আশপাশের উপজেলা কিংবা দূরের জেলা থেকে খুলনা মহানগরীতে প্রবেশের প্রধান পাঁচটি সড়কেরই দশা বেহাল। কিছুদূর পরপর বিশাল গর্ত, কাদাপানিভর্তি ডোবা, উঁচু-নিচু খানাখন্দে ভরা এসব সড়ক দিয়ে চলাচল করাই কঠিন। প্রায় প্রতিদিনই সড়কগুলোতে ইজিবাইক উল্টে যাচ্ছে। বাস ও ট্রাকের চাকা দেবে সড়কে অচল হয়ে পড়ছে।

সড়কগুলো হচ্ছে- রূপসা সেতু থেকে শিপইয়ার্ড, জিরো পয়েন্ট থেকে গল্লামারী হয়ে ময়লাপোতা, জয় বাংলার মোড় থেকে ময়ূরী ব্রিজ হয়ে সোনাডাঙ্গা বাস টার্মিনাল, মোস্তফার মোড় থেকে রায়েরমহল হয়ে বয়রা বাজার এবং শহর বাইপাস থেকে শেখ আবু নাসের বিশেষায়িত হাসপাতাল সংযোগ সড়ক।

গুরুত্বপূর্ণ এই পাঁচটি সড়ক খুলনা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (কেডিএ), সড়ক ও জনপথ (সওজ) অধিদপ্তর, স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) ও খুলনা সিটি করপোরেশনের (কেসিসি) নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। সড়কগুলো সংস্কারের জন্য মানববন্ধন, বিক্ষোভ, পদযাত্রা কর্মসূচি পালন করেছে বিভিন্ন সংগঠন। কিন্তু দৃশ্যমান কোনো তৎপরতা দেখা যাচ্ছে না সংস্কারের দায়িত্বে থাকা সংস্থাগুলোর।

বেহাল ৫ সড়ক কার নিয়ন্ত্রণে :রূপসা সেতু থেকে শিপইয়ার্ড হয়ে রূপসা মোড় পর্যন্ত সড়কটি খুলনা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (কেডিএ) নিয়ন্ত্রণাধীন। দুই বছর ধরে সড়কটি সংস্কার হয় না।

সড়কটি সংস্কারের জন্য সাত বছর আগে একটি প্রকল্প নিয়েছিল কেডিএ। প্রায় ২৫৯ কোটি টাকা ব্যয়ের এ প্রকল্পের কাজ কবে শুরু হবে- বলতে পারছেন না তারা।

শহর (রূপসা সেতু) বাইপাস সড়ক থেকে জিরো পয়েন্ট দিয়ে গল্লামারী হয়েও নগরীতে প্রবেশ করা যায়। জিরো পয়েন্ট থেকে গল্লামারী হয়ে ময়লাপোতা মোড় পর্যন্ত সড়কটি সওজের নিয়ন্ত্রণে। গত বছর সড়কটি চার লেনে উন্নীত করার কাজ শুরু হয়েছে। সংস্কারকাজ শুরুর মাঝপথে এতে গতি শ্নথ হয়ে গেছে। উঁচু-নিচু ঢেউখেলানো সড়ক দিয়ে চলাচল করতে দুর্ভোগের শেষ নেই নগরবাসীর।

শহর বাইপাস থেকে জয় বাংলার মোড় হয়ে ময়ূর ব্রিজ অতিক্রম করে সোনাডাঙ্গা বাস টার্মিনালের পাশ দিয়ে এমএ বারী সড়কে গিয়ে মিশেছে আরেকটি সড়ক। আন্তঃজেলা রুটে চলাচল করা সব বাস এই সড়ক ব্যবহার করে। সড়কটির শহর বাইপাস থেকে ময়ূর ব্রিজ পর্যন্ত অংশটুকু স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) নিয়ন্ত্রণে। ময়ূর ব্রিজ থেকে বাস টার্মিনাল পর্যন্ত কেসিসির।

তিন বছর ধরে সড়কটি বেহাল। অসংখ্যবার দাবি জানানোর পরও সড়ক সংস্কার করেনি কোনো সংস্থা। সম্প্রতি নগরীর ভেতরের অংশ নিজস্ব উদ্যোগে চলাচল উপযোগী করেছেন ব্যবসায়ীরা। কিন্তু সম্পূর্ণ সড়ক চলাচল উপযোগী না হওয়ায় চলাচলের কষ্ট থেকেই যাচ্ছে।

