পাঁচ বছর আগে শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (শাবি) এক জরিপে রাজা ম্যানশনকে 'ঝুঁকিপূর্ণ' হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছিল। সেই সময় মার্কেট ভবন ভেঙে ফেলার নির্দেশ দিয়েছিল সিলেট সিটি করপোরেশন (সিসিক)। সম্প্রতি কয়েক দফা ভূমিকম্প অনুভূত হওয়ার পর সিসিক রাজা ম্যানশনসহ ছয় মার্কেট প্রাথমিকভাবে ১০ দিনের জন্য বন্ধ করে দেয়। এরপর মার্কেটের মালিকপক্ষ ভবন ভেঙে ফেলতে চাইলেও ব্যবসায়ীদের উদ্যোগে রং লাগিয়ে এই মার্কেট আবার পুরোদমে সচল হয়েছে। 'ঝুঁকিপূর্ণ' মার্কেট ভবন কী প্রক্রিয়ায় সচল হলো, তা জানেন না বলে দাবি করেছেন সিসিকের প্রধান প্রকৌশলী নুর আজিজুর রহমান।

নগরীর পশ্চিম জিন্দাবাজারে দীর্ঘদিন ধরে জরাজীর্ণ চেহারার রাজা ম্যানশনের অধিকাংশ লাইব্রেরি ও স্টেশনারি পণ্যের দোকান। তিনতলাবিশিষ্ট মার্কেটে কম্পিউটার, প্রিন্টিং, ট্রাভেলস ও কুরিয়ার সার্ভিসের অফিসও রয়েছে। স্থানীয় একটি দৈনিক পত্রিকার অফিস এবং তাদের প্রেসও আছে। ২০১৬ সালে শাবির এক গবেষণায় নগরীর আরও কিছু ভবনের পাশাপাশি রাজা ম্যানশনকে ভূমিকম্পের 'ঝুঁকিপূর্ণ' হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। এরপর সিসিক ভবনটি ভেঙে ফেলার নির্দেশ দিলেও রহস্যজনকভাবে তা বাস্তবায়ন হয়নি। গত ২৯ ও ৩০ মে দফায় দফায় নগরীতে ভূমিকম্পের পর রাজা ম্যানশনসহ ছয়টি মার্কেট ১০ দিনের জন্য বন্ধ করেছিল সিসিক।

এরপর সংশ্নিষ্টরা চাপ দিলে সিসিক তাদের 'ঝুঁকিমুক্ত' সার্টিফিকেট দিতে বলে। এ প্রসঙ্গে সিসিকের প্রধান প্রকৌশলী নূর আজিজুর রহমান সমকালকে বলেন, ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত ভবনগুলো কতটুকু ঝুঁকিপূর্ণ, তা নিশ্চিত হতে শাবির সংশ্নিষ্টরা সয়েল টেস্ট ও অবকাঠামোগত প্রতিবেদন চেয়েছেন। ভবন মালিকদের এসব দিতে বলা হলেও একটি মার্কেট ছাড়া অন্যরা দেয়নি। এর মধ্যে লকডাউনের জন্য পুরো প্রক্রিয়া থমকে যায়। তিনি বলেন, রাজা ম্যানশন রং দিয়ে সংস্কার করেছে বলে শুনেছি। কিন্তু এভাবে হলে তো হবে না। নিয়ম মেনে সবকিছু করতে হবে। ঈদের পর পরিস্থিতি বুঝে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়া হবে বলে জানান তিনি।

ভূতাত্ত্বিকদের মতে, সারাদেশের মধ্যে ভূমিকম্পের জন্য সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা সিলেট। সাম্প্রতিক সময়ে দফায় দফায় ভূমিকম্প অনুভূত হওয়ার পর নতুন করে নগরবাসীর মধ্যে আতঙ্ক দেখা দেয়। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে সিসিকের ঘুমও ভাঙে। জুন মাসের শুরুতে অভিযান চালিয়ে রাজা ম্যানশনসহ ছয়টি মার্কেট বন্ধ করে দেওয়া হয়। ৯ জুন শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ফরিদ উদ্দিন আহমদসহ সংশ্নিষ্টদের সঙ্গে বৈঠক করেন সিসিক মেয়র আরিফুল হক চৌধুরীসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা। এই বৈঠকে শাবি কর্তৃপক্ষ নতুন করে নগরীর বহুতল ভবনগুলো পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতে সিসিককে সর্বাত্মক সহযোগিতার আশ্বাস দেয়।

