এবারও কোরবানির পশুর চামড়ার বাজারে ব্যাপক ধস নেমেছে। ক্রেতা না পেয়ে বেশিরভাগ কোরবানিদাতা চামড়া মাটিতে পুঁতে ফেলেছেন, আবর্জনা হিসেবে ফেলে দিয়েছেন ভাগাড়ে। কেউবা আবার দান করে দিয়েছেন এতিমখানা ও মাদ্রাসায়। দাম নিয়ে হতাশ মৌসুমি ব্যবসায়ীরাও। গ্রামাঞ্চলে থেকে চামড়া কিনে শহরে নিয়ে পানির দরে বেচতে হচ্ছে তাদের। কারণ আড়তদাররা অর্ধেক দামেও চামড়া কিনছেন না। ব্যবসায়ীরা বলছেন, এতে তাদের রিকশা ভাড়াই উঠছে না।

জানা গেছে, কদর না থাকায় এ বছর সরকার নির্ধারিত দামের চেয়েও কমে বিক্রি হয়েছে কোরবানির পশুর চমড়া। স্থানীয়ভাবে বড় গরুর চামড়া বিক্রি হয়েছে ৩০০ থেকে ৫০০ টাকায়। ছাগলের চামড়ার দাম ছিল ১০ থেকে ২০ টাকা। অবস্থা এমন দাঁড়ায় যে, চামড়া ছুঁয়েও দেখিনি কেউ। ব্যুরো, অফিস, নিজস্ব প্রতিবেদক ও প্রতিনিধিদের পাঠানো খবরে বিস্তারিত :

বগুড়া :শহরের নারুলী এলাকার বাসিন্দা মনোয়ারুল ইসলাম ৮৭ হাজার টাকায় কেনা গরুর চামড়া বেচতে না পেরে স্থানীয় মাদ্রাসায় দান করে দিয়েছেন। ওই মাদ্রাসার প্রধান মাওলানা আব্দুর রব জানান, দানে পাওয়া ২৩টি গরু ও ২৭টি ছাগলের চামড়া নিয়ে শহরের বাদুড়তলা এলাকায় বিক্রি করতে গিয়ে বড় সাইজের গরুর সাতটি চামড়া ৩৩০০ টাকায় বিক্রি করছেন এবং ছাগলের বড় সাইজের ১১টি চামড়া বিক্রি করেছেন ৭০০ টাকায়। ক্রেতা না পাওয়ায় বাকি চামড়া সেখানে ড্রেনের পাশে ফেলে দেন। গরুর চামড়া ১৫০ টাকা এবং ছাগলের চামড়া ৩০ টাকা দাম বলায় সদরের সাবগ্রাম এলাকার আব্দুল হামিদও আবর্জনা হিসেবে সেগুলো ফেলে দিয়েছেন।

মহাস্থান এলাকার চামড়ার খুচরা ব্যবসায়ী জামাল হোসেন বলেন, তিনি বড়, মাঝারি ও ছোট সাইজের ২১৪টি গরুর চামড়া কেনেন। আর ছাগলের কেনেন ৪৫টি। গরুর চামড়া গড়ে কিনতে হয়েছে ৩০০ টাকা দরে। ছাগলের গড়ে ৩০ টাকা দরে। বিক্রি করতে গিয়ে পাইকারি ব্যবসায়ীরা বড় সাইজের চামড়াগুলো গড়ে ৬০০ টাকা দরে নেন। ছাগলেরগুলো গড়ে ৩৫ টাকা দরে ২২টি নেন। অবশিষ্ট চামড়া বিক্রি করতে না পারায় ফেলে দিতে বাধ্য হন। এতে তার প্রায় ৫৫ হাজার টাকা লোকসান হয়েছে।

এদিকে, চামড়ার দামে ধস নামায় এবং প্রসেসিং খরচ না ওঠায় বগুড়ায় অনেক চামড়া আবর্জনা হিসেবে ফেলে দেওয়া হয়েছে। এসব চামড়া পরিচ্ছন্নতাকর্মীরা গাড়িতে তুলে নিয়ে স্তূপাকারে ফেলেন ময়লার ভাগাড়ে। বগুড়া পৌরসভার পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের দাবি, তারা শহরের বিভিন্ন এলাকায় ফেলে দেওয়া প্রায় ১৫ হাজার চামড়া বর্জ্য হিসেবে ভাগাড়ে ফেলেছেন।

রংপুর :চামড়া কেনাবেচার অন্যতম বাজার রংপুর নগরীর শাপলা চত্বরে এবার প্রাণচাঞ্চল্য ছিল না। চামড়া ন্যায্য দামে কিনতে ও বিক্রি করতে না পারার অভিযোগ তুলেছেন ক্রেতা ও বিক্রেতা উভয়েই।