শহর বাইপাস সড়কের মোস্তফার (মোস্তর মোড়) মোড় থেকে রায়েরমহলের জলিল সরণি দিয়ে বয়রাবাজার মোড়ে যুক্ত হয়েছে আরেকটি সড়ক। গুরুত্বপূর্ণ এই সড়ক দিয়ে নগরীতে প্রবেশ করে বয়রা ও খালিশপুর অঞ্চলের মানুষ। কয়েক দফা ওয়াসা ও বিদ্যুৎ বিভাগ সড়কটি খুঁড়েছে। এরপর আর মেরামত হয়নি।

দুই বছর ধরে সড়কের অবস্থা এতই নাজুক যে একান্ত বাধ্য না হলে স্থানীয়রা সড়কটি এড়িয়ে চলেন। যারা বাধ্য হয়ে চলাচল করেন, হয় গাড়ি উল্টে যায়, না হলে চাকা দেবে যায়। সড়কটি এখন এলাকাবাসীর কষ্টের কারণ। সড়কটির বয়রাবাজার থেকে রায়েরমহল কালভার্ট পর্যন্ত কেসিসির। বাকি অংশ এলজিইডির।

সিটি বাইপাস থেকে শেখ আবু নাসের হাসপাতাল পর্যন্ত আরেকটি সংযোগ রয়েছে মহানগরীতে ঢোকার। ২০০৮-০৯ সালে সড়কটি নির্মাণ করেছিল কেডিএ। দু-তিন বছরের মধ্যে সড়কের পাড় ভেঙে পড়ে। কিছু স্থানে বড় ডোবার সৃষ্টি হয়। এরপর সড়কটি আর সংস্কার করা হয়নি। এক যুগ ধরে সংস্কার না করায় সড়কটি এখন নালায় পরিণত হয়েছে। এলাকাবাসী ছাড়া বর্ষা মৌসুমে ওই সড়কে এখন কেউ চলাচল করে না।

দায়িত্বশীলদের বক্তব্য :সড়ক সংস্কারের বিষয়ে কেডিএর প্রধান প্রকৌশলী কাজী সাবিরুল আলম সমকালকে বলেন, শিপইয়ার্ড সড়ক সংস্কারের দরপত্র প্রক্রিয়া শেষ হয়েছে। কার্যাদেশ অনুমোদনের জন্য সরকারি ক্রয় কমিটিতে পাঠানো হয়েছে। অনুমোদন হওয়ামাত্রই সংস্কারকাজ শুরু হবে। তিনি বলেন, আবু নাসের হাসপাতাল সংযোগ সড়ক সংস্কার করে এলজিইডিকে হস্তান্তর করা হয়েছে।

খুলনা এলজিইডির নির্বাহী প্রকৌশলী মো. কামরুজ্জামান বলেন, কোনো সড়ক নির্মাণ করে চিঠি দিয়ে দিলেই সড়কটি অন্য সংস্থার হয়ে যায় না। আবু নাসের সংযোগ সড়ক এলজিইডির নয়। তিনি বলেন, জয় বাংলা মোড় থেকে ময়ূরী ব্রিজ পর্যন্ত সড়ক শিগগিরই সংস্কার করা হবে।

কেসিসির নির্বাহী প্রকৌশলী মশিউজ্জামান খান বলেন, বয়রা থেকে রায়েরমহল (জলিল সরণি) সড়ক সংস্কারের দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে। ড্রেনের কাজও শুরু হয়েছে। বাস টার্মিনালসংলগ্ন সড়কও একটি প্রকল্পের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।

সড়ক বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী আনিসুজ্জামান মাসুদ বলেন, ওজোপাডিকো বিদ্যুতের খুঁটি সরাতে দেরি করায় কাজের গতি শ্নথ হয়ে গেছে। খুব শিগগির কাজে গতি আসবে।

সার্বিক বিষয় নিয়ে নিরাপদ সড়ক চাই, খুলনার সাধারণ সম্পাদক মাহবুবুর রহমান বলেন, একটি শহরে প্রবেশের প্রধান পাঁচ সড়কেরই যদি এই দশা হয়, তাহলে সরকারের বিভিন্ন উন্নয়নের সুফল নগরবাসী পাবেন কেমন করে? সরকারি সংস্থাগুলো সমন্বয়ের মাধ্যমে দ্রুত এসব সড়ক সংস্কার করা উচিত।

মন্তব্য করুন