কোরবানির ঈদের পর প্রথম চামড়ার হাট জমল না যশোরের রাজারহাটে। লকডাউন আর বৃষ্টিতে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সর্ববৃহৎ এ মোকামে শনিবার চামড়ার জোগান ছিল কম, দাম নিয়েও অসন্তুষ্টি ক্রেতা-বিক্রেতার। গরুর চামড়া বিক্রি হয়েছে সরকার নির্ধারিত দরের চেয়ে অনেক কমে। লকডাউনে আসেননি দূরবর্তী জেলার কাঙ্ক্ষিত সংখ্যক ব্যাপারিও। দুর্ভোগ ঠেলে যারা এসেছেন বৃষ্টিতে, তারা পড়েছেন দুর্গতিতে। যশোরের জেলা বিপণন কর্মকর্তা সুজাত হোসেন খান বলেন, স্বাস্থ্যবিধি মেনে সুষ্ঠুভাবে চলছে এ হাটে বেচাকেনা। দামও গতবারের চেয়ে বেশি। লকডাউনে চামড়া পরিবহন নির্বিঘ্ন করতে সব ধরনের ব্যবস্থা করেছেন তারা।

সাতক্ষীরার কলারোয়া উপজেলার ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী জিন্নাত আলী শনিবার যশোরের রাজরহাট চামড়া মোকামে একশ পিস গরু ও ২৫০ পিস ছাগলের চামড়া নিয়ে এসেছিলেন। বাড়ি বাড়ি গিয়ে চামড়া সংগ্রহ করা, লবণ লাগানো এবং পরিবহন খরচ মিলিয়ে যে চামড়ার দাম প্রতি পিস ৮০০ টাকার উপরে পড়েছে, এ হাটে সেই চামড়া প্রায় একই দামে বিক্রি করতে বাধ্য হয়েছেন তিনি।

একই উপজেলার কাজীরহাটের ব্যবসায়ী মন্টু লাল মণ্ডল বলেন, লকডাউনের মধ্যে ঝুঁকি নিয়ে অতিরিক্ত অর্থ ব্যয়ে হাটে এসেছেন। কিন্তু হাটে খরিদ্দার কম, তাই ন্যায্য দাম মিলছে না। উপরন্তু বৃষ্টি ভিজে চামড়া পচে যাওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। বাধ্য হয়ে যে দাম পাচ্ছেন, তাতেই বিক্রি করতে হচ্ছে।

নড়াইল জেলার লোহাগড়া এলাকার ব্যবসায়ী সরনাল বিশ্বাস জানান, তিনি ৬০০ পিস গরুর চামড়া এনেছেন। বড় চামড়া বিক্রি করেছেন ৮০০ টাকায়, আর ছোট চামড়া ৪০০-৫০০ টাকা দরে। এতে তার কোনোরকম পুঁজি বেঁচেছে। আলাপকালে একই রকম তথ্য জানালেন গোপালগঞ্জের কাশিয়ানী উপজেলার চামড়া ব্যবসায়ী গোপাল চন্দ্র দাসও।

দাম নিয়ে উল্টো সুর ব্যাপারি ও ট্যানারি মালিকদের কথায়। সুপার ট্যানারির ক্রয় কর্মকর্তা আসাদুজ্জামান বলেন, গত বছর যে চামড়া ৬০০-৭০০ টাকায় বিক্রি হয়েছে, এবার এ হাটে সেই চামড়ার দাম হাঁকছে হাজার টাকার ওপরে। ফলে এখান থেকে চামড়া কিনে লাভের আশা কম। তাই আগামী হাটের জন্য অপেক্ষা করা ছাড়া উপায় দেখছেন না।

এদিকে, ট্যানারি মালিকরা বকেয়া পরিশোধ না করায় পুঁজি সংকটে পড়েছেন এ অঞ্চলের আড়তদার ও ব্যবসায়ীরা। যশোর শহরের বেজপাড়ার ব্যবসায়ী শেফার্ড আহমেদ অভিযোগ করেন, ট্যানারি মালিকরা বছরের পর বছর তাদের টাকা পরিশোধ না করায় তারা নগদ টাকার সংকটে রয়েছেন। যে কারণে পর্যাপ্ত চামড়া কিনতে পারছেন না। তা ছাড়া লকডাউন ও বৈরী আবহাওয়ার কারণেও হাট জমেনি।

যশোর জেলা চামড়া ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক আলাউদ্দিন মুকুল জানান, ট্যানারি মালিকদের কাছে রাজারহাট ব্যবসায়ীদের ২০ কোটি টাকার ওপরে পাওনা রয়েছে। মূলত নগদ টাকার সংকট এবং বৈরী আবহাওয়ার কারণে রাজারহাটে চামড়ার হাট তেমন জমেনি। তারপরও নগদ টাকায় প্রায় চার কোটি টাকার বেচাকেনা হয়েছে।

হাটের ইজারাদার হাসানুজ্জামান হাসু জানান, তিন-চার বছর আগেও রাজারহাটে কোরবানি ঈদের হাটে অন্তত লাখ পিস গরু ও ৫০ হাজার পিস ছাগলের চামড়া আসত। এখন আসছে ২৫ থেকে ৩০ হাজার পিস গরু ও ২৫ হাজারের মতো ছাগলের চামড়া। বাইরের ব্যবসায়ীরা না আসায় এবং স্থানীয় ব্যবসায়ীরা পুঁজি সংকটের কারণে হাট তেমন জমেনি।

রাজারহাট মোকামে ছোট-বড় মিলিয়ে তিন শতাধিক আড়ত রয়েছে। প্রায় ২০ হাজার ব্যবসায়ী এর ওপর নির্ভরশীল। এখানে খুলনা বিভাগের ১০ জেলা ছাড়াও ফরিদপুর, রাজশাহী, পাবনা, নাটোর এবং ঢাকার বড় বড় ব্যবসায়ীরা চামড়া বেচাকেনা করেন।

মন্তব্য করুন