ছাত্রী হেনস্থা, নির্মাণাধীন প্রকল্পে চাঁদাবাজি, নির্মাণসামগ্রী বিনষ্ট, কর্মকর্তাদের ওপর আক্রমণসহ বিভিন্ন অপকর্মে জড়িয়ে পড়েছেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় (চবি) শাখা ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা। এসব ঘটনায় যুক্ত বেশিরভাগ অপরাধীর নাম-পরিচয় সামনে এলেও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন কোনো ব্যবস্থা নিচ্ছে না বলে অভিযোগ

উঠেছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের জ্যেষ্ঠ শিক্ষকরা বলছেন, প্রশাসনের ব্যর্থতায়ই ছাত্রলীগের একশ্রেণির নেতাকর্মী হলগুলোতে অবস্থান করে অপরাধমূলক ঘটনা ঘটাচ্ছে।

করোনা মহামারিজনিত পরিস্থিতিতে প্রায় দেড় বছর ধরে উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও এর হলগুলো বন্ধ থাকলেও চবিতে বরাবরই হলে অবস্থান করছেন ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা। এটি নিয়ে সমকালে ''ছাত্রলীগের জন্য 'খোলা'

চবির হল'' শিরোনামে প্রতিবেদনও ছাপা হয়। ওই প্রতিবেদনে দেখানো হয়েছিল, চারটি হলের ৬০ কক্ষে সভাপতিসহ শতাধিক নেতাকর্মী অবস্থান করছেন।

এমন প্রেক্ষাপটে হলগুলোর নিয়ন্ত্রণ ও কক্ষ দখল নিয়েও অব্যাহত রয়েছে উত্তেজনা। বিভিন্ন হলে বগিভিত্তিক সংগঠনের নামে চিকা মেরে নিজেদের উপস্থিতি ঘোষণা করছে ছাত্রলীগের গ্রুপগুলো। সর্বশেষ গত শুক্র ও শনিবার দুই রাতে আলাওল হলে কক্ষ দখল নিয়ে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে ছাত্রলীগের দুই পক্ষের মধ্যে। এর আগে দুইবার মারামারিতে জড়িয়ে আহত হয়েছেন বেশ কয়েকজন নেতাকর্মী।

এছাড়াও ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা সরকারি নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে হলে অবস্থান, স্বাস্থ্যবিধি না মেনে ইফতার পার্টির আয়োজন, মিছিল, সভাসহ একাধিক অনিয়ম করলেও প্রশাসনের ভূমিকা ছিল নীরব। গত বৃহস্পতিবার রাতে ক্যাম্পাসে ফেরার সময় দুই ছাত্রীকে হেনস্তা করার অভিযোগ উঠেছে চার ছাত্রলীগ কর্মীর বিরুদ্ধে। তারা সবাই শাহ্‌ আমানত হলে থাকেন।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন অধ্যাপক সমকালকে বলেন, ক্যাম্পাস, হল বন্ধ থাকলেও শিক্ষার্থীরা হলে অবস্থান করেছে- অতীতে এমন কোনো নজির নেই। এছাড়া প্রায় চার বছর ধরে হলগুলোতে হয়নি কক্ষ বরাদ্দ। হলগুলোতে শিক্ষার্থীরা অবৈধ উপায়ে রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় থাকছেন বলে প্রশাসনও

নীরব রয়েছে।

দুই প্রকল্পে ভাঙচুর, বিচার হয়নি এখনও :চলতি বছরের ২৮ জুন চাঁদা না পেয়ে ব্যবসায় প্রশাসন অনুষদের নির্মাণকাজ বন্ধ করে দেন ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা। দফায় দফায় নির্মাণ শ্রমিকদের মারধর করা হয়। রাতে ৪০০ সিমেন্টের বস্তা কেটে তাতে পানি ঢুকিয়ে দেওয়া হয়। মটর বিচ্ছিন্ন করে ফেলা হয়। ইলেকট্রিক পাইপ খুলে ফেলা হয়। ঢালাইয়ের জন্য প্রস্তুত রডে রং ঢেলে নষ্ট করা হয়। এই দুই ঘটনায় ছাত্রলীগ নেতাদের নাম পরিচয় ও সিসিটিভি ফুটেজ গণমাধ্যমে প্রকাশিত হলেও কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। কোনো মামলাও হয়নি।