সরেজমিন দেখা গেছে, এ বছর চামড়া কিনেছেন মাত্র তিন থেকে চারজন ব্যবসায়ী এবং ১০ থেকে ১২ জন ফড়িয়া। ট্যানারি মালিকদের কাছ থেকে বকেয়া টাকা তুলতে ব্যর্থ হয়ে অনেকে চামড়ার ব্যবসা ধরে রাখতে পারেননি। রংপুরে এবার ব্যবসায়ীরা চামড়া কিনেছেন পানির দরে। মৌসুমি ব্যবসায়ীরা একেকটি ছাগলের চামড়া ১০ থেকে ৫০ টাকায়, গরুর চামড়া ২০০ টাকা থেকে সর্বোচ্চ ৬০০ টাকায় এবং ভেড়ার চামড়া ৫-১০ টাকায় কিনছেন। মনিরুজ্জামান নামে একজন জানান, ৯০ হাজার টাকায় কেনা গরুর চামড়া বিক্রি করেছেন মাত্র ৫০০ টাকায়। আর ছাগলের চামড়ার কেউ দামই করছে না। তাই ছাগলের চামড়া তিনি বিনামূল্যে দিয়েছেন। রংপুর জেলা চামড়া ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি আব্দুল লতিফ খান বলেন, চামড়ার আমদানি কম হওয়ার অন্যতম কারণ ট্যানারি মালিকদের সিন্ডিকেট।

রাজশাহী :রাজশাহীতে সরকার নির্ধারিত দামের চেয়েও কম দামে বিক্রি হয়েছে কোরবানির পশুর চামড়া। তবে এ দামেও অনেকে চামড়া বিক্রি করতে পারেননি। কোরবানিদাতাদের অভিযোগ, আড়তদারদের সিন্ডিকেট দাম কমিয়ে রেখেছে। তারা জোটবদ্ধ হয়েছে অল্প দামে চামড়া কিনছেন। তবে আড়তদাররা বলছেন, ট্যানারি মালিকদের কারণেই চামড়ার দাম এত নিম্নমুখী।

রাজশাহী চামড়া ব্যবসায়ী গ্রুপের সভাপতি আসাদুজ্জামান বলেন, সরকার নির্ধারিত দামেই চামড়া কেনা হয়েছে। আমরা গরুর চামড়া ৬০০ থেকে ৯০০ টাকায় কিনেছি। খাসির চামড়া ৫০ থেকে ৬০ টাকায় কিনেছি।

জয়পুরহাট :কম দামেও বিক্রি করতে না পেরে জয়পুরহাটে অনেকেই চামড়া মাটিতে পুঁতে ফেলেছেন। এবারও গত বছরের চেয়ে অনেক কম দামে চামড়া বিক্রি করতে হয়েছে মৌসুমি ব্যবসায়ী ও কোরবানিদাতাদের। এবার জেলার বিভিন্ন স্থানে প্রতিটি ছাগলের চামড়া বিক্রি হয়েছে আকারভেদে মাত্র ১০ থেকে ১৫ টাকায়। গরুর চামড়া বিক্রি হয়েছে আকারভেদে ১০০ থেকে ২০০ টাকায়। চামড়ার বাজার ধসের কারণে লোকসানের শিকার মৌসুমি ব্যবসায়ীরা।

রাজবাড়ী :গ্রামাঞ্চল থেকে চামড়া কিনে রিকশা-ভ্যানে বয়ে রাজবাড়ী শহরে নিয়ে আসা মানুষরা অনেকটা হতাশা নিয়েই ফিরে গেছেন বাড়ি। এ চিত্র দেখা গেছে ঈদের দিন বিকেলে। গরুর চামড়া প্রতিটি দেড় থেকে ২০০ টাকা আর খাসির চামড়া ২০ থেকে ৫০ টাকা দরে বিক্রি হয়েছে। একই অবস্থা ছিল বালিয়াকান্দিতেও। মৌসুমি চামড়া ব্যবসায়ী আতিয়ার রহমান জানান, গ্রাম থেকে চামড়া সংগ্রহ করে শহরে নিয়ে যে দামে বেচতে হচ্ছে তাতে রিকশা ভাড়াই উঠছে না।

ব্রাহ্মণবাড়িয়া :জেলায় চামড়া কিনে বিপাকে মৌসুমি ব্যবসায়ীরা। তারা বাড়ি বাড়ি ঘুরে চামড়া কিনে পাইকারি ব্যবসায়ীদের কাছে কম মূল্যে বিক্রি করতে বাধ্য হয়েছেন। এতে তাদের মোটা অঙ্কের টাকা লোকসান গুনতে হয়েছে। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, মৌসুমি ব্যবসায়ীরা একটি বড় গরুর চামড়া সর্বোচ্চ ৪০০ টাকা এবং মাঝারি গরুর চামড়া ২০০-২৫০ টাকায় কিনেছেন। কিন্তু পাইকারদের কাছে যে দামে বিক্রি করেছেন, তাতে লাভ হয়নি।

এ ছাড়া পাবনা, গাইবান্ধার সাদুল্যাপুর, সিলেটের ওসমানীনগর এবং লক্ষ্মীপুরে চামড়ার বাজারের চিত্র ছিল একই।

কুমিল্লায় কোরবানির পশুর চামড়া সংরক্ষণের জন্য জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে জেলায় পাঁচ টন লবণ বিতরণ করা হয়েছে। ঈদের পরের দিন নগরীতে সিটি মেয়র মনিরুল হক সাক্কু ও জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ কামরুল হাসান চামড়া সংরক্ষণ পদ্ধতি পরিদর্শন করেন।

মন্তব্য করুন