করোনাকালে শিক্ষার্থী ও জনসমাগম না থাকায় জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে প্রকৃতি এবং প্রাণীকুল সত্যি এক নতুন বৈশিষ্ট্য নিয়ে হাজির হয়েছে। সন্ধ্যার পর ক্যাম্পাসের নির্জন পরিবেশে ঘোরাঘুরি করলে ব্যাঙ ও পাখির কিচিরমিচির ডাক কানে আসে। নৈসর্গিক পরিবেশ আরও গাঢ় সবুজ হয়ে ধরা দেয়। রাত নামলেই ঝোঁপ-ঝাড়ের আড়াল থেকে শিয়ালের ডাকও শোনা যায়। কখনও শিয়ালরা পিচঢালা সড়কেও হাজির হয়। শুধু কী ডাক, অদ্ভুত দৃশ্য হলো শিয়াল ও কুকুরের মাঝে যেন এক ধরনের মিতালিও তৈরি হয়েছে। পাশাপাশি শিয়াল ও কুকুর অবস্থান করলেও পরস্পরের প্রতি কোনো বিদ্বেষ দেখা যায়নি। বরং মহামারি যেন তাদের মধ্যে এক ধরনের সেতুবন্ধ তৈরি করেছে।

সম্প্রতি জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে ঘুরতে গিয়ে ক্যাম্পাসের এমন অনিন্দ্যসুন্দর দৃশ্যপট চোখে পড়ল। রাত ১১টার দিকে হঠাৎ একটি মাইক্রোবাস থেকে ক্যাম্পাসের বিভিন্ন স্থানে খাবার দিতে দেখা গেল। এরপর শিয়াল ও কুকুর পরম আনন্দে চোখের সামনেই তা খাচ্ছিল। কয়েক হাত দূরেই দলবদ্ধ হয়ে শিয়ালের পাল এতটাই মগ্ন হয়ে ভাত খাচ্ছিল যেন ভয়ডর বলে কিছু নেই।

ক্যাম্পাসের সব হল, দোকানপাট বন্ধ। তাহলে কীভাবে সেখানকার কুকুর-বিড়াল বা অন্য প্রাণীর খাবার সংস্থান হয়? এই প্রশ্নে উত্তর খুঁজতে গিয়ে জানা গেল দেড় বছর ধরে করোনাকালে ক্যাম্পাসের কুকুর, বিড়াল ও শিয়ালকে নিয়মিত খাবার দিচ্ছেন শহীদ সালাম-বরকত হলের প্রাধ্যক্ষ ও মাইক্রোবায়োলজি বিভাগের শিক্ষক অধ্যাপক ড. আলী আজম তালুকদার। তিনি জানান, কুকুর ও বিড়ালের পাশাপাশি বেশ কিছু শিয়ালকে নিয়মিত খাবার দেওয়া হয়।

কভিড-১৯ অতিমারির কারণে ক্যাম্পাসের শিক্ষা ও প্রশাসনিকসহ সব কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যাওয়ায় এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণ শিক্ষার্থীরা ক্যাম্পাসে না থাকায় হলের ডাইনিং, ক্যান্টিনসহ সকল খাবারের দোকানও বন্ধ হয়ে যায়। এ সময়ে ক্যাম্পাসে বসবাসরত প্রাণীরা খাবার সংকটে পড়ে। কারণ ডাইনিং, ক্যান্টিন ও বটতলার দোকানগুলো ক্যাম্পাসের প্রাণীদের খাবারের প্রধান উৎস। এরপর ২০২০ সালের ২০ মার্চ থেকে আজ পর্যন্ত ক্যাম্পাসের ২৭টি কুকুর এবং ১১টি বিড়ালকে প্রতিদিন রাতে খাবার সরবরাহ করছেন ড. আলী আজম তালুকদার। এর পাশাপাশি শিয়ালকে নিয়মিত খাবার দেওয়া হচ্ছে।

জানা গেছে, ব্যাপক খাদ্য সংকটে থাকা এ সকল প্রাণীর খাদ্য তালিকায় গরম ভাতসহ মুরগির গিলা, কলিজা, মাথা এবং পা দিয়ে রান্না করা তরকারি থাকে। প্রতিদিন প্রায় ৫ কেজি চাল এবং এক কেজির মতো রান্না করা তরকারি থাকে। এ সব প্রাণীর জন্য প্রতিদিন ভাত রান্না করা হয়। একসঙ্গে ১০-১৫ কেজি মাংসের তরকারি রান্না করে ঠান্ডা করা হয়। এরপর এক কেজির সমপরিমাণ তরকারি আলাদা আলাদা পলিথিনে তুলে ডিপ-ফ্রিজে রেখে দেওয়া হয়। প্রতিদিন খাবার রান্নার সময় ভাত তৈরি হওয়ার আগ মুহূর্তে ডিপ ফ্রিজ থেকে এক কেজি মাংসের তরকারি বের করে স্বাভাবিক তাপমাত্রায় নিয়ে এসে ভাতের পাতিলের ভেতর সংমিশ্রণ করা হয়। এভাবে রান্না শেষে খাবার ঠান্ডা করে এ সব প্রাণীকে সরবরাহ

করা হয়। প্রতি রাতে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রায় ৪-৫ কিলোমিটারের মধ্যে অবস্থানরত কুকুর, বিড়াল ও শিয়ালকে খাদ্য সরবরাহ করা হয়। এজন্য কেবল খাদ্য ক্রয় বাবদ ১২ থেকে ১৫ হাজার টাকা প্রতি মাসে খরচ হচ্ছে।

ড. আলী আজম তালুকদার আরও বলেন. অসহায় ও অভুক্ত এসব প্রাণীর প্রতি মমতা ও ভালোবাসা থেকেই কাজটি করছি। বিশ্ববিদ্যালয় পূর্ণাঙ্গভাবে চালু না হওয়া পর্যন্ত খাদ্য সরবরাহ কাজটি চালিয়ে যাব। যে কর্মচারী-কর্মকর্তারা এই কাজে সাহায্য করছেন তাদের মধ্যে শহীদ সালাম-বরকত হলের রাঁধুনি ও গার্ড, মাইক্রোবায়োলজি বিভাগের পিওন, পরিবহন অফিসের দুইজন গাড়িচালকের ভূমিকা অনস্বীকার্য। এ কাজে সার্বিক উৎসাহ দিচ্ছেন উপাচার্য অধ্যাপক ড. ফারজানা ইসলামও।

বিষয় : শিয়াল-কুকুর

মন্তব্য করুন