এর আগে ১৩ জানুয়ারি প্রধান হিসাব নিয়ামক ফরিদুল আলম চৌধুরীকে তার কক্ষেই মারধর করেন ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা। এ ঘটনায় চার সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করে কর্তৃপক্ষ। চার কার্য দিবসের মধ্যে কমিটিকে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়। তবে আট মাস পেরিয়ে গেলেও তদন্ত প্রতিবেদন জমা

দেয়নি ওই কমিটি। কোনো ব্যবস্থাও নেয়নি কর্তৃপক্ষ।

আইন বিভাগের শিক্ষক ও শিক্ষক সমিতির সাবেক সভাপতি অধ্যাপক মো. জাকির হোসেন বলেন, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা শিথিল হয়ে পড়ায় একের পর এক অনাকাঙ্ক্ষিত অন্যায় ও অপরাধমূলক ঘটনা ঘটছে। এ ধরনের ঘটনাকে যদি নিয়ন্ত্রণের মধ্যে না আনা যায়, তাহলে ভবিষ্যতে আরও বড় রকমের কোনো ঘটনা সংঘটিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

ছাত্রী হেনস্থার অভিযোগ সম্পর্কে বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের সভাপতি রেজাউল হক রুবেল বলেন, এ ঘটনায় নিরপেক্ষ তদন্তের ভিত্তিতে বিচার চাই। চাঁদাবাজি, ভাঙচুর ও নির্মাণসামগ্রী নষ্টের বিষয়ে তিনি বলেন, 'এসব ঘটনায় ষড়যন্ত্র করে ছাত্রলীগের নাম জড়ানো হয়। তবে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের উচিত, এসব ঘটনায় কারা জড়িত, তা অনুসন্ধান চালিয়ে বিচার করা। হলে দখলের বিষয়ে বলেন, আমরা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে বার বার বলছি, বগিভিত্তিক সংগঠনের চিকা মেরে যারা কক্ষ দখল করছে, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে। আমরা ব্যবস্থা নিতে গেলে বড় ঝামেলা হবে।'

কর্তৃপক্ষের বক্তব্য :এ প্রসঙ্গে শহীদ আবদুর রব হলের প্রভোস্ট ও প্রক্টর রবিউল হাসান ভূঁইয়া বলেন, সরকারি নির্দেশনা অমান্য করে যারা হলে অবস্থান করছে, তাদের ব্যাপারে আমরা খবর পেলেই তল্লাশি চালাচ্ছি। যদি এই ধরনের ঘটনা আমাদের নজরে আসে, তা হলে নিশ্চয়ই ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

কক্ষ দখলের বিষয়ে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন প্রাধ্যক্ষ সমকালকে বলেন, হল খোলা রাখার দরকার না হলে একদম বন্ধ রাখা দরকার। কক্ষ দখলের ঘটনা ঘটছে, কারণ এসব কক্ষের আসল মালিক নেই। প্রাধ্যক্ষ তো আর ২৪ ঘণ্টা হল পাহারা দিতে পারবেন না।

বিশ্ববিদ্যালয়ের নির্মাণসামগ্রী নষ্ট ও ভাঙচুরের ঘটনায় কোনো মামলা হয়েছে কিনা জানতে চাইলে রেজিস্ট্রার এস এম মনিরুল হাসান বলেন, কোনো মামলা করা হয়নি। এগুলো রেজিস্ট্রারের কাজ না।

জানতে চাইলে উপাচার্য শিরীণ আখতার বলেন, 'হলগুলোর প্রাধ্যক্ষদের নিয়ে সভা করে তাদের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে, যেন কোনো অবৈধ শিক্ষার্থী হলে না থাকে। বন্ধ হলে কারা থাকছে, সেটা দেখতেও বলা হয়েছিল। বিষয়টি সম্পর্কে খোঁজ নেওয়া হচ্ছে।'

মন্তব্য করুন