ধানমন্ডির সাত মসজিদ সড়কে মঙ্গলবার বিকেলে সাইকেল নিয়ে অপেক্ষায় থাকতে দেখা যায় জনা বিশেক যুবককে। কারও গায়ে হলুদ, কারও গোলাপি পোলো-শার্ট। করোনাকালে এমন পোশাক পরিহিত তরুণদের দিনভর রাজধানীর রাস্তায় ছুটতে দেখা যায়। 'ভেলিভারি বয়' নামে পরিচিতি পাওয়া এই রাইডাররা ঘরে ঘরে পণ্য পৌঁছে দেন। যাদের অধিকাংশ আগে অন্য পেশায় ছিলেন। মহামারিতে কাজ হারিয়ে পেট চালাতে ডেলিভারি বয় হয়েছেন।

কামরাঙ্গীরচরের ১৮ বছর বয়সী মো. শিহাব হোসেন সুলতান পড়াশোনা করেছেন ক্লাস ফাইভ পর্যন্ত। তারপর কাজ নেন নিউমার্কেটের চাঁদনীচকে পোশাকের দোকানে। সপ্তাহে ছয় দিন সকাল ১০টা থেকে টানা ১২ ঘণ্টা কাজ করে মাসে পাঁচ হাজার টাকা পেতেন। সঙ্গে যাতায়াত খরচ, মাঝেমধ্যে নাশতার জন্য বকশিশ পেতেন। উপরি ছিল মালিকের বকাঝকা! গত বছরের মার্চে করোনা সংক্রমণ রোধের লকডাউন শুরুর পর মার্কেট, বিপণিবিতান বন্ধ হয়ে যায়। কাজ হারান শিহাব। মাসখানেক বেকার থাকার পর 'ফুড পান্ডা'য় রাইডারের কাজ শুরু করেন। মঙ্গলবার বিকেলে জিগাতলায় খাবার পৌঁছে দিতে এসেছিলেন। সেখানে কথা হয় শিহাবের সঙ্গে। গত ১৫ মাসের অভিজ্ঞতা জানাতে গিয়ে শিহাব বললেন, ধানমন্ডি, লালবাগ, হাজারীবাগ, কামরাঙ্গীরচর এলাকায় তিনি খাবার ডেলিভারি দিয়ে থাকেন। ডেলিভারিপ্রতি ৪৫ থেকে ৬০ টাকা পান। অর্ডার ভালো থাকলে দৈনিক গড়ে ১৫ থেকে ২০টি ডেলিভারি দিতে পারেন। গত ২৬ জুলাই দিয়েছেন ১৬টি ডেলিভারি। সপ্তাহে তিন থেকে সাড়ে তিন হাজার টাকা আয় হয়।

শিহাব বললেন, করোনায় চাকরি হারিয়েছেন। আবার করোনাই তার রোজগারের ব্যবস্থা করে দিয়েছে। লকডাউন ও সংক্রমণের শঙ্কায় লোকজন ঘর থেকে কম বেরোচ্ছেন। অনলাইনে খাবার পণ্য কিনছেন বেশি বেশি। তা ঘরে পৌঁছে দিয়ে রুটি-রুজি হচ্ছে ডেলিভারি বয়দের।

