করোনা থেকে সুরক্ষায় প্রাথমিক প্রতিরোধ হিসেবে উপকারে আসে মাস্ক। এটি দেশের সকল নাগরিকের কাছে বিনামূল্যে পৌঁছে দিতে হবে। সম্প্রতি সীমান্ত জেলাগুলোতে সংক্রমণ ব্যাপকতা পেয়েছে, যা সারাদেশেও ছড়িয়ে পড়তে পারে। এ বাস্তবতায় দেশব্যাপী সংক্রমণ ঠেকাতে গ্রাম-শহর এবং ধনী-গরিব সবাইকে সমান গুরুত্ব দিতে হবে। সব নাগরিকের জন্য বিনামূল্যে করোনা পরীক্ষার ব্যবস্থাও সরকারকে করতে হবে।

'মাস্কের ব্যবহার সহজ করা :প্রসঙ্গ স্বাস্থ্য এবং অর্থনীতি' শীর্ষক এক ওয়েবিনারে গতকাল বুধবার এই পরামর্শ দেন বিশেষজ্ঞরা। বাংলাদেশ উন্নয়ন অধ্যয়ন প্রতিষ্ঠান (বিআইডিএস) আয়োজিত এই ওয়েবিনারে সভাপতিত্ব এবং সঞ্চালনা করেন সংস্থার মহাপরিচালক ড. বিনায়ক সেন।

ওয়েবিনারে বিশেষজ্ঞরা বলেন, করোনা মোকাবিলায় সরকার সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছে। এ ক্ষেত্রে সবার জন্য সাশ্রয়ী মাস্কের ব্যবস্থা করতে হলে ২৫ কোটি টাকার বেশি প্রয়োজন হবে না। সরকারকে এই অর্থের ব্যবস্থা করতে হবে। ওয়েবিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন যুক্তরাষ্ট্রের ইয়েল ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক আহম্মেদ মুশফিক মুবারক। তিনি বলেন, বিনামূল্যে সবার মধ্যে মাস্ক বিতরণ হতে পারে করোনা মোকাবিলার সবচেয়ে সাশ্রয়ী পন্থা। মাস্ক ব্যবহারের গুরুত্ব এবং সঠিক ব্যবহার পদ্ধতি ব্যাপকভাবে প্রচারের জন্য সব ধরনের মাধ্যমকে কাজে লাগাতে হবে। বিশেষ করে মসজিদের ইমাম এবং স্থানীয় নেতাদের মাধ্যমে মাস্ক ব্যবহারের প্রয়োজনীয়তা ও উপকারিতা তুলে ধরতে হবে। মাস্ক বিতরণে গ্রাম পুলিশ এবং চৌকিদারদেরও কাজে লাগানো সম্ভব।

ওয়েবিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রীর অর্থনীতিবিষয়ক উপদেষ্টা ড. মসিউর রহমান বলেন, গ্রাম পুলিশ এবং চৌকিদাররা তাদের ওপর অর্পিত দায়িত্বই পালন করতে পারছেন না। এর ওপর নতুন দায়িত্ব দিলে কোনো ফল হবে না। তিনি বলেন, সামাজিক নিরাপত্তার বিভিন্ন কর্মসূচি সঠিকভাবে বাস্তবায়নের মতো পর্যাপ্ত তথ্য-উপাত্ত সরকারের কাছে নেই। এমনকি গবেষণা সংস্থাগুলোও সঠিক তথ্য দিতে পারবে না। নতুন দারিদ্র্যের ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। তবে কিছু অনিয়ম থাকলেও সরকারের নীতি হচ্ছে উপযুক্তদের কেউ যাতে বাদ না পড়ে।

আলোচনায় বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ড. রেহমান সোবহান বলেন, করোনা মোকাবিলায় মাস্কের ব্যবহার একটা ভালো বিকল্প। অথচ মাস্কের ব্যবহার এবং সামাজিক দূরত্ব রক্ষার কাজটি সহজ নয়। এটাই সরকারের অগ্রাধিকার হওয়া উচিত। সরকার, এনজিও ও সুশীল সমাজ এ বিষয়ে একসঙ্গে কাজ করলে কোনো সমস্যা হওয়ার কথা নয়। তিনি বলেন, সবার জন্য টিকা সংগ্রহে সরকারের কূটনৈতিক কৌশল দরকার।

তবে বিনামূল্যে মাস্ক বিতরণ প্রসঙ্গে অর্থ বিভাগের সিনিয়র সচিব আব্দুর রউফ তালুকদার ওয়েবিনারে বলেন, ২৫ কোটি টাকা মূল্যের মাস্ক বিতরণে আরও ৫০ কোটি টাকার প্রয়োজন হবে। এটা কার্যকর কিছু হবে না, বরং অপব্যবহার হবে।

পরিকল্পনা কমিশনের সচিব মোহাম্মদ জয়নুল বারী বলেন, করোনা এবং গণস্বাস্থ্য-সংক্রান্ত যে কোনো প্রকল্প প্রাক্‌-মূল্যায়ন এবং অনুমোদনে অগ্রাধিকার দেবে পরিকল্পনা কমিশন।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. আতিউর রহমান বলেন, বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর এক শতাংশ করপোরেট সামাজিক দায়বদ্ধতা (সিএসআর) তহবিল থেকে ১২৫ কোটি টাকার তহবিল করোনাকালে জরুরি ব্যয় হিসেবে ব্যবহার করতে পারে সরকার।

ড. বিনায়ক সেন বলেন, এনজিও এ দেশের সম্পদ। এগুলোকে কাজে লাগাতে হবে। জাতীয় বিভিন্ন ইস্যুর নীতি প্রণয়নে সমাধান কৌশল পদ্ধতির চর্চা শুরু হয়েছে।

ব্র্যাকের নির্বাহী পরিচালক আসিফ সালেহ বলেন, এনজিও জোটের মাধ্যমে ৩৫ জেলায় ৬০ লাখ মাস্ক বিতরণ করা হয়েছে। বাকি জেলাগুলোর সবার হাতে বিনামূল্যে মাস্ক পৌঁছাতে আরও ২৫ কোটি টাকা প্রয়োজন। এ অর্থ চেয়ে সরকারের কাছে আবেদন করেও কোনো ফল হয়নি।

আলোচনায় আইসিডিডিআর'বির রোগতত্ত্ব বিজ্ঞানী ড. ফেরদৌসি কাদরি বলেন, সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় মাস্ক এবং টিকা পৌঁছে দিতে না পারলে সব প্রচেষ্টাই ব্যর্থ হবে। মাস্কের কার্যকর ব্যবহার নিশ্চিত করতে স্থানীয়দের কাজে লাগানোর পরামর্শ দেন তিনি।

মন্তব্য করুন