুড়িগঙ্গা চ্যানেল উদ্ধার করে আধুনিক করার উদ্যোগ নিয়েছেন মেয়র তাপস। এটা বাস্তবায়ন হলে ওই এলাকার চেহারা আমূল বদলে যাবে বলে মনে করা হচ্ছে। অন্যদিকে মিরপুরে বেড়িবাঁধ এলাকায় হাতিরঝিলের মতো একটি প্রকল্প বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিয়েছেন মেয়র আতিক।

করোনার মহামারির সময়ে ডিএনসিসি মার্কেটের মতো বৃহৎ শপিং কমপ্লেক্সকে করোনা রোগীদের চিকিৎসার জন্য স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়কে হস্তান্তর করে প্রশংসা কুড়িয়েছে ডিএনসিসি। পাশাপাশি মহানগর জেনারেল হাসপাতালেও করোনা রোগীর চিকিৎসার ব্যবস্থা করেছে ডিএসসিসি। এসব প্রসঙ্গে ডিএসসিসির জনসংযোগ কর্মকর্তা আবু নাছের বলেন, এক বছরে নগরের যে পরিমাণ উন্নয়ন নগরবাসীর কাছে কাঙ্ক্ষিত ছিল, করোনা মহামারির কারণে তাতে কিছুটা ঘাটতি পড়েছে; কিন্তু ডিএসসিসি থেমে নেই। কাজ করে যাচ্ছে। আশা করা যায়, পাঁচ বছর দায়িত্ব পালন শেষে ইশতেহার অনুযায়ী একটি ঢাকা শহর দেখা যাবে।

মন্তব্য করুন