অনেক নাটকের পর মামলার এক ও দুই নম্বর আসামি দিদারুল আলম দিদার এবং এ এম মহিউদ্দিনকে বাদ দিয়েই চট্টগ্রামের আলোচিত রিপন হত্যা মামলার চার্জশিট দিয়েছে পুলিশ। মামলার পর থেকেই এই দুই আসামি পালিয়ে আছেন। গ্রেপ্তার কিংবা জিজ্ঞাসাবাদ না করেই তাদের মামলা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে।

খুনের পর ক্রাইমজোন বায়েজিদের আতঙ্ক, দুই 'গডফাদার' দিদার ও মহিউদ্দিনের নির্দেশ ও নেতৃত্বে হকার্স লীগ নেতা রিপনকে খুন করা হয় উল্লেখ করে থানায় এজাহার দেন বাদী আজাদ। কিন্তু এক বছরের মাথায় রহস্যজনকভাবে খোদ বাদীই তার ভাষ্য বদলে ফেলেন। ঘটনার পর যাদের 'খুনি' হিসেবে অভিযুক্ত করে মামলা করেছিলেন, তাদেরই 'নির্দোষ' বলে অভিহিত করেন তিনি।

বাদী আজাদ আদালতে দিদার ও মহিউদ্দিনকে মামলা থেকে অব্যাহতি দিতে একটি আবেদনও জমা দিয়েছিলেন। ব্যাপক গুঞ্জন রয়েছে, বাদীর বয়ান বদলসহ এ মামলায় একের পর এক নাটকীয় ঘটার নেপথ্যে রয়েছে '১৬ লাখ টাকার খেলা'। পুলিশ তদন্তের পর আসামি দিদার ও মহিউদ্দিনকে 'নির্দোষ' হিসেবে অভিহিত করে যে চার্জশিট দিয়েছে, তাতে এই আলোচনা আবারও জমে উঠেছে। চার্জশিটে পুলিশ উল্লেখ করেছে, রাজনৈতিক আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে দিদার ও মহিউদ্দিনকে আসামি করা হয়েছিল।

মামলার তদন্ত কর্মকর্তা চট্টগ্রাম মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের ইন্সপেক্টর রাশেদুল হক সমকালকে বলেন, রিপন হত্যা মামলাটি এর আগে আরও দু'জন কর্মকর্তা তদন্ত করেছেন। সর্বশেষ তদন্ত কর্মকর্তা হিসেবে মামলার এক ও দুই নম্বরসহ ৯ আসামির বিরুদ্ধে কোনো সাক্ষ্য-প্রমাণ না পাওয়ায় তাদের চার্জশিট থেকে বাদ দিয়েছি। বাদী 'আসামিরা নির্দোষ'- এই মর্মে আদালতে একটি আবেদন করেছিলেন। সেই আবেদনকেও তদন্তের সময় আমি সর্মথন করে গিয়েছি।

মামলার বাদী মো. আজাদ এ প্রসঙ্গে বলেন, আদালতে পুলিশ চার্জশিট দিয়েছে কিনা জানি না। কাকে বাদ দিয়েছে, কাকে রেখেছে সেটাও বলতে পারছি না। পুলিশ যাই করে থাকুক না কেন, তদন্ত নিয়ে আমার আর কোনো আপত্তি নেই। আসামিরা এলাকায় প্রভাবশালী হওয়ায় এ নিয়ে আর কোনো কথা বলতে চাই না। তবে টাকা নেওয়ার বিষয়টি মিথ্যা।

রিপন খুনের সময় গুরুতর আহত আরেক ভিকটিম ও মামলার সাক্ষী মো. আলামিন বলেন, মামলার পর সাত-আট মাস বাদী ঠিকই ছিলেন। এরপর তার আচার-আচরণ পাল্টে যেতে থাকে। আমি ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী এবং রিপনের সঙ্গে আমাকেও খুন করার উদ্দেশ্যে কোপানো হয়। কিন্তু বাদী আজাদ আসামিদের সঙ্গে আঁতাত করে ১৬ লাখ টাকা নিয়ে প্রধান আসামিদের বাঁচিয়ে দিয়েছেন। রিপনের সৎভাই হওয়ায় আজাদ এ জঘন্য কাজ করতে পেরেছেন।

চার্জশিটে উল্লেখ করা হয়েছে, 'বায়েজিদ এলাকায় আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীরা দুটি ভাগে বিভক্ত। এক পক্ষে আছেন মামলার আসামি দিদারুল আলম দিদার ও মহিউদ্দিনরা। অন্য পক্ষে আছেন স্থানীয় কাউন্সিলর শাহেদ ইকবাল বাবু। বায়েজিদ এলাকায় আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে এ দুই গ্রুপের মধ্যে বিরোধ দীর্ঘদিনের।'

চার্জশিটে বলা হয়, '২০২১ সালের সিটি নির্বাচনে এ এম মহিউদ্দিন আওয়ামী লীগের কাউন্সিলর প্রার্থী হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু মনোনয়ন পান শাহেদ ইকবাল। ফলে এলাকায় উত্তেজনা বেড়ে যায়। খুন হওয়া রিপন ছিল কাউন্সিলর শাহেদ ইকবাল বাবুর অনুসারী। সংঘাতে রিপন খুন হলেও দিদার-মহিউদ্দিনের বিরুদ্ধে এ খুনে যুক্ত থাকার কোনো সাক্ষ্য-প্রমাণ মেলেনি। রিপন খুন হওয়ার পর রাজনৈতিক প্রতিহিংসার কারণে তাদের এ মামলায় আসামি করা হয়। তাই তাদের এ মামলা থেকে অব্যাহতি দিতে সুপারিশ করা হলো।'

চার্জশিটে পলাতক দিদার ও মহিউদ্দিন ছাড়াও জসিম উদ্দিন ওরফে পানি জসিম, ইকবাল হাসান, মহিন উদ্দিন তুষার, ফয়সাল ওরফে ডিবি ফয়সাল, রফিক ওরফে মাছ রফিক ও নবাব সিরাজ দৌল্লাহকে চার্জশিট থেকে বাদ দেয় পুলিশ। তবে ফজল আহাম্মদ, সেলিম উদ্দিন বাদশাসহ এজাহারভুক্ত ১৮ আসামিকে চার্জশিটভুক্ত করা হয়। করোনাকালের মধ্যে তদন্ত শেষ করে গত ২৭ মে চট্টগ্রাম চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে চার্জশিট দেওয়া হয়।

২০২০ সালের ১ জানুয়ারি নগরীর বায়েজিদ থানায় রিপন খুনের মামলার পর আসামি দিদার ও মহিউদ্দিন প্রথমে ভারতে পালিয়ে যান। পরে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়ে এলে চট্টগ্রামে ফেরেন।

মন্তব্য করুন