করোনা সংকটে আমচাষি ও ব্যবসায়ীদের সুবিধার কথা চিন্তা করে গত বছর চালু করা হয় ম্যাঙ্গো স্পেশাল ট্রেন। গত বছর বিশেষ এই ট্রেনটির ব্যবহার ছিল হতাশাজনক। চলতি বছর কিছুটা উন্নতি হলেও তা ট্রেনের বহন ক্ষমতার তুলনায় একেবারেই কম। বিশেষ ট্রেনটির ৪৩ টনের পাঁচটি ওয়াগনে দৈনিক আমসহ সবজি বহনের ক্ষমতা ২১৫ টন। গত বছরের পুরো মৌসুমে আমসহ কৃষিপণ্য পরিবহন হয়েছে মাত্র ৮৫৬ টন। এ বছরের ২৭ মে থেকে ১৪ জুন পর্যন্ত বহন হয়েছে এক হাজার ৬৯ টন।

কুরিয়ার সার্ভিসে আম পরিবহন করতে রাজশাহী থেকে ঢাকা পর্যন্ত খরচ হয় কেজিতে ১০ থেকে ১৬ টাকা। ম্যাঙ্গো ট্র্রেনে ৩০ কেজি পর্যন্ত আম রাজশাহী-ঢাকা পরিবহনে খরচ হয় ৩৫ টাকা। তবুও ট্রেনে আম পাঠাতে অনীহা বড় ব্যবসায়ীদের। তবে অনলাইনে যোগাযোগ করে ব্যবসায়ী ও স্বজনদের কাছে যারা আম পাঠান তাদের কাছে কিছুটা জনপ্রিয় হয়ে উঠছে ম্যাঙ্গো ট্রেন।

সংশ্নিষ্টরা বলছেন, ঢাকার মোড়ে মোড়ে কুরিয়ারের ডেলিভারি সার্ভিসের তুলনায় ম্যাঙ্গো ট্রেনের ডেলিভারি সার্ভিস একেবারেই নেই। আম নিতে যেতে হয় স্টেশনে। আর কুরিয়ার খরচ বেশি নিলেও অনেক ক্ষেত্রে তারা কুরিয়ারের বড় গাড়ি নিয়ে চলে যায় বাগানে। বাগান থেকে সরাসরি লোড করে চলে যায় ঢাকায়। অন্যদিকে বড় ব্যবসায়ীদের আম ট্রাকে নিতে খরচ ও ঝামেলা কম হয়। কারণ হিসেবে তারা বলছেন, বাগান থেকে রেলস্টেশনে আম নিতে একবার পরিবহন খরচ দিতে হয়। কুলি খরচ দিতে হবে ওঠা এবং নামা দুই স্টেশনেই। ঢাকা স্টেশন থেকে আবারও আড়তে নিতে দিতে হবে পরিবহন খরচ। এসব বিবেচনা করলে ট্রেনের চেয়ে ট্রাকে আম পরিবহনে খরচ ও ঝামেলা কম।\হএ বছর ১৪ জুন পর্যন্ত চাঁপাইনবাবগঞ্জ স্টেশন থেকে ৩০৬ টন এবং রাজশাহী স্টেশন থেকে মাত্র ১২৯ টন আম ট্রেনে উঠেছে। এ ছাড়া রহনপুর, নিজামপুর, নাচোল, আমনুরা, কাঁকনহাট, সারদা, আড়ানী, আব্দুলপুর, লোকমানপুর থেকে উঠেছে অবশিষ্ট আমসহ সবজি।

রাজশাহীর চারঘাটের আমচাষি রেজাউল ইসলাম বলেন, ট্রেনের চেয়ে ট্রাকে আম পরিবহন করা অনেক সহজ। বাগান থেকে আম ট্রাকে তুলে সরাসরি দেশের যে কোনো আড়তে সহজেই নেওয়া যায়। বাড়তি কোনো ভোগান্তি পোহাতে হয় না।