মিরপুরের আরেক তরুণ তানজিম খান কাজ করেন 'গো ডেলিভারি' নামের প্রতিষ্ঠানে। তার গল্পও অভিন্ন। করোনার আগে স্থানীয় একটা গার্মেন্টে হিসাবরক্ষণ বিভাগে কাজ করতেন। লকডাউনে প্রতিষ্ঠানটি বন্ধ হলে কাঁধে পণ্যের থলে তুলে নেন রোজগারের জন্য। যা আয় হয় তাতে নিজের খরচ মিটিয়ে সংসারে সহায়তা করতে পারেন। কথা হলো 'গো ডেলিভারি'র মহাব্যবস্থাপক মো. নাসির শেখ নেহালের সঙ্গে। গত বছর জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ব্যবসা শিক্ষায় স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করা এই তরুণও নতুন উদ্যোক্তা। লকডাউন শুরুর পর নাসির তার দুই বন্ধুর সঙ্গে মিলে 'গো ডেলিভারি' প্রতিষ্ঠা করেন। তিনি জানালেন, তাদের নিজস্ব পণ্য নেই। উৎপাদক ও বিক্রেতারা অনলাইনে যে পণ্য বিক্রি করেন, তা পৌঁছে দেন ক্রেতার ঘরে। নাসির জানালেন, করোনা শুরুর পর চাকরির নিয়োগ না থাকায় নিজেরাই উদ্যোক্তা হয়েছেন। ১০ থেকে ১২ জন ডেলিভারিম্যান দিয়ে শুধু ঢাকার মধ্যে পণ্য পৌঁছে দেন। ডেলিভারিম্যানদের মাসে ১০ থেকে ১২ হাজার টাকা করে দিয়ে আয়ের যে বাকি অংশ থাকে তা দিয়ে নিজেদের কোনো মতে চলে যায়। দিনে দিনে অনলাইন ব্যবসা সম্প্রসারণ হওয়ায় আশা করছেন, আগামী দিনে প্রত্যাশিত মুনাফা করতে পারবেন। নাসির জানালেন, হাতেগোনা আট-দশটি প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব উৎপাদিত বা কেনা পণ্য ক্রেতার হাতে পৌঁছে দেন নিজের ডেলিভারিম্যানের মাধ্যমে। বাকিরা 'গো ডেলিভারি'র মতো। অন্যের পণ্য পৌঁছে দেয়। এমন প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা শুধু ঢাকায় কয়েকশ। তাতে অন্তত ১০ থেকে ১২ হাজার মানুষের কর্মসংস্থান হয়েছে করোনাকালে। এমন আছে- একজন নারী যার পরিচয় ছিল শুধু গৃহিণী। তিনি এখন ঘরে খাবার বা হাতে তৈরি পণ্য উৎপাদন করছেন। তার পক্ষে ক্রেতার কাছে তা পৌঁছে দেওয়া সম্ভব নয়। এ কাজটি করছেন রাইডাররা। এমন ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা সারাদেশে লাখখানেক হতে পারে।

ই-কমার্সের বড় প্রতিষ্ঠানগুলোর একটি 'দারাজ'। প্রতিষ্ঠানটির একটি সেবা 'হাংরি নাকি'। এর কর্মী মো. কাওসার ও মো. শফিউল জানালেন, মাসে আট হাজার টাকা বেতন পান। প্রতি মাসে ১০০ ডেলিভারির জন্য ৪৫ টাকা করে পান। এর বেশি ডেলিভারি দিতে পারলে ৫৫ টাকা করে পান। দারাজের জিগাতলা কার্যালয়ে কথা হয় শাখা অফিসের ম্যানেজার মো. আল আমিনের সঙ্গে। তিনি জানালেন, এই অফিস থেকে খাবার বাদে অন্যান্য পণ্য হাজারীবাগ, ধানমন্ডির একাংশে ডেলিভারি করা হয়। ২৬ জন রাইডার এ কাজ করেন। আগের তুলনায় করোনাকালে অর্ডার ও কর্মী সংখ্যা দুই-ই বেড়েছে।

গত ৫ জুলাই প্রকাশিত গবেষণা প্রতিবেদনে সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) জানিয়েছে, করোনা মহামারিকালে দেশে ই-কমার্স খাতে এক লাখ কর্মসংস্থান হয়েছে। আগামী এক বছরে নতুন করে আরও পাঁচ লাখ কর্মসংস্থান হবে। ইন্টারনেট সহজলভ্য হওয়ায় ডিজিটাল অর্থনীতির বিকাশ হচ্ছে। দেশে এখন ক্রিয়েটিভ ও মাল্টিমিডিয়ার সঙ্গে সম্পৃক্ত রয়েছেন ১৯ হাজার ৫৫২ জন। ফেসবুককেন্দ্রিক উদ্যোক্তা ৫০ হাজার। অনলাইন ব্যবসায়ীদের সংগঠন ই-কমার্স অব অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ই-ক্যাব) সদস্য এক হাজার ৩০০ জন। দারাজ বাংলাদেশের জনসংযোগ বিভাগের প্রধান সায়ন্তনী তিশা বলেছেন, প্রতিবছরই তাদের ব্যবসা দ্বিগুণ হচ্ছে।

ই-ক্যাব সাধারণ সম্পাদক ওয়াহেদ তমাল বলেন, করোনাকালে ক্রেতারা অনলাইন কেনাকাটায় অভ্যস্ত হয়েছেন। এতে নতুন উদ্যোক্তারাও তৈরি হচ্ছেন। সারাদেশে সব প্ল্যাটফর্ম মিলিয়ে অনলাইন মার্কেটপ্লেসে ছয় থেকে সাত লাখ মানুষ কাজ করেছেন। ২০২০ সালে প্রায় ১৬ হাজার কোটি টাকা কেনাবেচা হয়েছে অনলাইনে। এ বছর তা আরও বাড়বে।

মন্তব্য করুন