ময়মনসিংহে পশুর চামড়ার হাটে ক্রেতা না থাকায় হতাশ ব্যবসায়ীরা। হাটে ক্রেতা না আসায় লোকসানের মুখে পড়তে যাচ্ছেন তারা। দাম না পাওয়ায় হাট থেকে ইতোমধ্যে প্রায় এক লাখ ছাগলের চামড়া ফেলে দেওয়া হয়েছে। আর চামড়া বিক্রি হলেও সরকার নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে অনেক কম দাম পাচ্ছেন ফড়িয়া ব্যবসায়ীরা।

ময়মনসিংহ অঞ্চলের ঐতিহ্যবাহী চামড়ার হাট শম্ভুগঞ্জ চামড়া বাজার। ১৯৮৭ সালে শুরু হয় এ হাটের কার্যক্রম। দীর্ঘদিনের পুরোনো চামড়ার হাটটিতে এবারের মতো ধস ও ক্রেতাশূন্য অবস্থা দেখেননি স্থানীয়রা। হাটে আসা দূর-দূরান্তের ফড়িয়া ব্যবসায়ীরা পড়েছেন চরম বিপাকে। এ বছর সরকার কোরবানির পশুর লবণযুক্ত গরুর চামড়ার দাম প্রতি বর্গফুট ৩৩ থেকে ৩৭ টাকা নির্ধারণ করে দেয়। গত বছর যা ছিল ২৮ থেকে ৩২ টাকা। এ ছাড়া খাসির চামড়ার দাম নির্ধারণ করা হয় প্রতি বর্গফুট ১৫ থেকে ১৭ টাকা। গত বছর যা ছিল ১৩ থেকে ১৫ টাকা। পাশাপাশি প্রতি বর্গফুট বকরির চামড়ার দাম নির্ধারণ করা হয় ১২ থেকে ১৪ টাকা। গত বছর যা ছিল ১০ থেকে ১২ টাকা। কিন্তু সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে অনেক কম মূল্যে চামড়া বিক্রি করতে হচ্ছে ফড়িয়া ব্যবসায়ীদের।

শম্ভুগঞ্জ চামড়া বাজারে মঙ্গলবার দুপুরে দিয়ে দেখা যায় ক্রেতাশূন্য। সকাল থেকে ক্রেতার অপেক্ষায় থাকা ব্যবসায়ীরা দীর্ঘশ্বাস ফেলে গুছিয়ে রাখছেন চামড়া। প্রতি বছর এই হাটে ১০ থেকে ১৫টি ট্যানারি মালিক বা প্রতিনিধি এলেও এ বছর ক্রেতা নেই। হাটবারে এখান থেকে প্রায় এক লাখ পশুর চমড়া বিক্রি হলেও এবার খরা দেখা দিয়েছে। গত শনিবার দু'জন টেনারি মালিক শুধু তিন হাজার গরুর চামড়া কিনেছেন। ১৫০ টাকা খরচ পড়া ছাগলের চামড়া ৩০ টাকা দাম বলায় অন্তত এক লাখ চামড়া হাট কর্তৃপক্ষ সিটি করপোরেশনের ময়লা ফেলার স্তূপে ফেলেছে।

সুনামগঞ্জ থেকে আড়াইশ গরুর চামড়া সংগ্রহ করে ভালো দামের আশায় শম্ভুগঞ্জের হাটে এসেছেন রাকাব উদ্দিন। চামড়া ব্যবসার সঙ্গে তিনি আছেন অন্তত ২৪ বছর। ছেলে রাজু মিয়াকেও ব্যবসায় সঙ্গী করেছেন। ক্রয় এবং প্রক্রিয়াজাত করতে দেড় লাখ টাকা খরচে হাটে চামড়া আনার পর দেখেন ক্রেতা নেই। ক্রেতা না এলে পুরো বিনিয়োগ গচ্চা যাবে তার। হতাশা জানিয়ে রাকাব বলেন, সরকার যে দাম নির্ধারণ করে দিয়েছে, সেই দাম বলেন না পাইকাররা। পাইকারদের দামে প্রতিফুট চামড়া আট টাকা পড়ে। গত চার বছর ধরেই চামড়ার ব্যবসা করে ক্ষতির মুখে পড়লেও এবার বেশি ক্ষতি হবে এমন শঙ্কা তার।

চামড়ার হাটে দাঁড়িয়ে কথা হয় শ্যামগঞ্জের রঞ্জিত রবি দাসের সঙ্গে। অন্তত ২৫ বছর ধরে চামড়ার ব্যবসার সঙ্গে জড়িত তিনি। মৌসুমি ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে এক হাজার ৬০০ চামড়া কিনেছেন তিনি। তবে এবারের মতো মন্দহাট এর আগে দেখেননি। তিনি বলেন, খাসির চামড়ার ক্রেতা নেই, ফেলে দেওয়া হচ্ছে। সরকার ফুট হিসাবে দাম নির্ধারণ করে দিলেও চামড়ার মান দেখে বিক্রি হয়, ফুট হিসাবে বিক্রি হয় না।

হাটের ব্যবসায়ী আবদুর রাজ্জাক বলেন, আগে ট্যানারি বেশি ছিল, দাম ভালো পাওয়া যেত। এখন ট্যানারি কমে যাওয়ায় সিন্ডিকেট করাসহ নানা কারণে ক্ষতির মুখে পড়তে হয় তাদের মতো ছোট ব্যবসায়ীদের।

সিটি করপোরেশনের চামড়ার হাটটি দেখভাল করেন আসলাম হোসেন। তিনি বলেন, এবার হাটে ঢাকার কোনো মহাজন নেই, কোনো পাইকার নেই। প্রতি হাটে এক লাখ চামড়া বিক্রি হওয়ার কথা থাকলেও গত শনিবার মাত্র তিন হাজার চামড়া বিক্রি হয়েছে। ট্যানারি মালিকরা চামড়া না কিনলে চামড়া পচবে। তারা ট্যানারি কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করলে তাদের জানানো হয়েছে, সরকার ঋণ দেয়নি। সে কারণে চামড়া কিনছেন না।

ময়মনসিংহ চেম্বার অব কমার্সের সহসভাপতি শংকর সাহা বলেন, ট্যানারি সমিতির সঙ্গে যোগাযোগ করে চামড়াগুলো কেনার জন্য অনুরোধ করা হয়েছে। ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের হাত থেকে রক্ষায় সরকারিভাবে হস্তক্ষেপ প্রয়োজনে। এ ছাড়া আগামী বছর থেকে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদেরও যেন ঋণ দেওয়া হয়, সে আহ্বান জানান তিনি।

মন্তব্য করুন