চারঘাট সদরের আম ব্যবসায়ী মাসুদ রানা বলেন, ট্রেনে কেজিপ্রতি আম পরিবহনে খরচ হয় ১ টাকা ১৮ পয়সা। চারঘাট থেকে ট্রাকে এক ক্যারেট আম ঢাকায় পাঠাতে আমাদের খরচ হয় ৫০ থেকে ৫৫ টাকা। কেজিপ্রতি পড়ে ২ টাকা। ট্রেনে আম পাঠালে খরচ সামান্য কম হলেও ঝক্কি-ঝামেলা অনেক বেশি। তবে আমচাষি ও ব্যবসায়ীদের চেয়ে ট্রেনে কিছুটা সুবিধা পান অনলাইন ব্যবসায়ীরা। 'রাজশাহীর আম' নামের অনলাইন ব্যবসায়ী শামীম রেজা বলেন, গত মৌসুমের মতো এবারও অনলাইনে আমের ব্যবসা করছি। করোনাকালে অনলাইনে ভালো সাড়া পাচ্ছি।\হম্যাঙ্গো স্পেশাল ট্রেনের বিষয়ে রাজশাহীর সারদা স্টেশন মাস্টার ইকবাল কবির বলেন, প্রতিদিনই আমের বুকিং চলছে। স্টেশন থেকে দূরত্বের কৃষক ও ব্যবসায়ীদের আম কম আসে। যারা অনলাইন আম ব্যবসা করেন ও আত্মীয়-স্বজনের কাছে আম পাঠান তারা অনেক আম বুকিং করছেন।\হচাঁপাইনবাবগঞ্জ স্টেশনের ব্যবসায়ীরা বলছেন, ট্রেনে আম বুকিং দেওয়ার পর নিরাপদে কমলাপুর স্টেশনে পৌঁছে যাচ্ছে কোনো ঝামেলা ছাড়াই। অল্প আম ট্রাকে নিলে খরচ বেশি হয়। কুরিয়ার সার্ভিসের পরিবহন খরচ বেশি এবং আম নষ্ট হওয়ার ঘটনাও ঘটে। তাই অল্প আম পাঠালে ট্রেনেই সুবিধা। তবে বড় ব্যবসায়ীদের আম ট্রেনে পাঠাতে অনেক অসুবিধা। বাগান থেকে টেনে স্টেশনে আনা, ট্রেনে ওঠানো, আবার ঢাকার স্টেশন থেকে আড়তে নেওয়ার জন্য পরিবহন ভাড়া করতে অনেক বেশি খরচ হয়। তাই বড় ব্যবসায়ীরা ট্রেনে পাঠান না।\হচাঁপাইনবাবগঞ্জ পৌর এলাকার গণকা-বিদিরপুর এলাকার তানজিলা খাতুন নামে এক অনলাইন আম ব্যবসায়ী জানান, অনলাইনে আমের চাহিদা অনুযায়ী ঢাকায় রেলের মাধ্যমে সরবরাহ করেন তিনি। তার মতো অনেকেই এভাবে আম পাঠান।\হশিবগঞ্জের ইসমাইল খান শামিম জানান, শিবগঞ্জ থেকে চাঁপাইনবাবগঞ্জ স্টেশনে আম পরিবহন, কুলি খরচ এবং ঢাকার স্টেশন থেকে আবার গন্তব্যে আম নিয়ে যেতে যে খরচ ও ঝামেলা হয়, তার চেয়ে ট্রাকে আম পরিবহন বেশি সহজ ও খরচ কম হয়।\হচাঁপাইনবাবগঞ্জ রেলওয়ে স্টেশনের সহকারী স্টেশন মাস্টার ওবাইদুল্লাহ জানান, ব্যবসায়ীদের চেয়ে ব্যক্তিমালিকদের কাছেই বেশি বুকিং দেওয়া হচ্ছে। এসব বিষয়ে পশ্চিমাঞ্চল রেলের বিভাগীয় বাণিজ্যিক কর্মকর্তা নাসির উদ্দীন বলেন, আম পরিবহন করে যে আয় হয়, তা দিয়ে রেলের তেল খরচও হয় না। এই ট্রেন আসলে লাভ করার জন্য নয়, সামাজিক সেবার অংশ হিসেবে সরকার চালু করেছে। মোড়ে মোড়ে ডেলিভারি সার্ভিস সেন্টার না থাকলেও টাঙ্গাইল, কালিয়াকৈর, জয়দেবপুর, টঙ্গী, বিমানবন্দর, তেজগাঁও ও কমলাপুর রেলস্টেশন থেকে কুরিয়ার সার্ভিসের মতোই ৭২ ঘণ্টার মধ্যে পণ্য সংগ্রহ করা সম্ভব হচ্ছে। গত বছরের চেয়ে এবার অনেক বেশি সাড়া পড়েছে।

বিষয় : ম্যাঙ্গো ট্রেন

মন্তব্য করুন