বগুড়ায় শতবর্ষী একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় চিরতরে নিশ্চিহ্ন হতে চলেছে। সড়ক বিভাগ মহাসড়কের জন্য বিদ্যালয়টির জমি ও ভবন অধিগ্রহণ করলেও বিকল্প স্থানে আরেকটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান স্থাপনের উদ্যোগ নেয়নি। কর্তৃপক্ষ বলছে, পার্শ্ববর্তী আরেকটি স্কুলে শিক্ষার্থীদের সমন্বয় করে দেওয়া হবে। এই স্কুল থেকে সেটি এক কিলোমিটার দূরে। মহাসড়ক পার হয়ে শিশুদের ওই স্কুলে পাঠাতেও আগ্রহী নন অভিভাবকরা। ফলে বিদ্যালয়টির অনেক শিক্ষার্থীর শিক্ষাজীবন অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। ভবিষ্যতেও স্থানীয় শিশুদের লেখাপড়ার ক্ষেত্রে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।

জেলার শাজাহানপুর উপজেলার রহিমাবাদ এলাকায় ১৯২৫ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় রহিমাবাদ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় নামের এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটি। দু'বছর আগে মহাসড়ক সম্প্রসারণের জন্য বিদ্যালয়টির ৩০ শতক জমি ও ভবন সংশ্নিষ্ট সড়ক বিভাগ অধিগ্রহণ করে। যে কোনো সময় বিদ্যালয়ের ভবনটি ভেঙে ফেলা হবে। বিষয়টি বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষককে অবহিত করতে নোটিশও দেওয়া হয়েছে। উপজেলা শিক্ষা অফিস থেকে জানানো হয়েছে, এই স্কুলের শিক্ষার্থীদের নিকটবর্তী আড়িয়া-রহিমাবাদ সরকারি প্রাথমিক বালিকা বিদ্যালয়ে স্থানান্তর করার প্রক্রিয়া চলছে।

অধিগ্রহণ করা বিদ্যালয়টির প্রধান শিক্ষক নিশাত আরা বেগম বলেন, তার বিদ্যালয়ে ৩৭৫ জন ছাত্রছাত্রী ছিল। বিদ্যালয়ের আশপাশে ১৪টি কিন্ডারগার্টেন গড়ে ওঠায় এখান থেকে অনেক শিক্ষার্থী তাতে গিয়ে ভর্তি হয়েছে। বর্তমানে ১০৮ জন শিক্ষার্থী আছে। তারা গরিব মানুষের সন্তান। দূরের কোনো স্কুলে পরিবহন ভাড়া করে তাদের যাওয়া যেমন সম্ভব নয়, তেমনি টাকা খরচ করে কিন্ডারগার্টেন স্কুলে পড়ারও সামর্থ্য নেই। ফলে অনেক শিক্ষার্থী ঝরে পড়বে।

এই স্কুলের এক শিক্ষার্থীর অভিভাবক আমজাদ হোসেন বলেন, তিনি গরিব মানুষ। বাড়ির কাছে স্কুল ছিল, সেজন্য সন্তানকে স্কুলে দিয়েছেন। মহাসড়ক পার হয়ে দূরের স্কুলে সন্তানকে পড়ানো তার পক্ষে সম্ভব নয়।

জানা গেছে, ওই বিদ্যালয়টির জমি অধিগ্রহণ করা হয়েছে প্রায় ৫ কোটি টাকায়। ওই টাকা দিয়ে কাছেই জমি কিনে নতুন একটি বিদ্যালয় গড়ে তোলা সম্ভব। কিন্তু সংশ্নিষ্ট কর্তৃপক্ষ সেদিকে মনোযোগী নয়। বিদ্যালয়টির পরিচালনা কমিটির সাবেক সভাপতি জাহিদুল হক আরজু জানান, তাদের পূর্বপুরুষরা মহাসড়কের পাশের ৪০ শতক জমি দান করে বিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠা করেছেন। ওই জমি ও ভবন অধিগ্রহণের মূল্য বাবদ প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর প্রায় ৫ কোটি টাকা পাচ্ছে। সেই টাকা দিয়েই জমি কিনে নিয়ম অনুযায়ী নির্ধারিত এরিয়ার মধ্যে বিদ্যালয়টি স্থানান্তর করা যায়। তারপরও তারা বিদ্যালয়টিকে নিজ এলাকায় ধরে রাখতে ১৪ শতক জমি দান করার অঙ্গীকার করেছেন। কিন্তু সেদিকে অগ্রসর হচ্ছে না কর্তৃপক্ষ।

জানা গেছে, গত ২৮ জুন প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের এক সভায় রহিমাবাদ স্কুলটিকে আড়িয়া-রহিমাবাদ বিদ্যালয়ের সঙ্গে সমন্বয় করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়। ওই সিদ্ধান্তের আলোকে গত ৩১ আগস্ট শাজাহানপুর উপজেলা শিক্ষা কমিটির সভায়ও একই সুপারিশ করা হয়।

আড়িয়া-রহিমাবাদ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ফারহানা আক্তার জানান, তার স্কুলের জমি ছিল মাত্র ২১ শতক। মহাসড়কের জন্য ৫ শতক অধিগ্রহণ করা হয়েছে। এখানে শিক্ষার্থী ২৬০ জন। জমি কম থাকায় অ্যাসেমব্লি করায় সমস্যা হয়। তেমনি শ্রেণিকক্ষ সংকটের কারণে পাঠদানেও বিঘ্ন ঘটে। এ অবস্থায় অন্য স্কুলের শিক্ষার্থীরা এখানে এলে সমস্যা আরও বাড়বে।

শাজাহানপুর উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা কামরুল হাসান জানান, বিদ্যালয় স্থানান্তরের সিদ্ধান্ত উচ্চ মহল থেকে নেওয়া হয়েছে। যে স্কুলে স্থানান্তরের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে তাকে ৪তলা বিশিষ্ট ঊর্ধ্বমুখী ভবন করে সেখানে দুই স্কুলেরই কার্যক্রম চলবে। তবে তিনি বাস্তব সমস্যাগুলো ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে তুলে ধরার চেষ্টা করেছেন। শাজাহানপুরের ইউএনও আসিফ আহসান বলেন, এ সমস্যা নিয়ে একাধিকবার আলোচনা হলেও কোনো সমাধান হয়নি। সমাধান করার চেষ্টা করা হচ্ছে।

জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা তাহমিনা খাতুন বলেন, বিদ্যালয়টির অধিগ্রহণের টাকা শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালকের ব্যাংক হিসাবে জমার পর তা সরকারি কোষাগারে চলে যাবে। এ টাকা দিয়ে স্কুলের জন্য জমি কেনার কোনো নিয়ম নেই। কেউ যদি জমি দান করেন কিংবা সরকারি খাসজমি পেলে তবেই বিদ্যালয় সেই এলাকায় থাকতে পারত। কিন্তু ঊর্ধ্বতনদের সিদ্ধান্তের কারণে সেটা হয়তো আর সম্ভব হবে না।

মন্তব্য করুন