মো. সাহেদ ওরফে সিলেটী সাঈদ এক সময় নিজের ট্রাক-কাভার্ডভ্যানে রপ্তানিমুখী তৈরি পোশাক পরিবহনের কাজ করতেন। এক সময় পরিবহনের এজেন্ট হিসেবেও কাজ করেন তিনি। পরে রপ্তানিমুখী গার্মেন্ট পণ্য চুরি করতে গড়ে তোলেন শক্তিশালী চক্র। তার নেতৃত্বে চক্রটি ২১ বছরে ঢাকা-চট্টগ্রাম রুটে অন্তত পাঁচ হাজার ট্রাক থেকে রপ্তানিমুখী পণ্য চুরি করেছে। এর আনুমানিক মূল্য হাজার কোটি টাকা। গত শুক্রবার ঢাকা ও কুমিল্লা থেকে সাঈদসহ তার চক্রের সাত সদস্যকে গ্রেপ্তারের পর এসব তথ্য বেরিয়ে এসেছে।

ডিবি কর্মকর্তারা জানান, ২০০০ সাল থেকে সাঈদ গাড়ি থামিয়ে গার্মেন্ট পণ্য চুরি করে আসছিলেন। এই টাকায় গ্রামের বাড়ি মৌলভীবাজারে দ্বিতল অট্টালিকা, ইটভাটা ও বেশ কয়েকটি পরিবহনের মালিক হয়েছেন। এক স্ত্রী আর সন্তানদের লন্ডনে আলিশান জীবনযাপনের ব্যবস্থা করে দিয়েছেন। আরেক স্ত্রীকে নিয়ে বসবাস করছেন দেশে।

গ্রেপ্তার অপর ছয়জন হলো- মো. রাজ্জাক, মো. ইউসুফ, মাইনুল ইসলাম, আল আমিন, দুলাল হোসেন ও খাইরুল ইসলাম। তাদের কাছ থেকে চুরি করা চার হাজার ৭০৫ পিস তৈরি পোশাক ও দুটি কাভার্ডভ্যান জব্দ করার কথা জানিয়েছে ডিবি।

গতকাল সোমবার রাজধানীর মিন্টো রোডে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) মিডিয়া সেন্টারে সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য দেন ডিবি কর্মকর্তারা। ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার (ডিবি) এ কে এম হাফিজ আক্তার বলেন, গত মে মাসে আশুলিয়ার জয়ন্তী নিটওয়্যার নামে একটি প্রতিষ্ঠানের পণ্যবোঝাই কাভার্ডভ্যান চট্টগ্রাম বন্দরের উদ্দেশে যায়। ইংল্যান্ডে ক্রেতার হাতে পৌঁছানোর পর দেখা যায় তাতে ১১ হাজার পিস পণ্য কম। ওই ঘটনায় তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল থানায় মামলা করে প্রতিষ্ঠানটি। এরপর নেটওয়ার্ক ক্লোথিং নামে আরেকটি প্রতিষ্ঠানের পণ্য জার্মানিতে রপ্তানির সময় পাঁচ হাজার পিস কাপড় খোয়া যাওয়ার তথ্য বের হয়। ওই ঘটনায়ও প্রতিষ্ঠানটি তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল থানায় মামলা করে। ওই দুটি মামলার তদন্ত করতে গিয়ে চক্রটির সন্ধান মেলে।

হাফিজ আক্তার বলেন, এ ধরনের চুরি দেশের সুনাম ক্ষুণ্ণ করছিল। পণ্য খোয়া যাওয়ায় গার্মেন্ট কারখানাগুলোকেও ক্ষতিপূরণ গুনতে হচ্ছিল। শুধু জয়ন্তী নিটওয়্যারকেই ২৮ হাজার ৯০৮ ডলার জরিমানা দিতে হয়েছে ক্রেতাকে। তিনি বলেন, রপ্তানিমুখী গার্মেন্ট পণ্য চোর চক্রের হোতা সাঈদের বিরুদ্ধে ঢাকা ও চট্টগ্রামের বিভিন্ন থানায় অন্তত ২৪টি মামলা রয়েছে। চট্টগ্রামের ছয় মামলায় দীর্ঘদিন জেল খেটে বেরিয়ে ফের চুরিতে সক্রিয় হন তিনি।

সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, মামলাগুলো তদন্ত করতে গিয়ে এর আগে গত ১৩ সেপ্টেম্বর বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালিয়ে মো. মহিউদ্দিন. মো, মোবারক, ইব্রাহিম ও কাভার্ডভ্যান চালক এমরানকে গ্রেপ্তার করা হয়। তাদের মধ্যে এমরান আদালতে স্বীকারোক্তি দিয়ে সাঈদসহ অপর আসামিদের নাম জানায়।

গ্রেপ্তার অভিযানে নেতৃত্ব দেওয়া ডিবির তেজগাঁও বিভাগের অতিরিক্ত উপকমিশনার শাহাদৎ হোসেন সুমা সমকালকে বলেন, সাঈদের চক্রের সদস্যরা মূলত ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম যাওয়ার পথে মহাসড়কে চুরির কাজটি করত। এ জন্য কুমিল্লায় তারা একটি গুদামও গড়ে তুলেছে। বন্দরমুখী ট্রাক ও কাভার্ডভ্যানের চালক থেকে শুরু করে পরিবহন এজেন্টদের একটি অসাধু গ্রুপের ২০ থেকে ৩০ জন তার চক্রে রয়েছে। বন্দরে যাওয়ার পথে নিজেদের

গুদামে পণ্যবাহী কাভার্ডভ্যান বা ট্রাক থামিয়ে তারা মালপত্র চুরি করত। পরে এগুলো ছোটখাটো বায়িং হাউসে বিক্রি করে দিত। তিনি জানান, এ ধরনের বায়িং হাউসের একটি গ্রুপকেও শনাক্ত করা হয়েছে। তাদের বিষয়ে তদন্ত চলছে।

মন্তব্য করুন