'ঝুঁকিপূর্ণ' ভবনগুলো 'ঝুঁকিমুক্ত' সনদ দেখালে তা খুলে দেওয়া হবে বলে জানিয়েছিলেন সিসিক মেয়র আরিফুল হক চৌধুরী। কিন্তু কার্যত কোনো সনদ ছাড়াই সব কটি মার্কেট সচল হয়ে যায়। ৩০ জুন সংবাদ সম্মেলন করে রাজা ম্যানশনের ব্যবসায়ীরা 'ঝুঁকিপূর্ণ' ঘোষণাকে মিথ্যাচার বলে দাবি করেন। সেদিন মার্কেটের ব্যবসায়ী সমিতির আহ্বায়ক বীর মুক্তিযোদ্ধা আবদুল খালিক লিখিত বক্তব্যে বলেন, 'মার্কেটটি কোনোভাবেই ঝুঁকিপূর্ণ নয়। এজন্য ভেঙে ফেলারও প্রয়োজন নেই।' সর্বাত্মক লকডাউনের মধ্যে রাজা ম্যানশনে সাদা রঙের বদলে হলুদ ও লাল রঙের প্রলেপ লাগানো হয়। তিন দিন আগে লকডাউন শিথিল হলে পুরোদমে মার্কেট সচল হয়।

বীর মুক্তিযোদ্ধা আবদুল খালিক বলেন, ২০১৬ সালের একটি নোটিশে অনুমান করে মার্কেটটি ঝুঁকিপূর্ণ বলা হয়েছিল। সম্প্রতি ভূমিকম্পের পর বিভিন্ন জরিপ ও পরীক্ষা করে প্রকৌশলীরা জানিয়েছেন, ভবনটি রেক্টোফিটিং করে স্থায়িত্ব বাড়ানো যাবে। সয়েল টেস্টের পরীক্ষাও মার্কেটের অনুকূলে

রয়েছে। তিনি অভিযোগ করেন, সিটি করপোরেশনের মেয়রের চিঠির পরিপ্রেক্ষিতে মার্কেট ভবন সংস্কার করা হয়েছে। ১০ জুন সিটি করপোরেশনের প্রকৌশলী সরেজমিন পরিদর্শন করে রেক্টোফিটিংয়ের মাধ্যমে সংস্কার করা সম্ভব বলেও মতামত দেন। অথচ জমিদার ভবনটি সংস্কার উপযোগী নয় বলে ভেঙে ফেলতে চাচ্ছেন।

২৪ জুন রাজা ম্যানশনের মালিক পক্ষের উত্তরাধিকারী দেওয়ান শমসের রাজা চৌধুরী সংবাদ সম্মেলন করে ভবন ভেঙে ফেলা প্রয়োজন বলে উল্লেখ করেন। তিনি অভিযোগ করেন, রাজা ম্যানশন ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে। তাই ভেঙে ফেলা দরকার। কিন্তু ব্যবসায়ীরা ভাঙতে দিচ্ছেন না। তিনি বলেন, সম্প্রতি দফায় দফায় ভূমিকম্পের পর সিটি করপোরেশন মার্কেট ১০ দিনের জন্য বন্ধ করে আবার খুলে দেয়। কিসের ভিত্তিতে মার্কেট আবার খুলে দেওয়া হলো, তা তিনি বুঝতে পারেননি বলে মন্তব্য করেন। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে মার্কেটের ভাড়াটিয়াদের ভবন থেকে সরে যাওয়ার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, অন্যথায় বড় দুর্ঘটনা ঘটতে পারে।

বিষয় : রং লাগিয়ে ঝুঁকিপূর্ণ মার্কেট

মন্তব্য করুন