চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগারে বন্দি থাকলেও দাদাগিরি থামছে না স্বঘোষিত 'প্রভাবশালী' রকি বড়ূয়ার। অবৈধ সুযোগ-সুবিধা না পেয়ে কারা কর্মকর্তাদের দেখে নেওয়ার হুমকি দিয়েছেন তিনি। কারাগারের সেলে বন্দি থাকলেও চরিত্র বদলায়নি তার। অস্ত্রসহ গ্রেপ্তারের পর পুলিশ হেফাজতে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন থাকা অবস্থায় প্রতিবেশী একটি দেশের রাষ্ট্রদূতকে ফোন করে চরম বিতর্কে জড়িয়ে পড়েন তিনি। পুলিশ হেফাজতে থেকে কীভাবে বিদেশি রাষ্ট্রদূতকে ফোন করেছেন, সেই ঘটনায় জল গড়িয়েছে বহুদূর।

এর আগে যুদ্ধাপরাধী দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর ছেলের সঙ্গে গোপনে বৈঠক করে আলোচনায় আসেন অর্থ আত্মসাৎ, প্রতারণা ও জালিয়াতিতে অভিযুক্ত রকি বড়ূয়া। তিনি যেখানেই যাচ্ছেন সেখানেই সৃষ্টি করছেন বিতর্ক। গোয়েন্দা রিপোর্ট খারাপ থাকায় কারাগারে তার ঠিকানা হয়েছে দুর্ধর্ষ বন্দিদের সেলে।

চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগারের সিনিয়র জেল সুপার শফিকুল ইসলাম খান বলেন, একাধিক মামলার আসামি রকি বড়ূয়া কারাবিধি অনুযায়ী যেসব সুযোগ-সুবিধা পাওয়ার

কথা সব দেওয়া হচ্ছে। অন্য বন্দিরা যে সুযোগ পান তিনিও তা পান। কারাবিধির বাইরে গিয়ে তিনি ফোনে কথা বলাসহ কিছু সুযোগ চাইছেন। তা আমরা দিতে পারছি না। তিনি নিজেকে অনেক প্রভাবশালী হিসেবে আমাদের কাছে উপস্থাপন করার চেষ্টাও করেছেন। তবে আমরা আইনের মধ্যে থেকেই দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছি।

চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগারের জুনিয়র এক কর্মকর্তা জানান, কারাগারে আসার পর পায়ে ফ্র্যাকচার (জখম) থাকায় কিছুদিন কারা হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছেন। এখন তিনি সুস্থ। সেলে যাওয়ার পর থেকেই মাঝে মধ্যে তিনি অবৈধ সুযোগ-সুবিধা চেয়ে আবদার করে বসছেন। তাকে অবৈধ সুযোগ না দেওয়ায় সেলের দায়িত্বপ্রাপ্ত কারারক্ষী, প্রধান কারারক্ষী, সহকারী প্রধান কারারক্ষীদের সঙ্গে প্রায়ই দুর্ব্যবহার করেন। অবৈধ সুযোগ না দেওয়ায় কর্মকর্তাদের দেখে নেওয়ার হুমকিও দিয়েছেন তিনি। একটি প্রতিবেশী দেশের সরকারের শীর্ষ ব্যক্তিদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার দাবি করে অবৈধ সুযোগ-সুবিধা আদায়ের চেষ্টা করছেন এ আসামি।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, তিনি কারাগারে যাওয়ার পর প্রথমে তার সেবা করার জন্য পছন্দের একজন কারাবন্দিকে সেখানে নেওয়ার চেষ্টা করেন। কারা কর্মকর্তাদের বাধায় তা ব্যর্থ হয়। তিনি চাহিদার তুলনায় ব্যবহারের জন্য নিজের ইচ্ছামতো পানি চাইতে থাকেন। বরাদ্দ করা খাবার দ্বিগুণ করার দাবি করেন। কারাগারের ভেতর অবাধে ঘোরাফেরার সুযোগ চান। সেলে থাকার পরও ফোনে কারাগারের বাইরে নিজের পছন্দের মানুষের সঙ্গে কথা বলার আবদার করেন। কিন্তু কারা কর্তৃপক্ষ কারাবিধির বাইরে গিয়ে তার কোনো আবদারই না মানায় তিনি বেশ ক্ষুব্ধ হন। সর্বশেষ ঈদের আগে মোবাইল ফোনে বিধিবহির্ভূতভাবে কথা বলার আবদার রক্ষা না করায় কারারক্ষীদের সঙ্গে অশোভন আচরণ করেন।

চট্টগ্রামের সাতকানিয়ার বাসিন্দা রকি বড়ুয়া অস্ত্র, সন্ত্রাসবিরোধী আইন, বিশেষ ক্ষমতা আইন, চাঁদাবাজি ও দ বিধির বিভিন্ন ধারায় পাঁচটি মামলার আসামি। তার বিরুদ্ধে নগরীর পাঁচলাইশ থানায় চারটি এবং সাতকানিয়া থানায় একটি মামলা রয়েছে। তার বিরুদ্ধে সরকারি বিভিন্ন কর্মকর্তা ও রাজনৈতিক শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে ছবি তুলে মনোনয়ন পাইয়ে দেওয়ার প্রলোভন দেখানো, বেকার যুবকদের চাকরি দেওয়ার নাম করে খালি স্ট্যাম্পে স্বাক্ষরসহ বিভিন্ন ব্যাংকের চেক গ্রহণ ও যোগদানপত্র দিয়ে প্রতারণা করে বিপুল অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ আনা হয়েছে।

গত ১১ মে রকি বড়ুয়াকে ধরতে নগরীর মোহাম্মদপুর এলাকার নুর ম্যানশন ভবনের একটি বাসায় অভিযান চালায় র‌্যাব। এ সময় রকি বড়ুয়া তিন তলার কার্নিশ থেকে লাফ দিয়ে পালানোর চেষ্টা করেন। কিন্তু ৫ সহযোগীসহ তাকে গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হয় র‌্যাব। পরে লালখান বাজার এলাকায় তার বাসায় অভিযান চালিয়ে তার এক বান্ধবীকে গ্রেপ্তার করে র‌্যাব।

এ সময় একটি বিদেশি পিস্তল, একটি ম্যাগাজিন, ৬ রাউন্ড গুলি, ৩৫ লাখ টাকার এফডিআরের কাগজপত্র, ৬ বোতল বিদেশি মদ, বিদেশি সিগারেট, ১৩টি খালি স্ট্যাম্পসহ তার তদবির বাণিজ্য ও প্রতারণার কাগজপত্র জব্দ করে র‌্যাব। তিন তলা থেকে লাফিয়ে পালাতে গিয়ে দুই পা ভেঙে ফেলায় অনেক দিন তিনি চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন। পুলিশ হেফাজতে চিকিৎসাধীন থাকা অবস্থায় এক রাষ্ট্রদূতকে ফোন করে সহযোগিতা চান তিনি। এ ঘটনায় ৬ পুলিশ সদস্যকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়।

এছাড়া ২০২০ সালের এপ্রিলে মধ্যরাতে লোহাগাড়ার চরম্বা ইউনিয়নের বিবিবিলা বড়ুয়া পাড়ায় এসে রকির সঙ্গে রুদ্ধদ্বার বৈঠক করেন সাঈদীর ছেলে মাসুদ সাঈদী, মাওলানা তারেক মনোয়ার ও কয়েকজন জামায়াত নেতা। এ নিয়ে রকির বিরুদ্ধে দেশে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সৃষ্টির অভিযোগ ওঠে। পরে গ্রেপ্তার করা হয় তাকে।

মন্তব্য করুন