ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় হেফাজত-জামায়াতের চালানো নজিরবিহীন তাণ্ডব নিয়ে অনুষ্ঠিত গণশুনানিতে ৩০ জন সাক্ষ্য দিয়েছেন। তাদের বেশিরভাগের বক্তব্যে উঠে এসেছে, সেই দিন পুলিশের নিষ্ফ্ক্রিয়তার বিষয়টি। এ ছাড়া গ্রেপ্তার হওয়া অভিযুক্তদের মুক্তি পাওয়া নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন কেউ কেউ।

গতকাল রোববার দুপুর ১২টায় ব্রাহ্মণবাড়িয়া সার্কিট হাউসে 'বাংলাদেশে মৌলবাদী সাম্প্রদায়িক সন্ত্রাস তদন্তে গণকমিশন' এই শুনানি গ্রহণ করে।

ব্রাহ্মণবাড়িয়া ও কুমিল্লার সাম্প্রদায়িক, মৌলবাদী সন্ত্রাস বিষয়ে একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি এবং জাতীয় সংসদের আদিবাসী ও সংখ্যালঘুবিষয়ক ককাসের যৌথ উদ্যোগে এই গণকমিশন গঠন করা হয়।

গণকমিশনের চেয়ারম্যান বিচারপতি শামসুদ্দিন চৌধুরী মানিকের নেতৃত্বে গণশুনানিতে অংশ নেন আদিবাসী ও সংখ্যালঘুবিষয়ক সংসদীয় ককাসের আহ্বায়ক বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক ফজলে হোসেন বাদশা এমপি, সাবেক আইজিপি ও নিরাপত্তা বিশ্নেষক মোহাম্মদ নুরুল আনোয়ার, বাংলাদেশ সম্মিলিত ইসলামী জোটের সভাপতি হাফেজ মাওলানা জিয়াউল হাসান, গণকমিশনের সদস্য সচিব ব্যারিস্টার তুরিন আফরোজ, সমন্বয়কারী কাজী মুকুল, সদস্য মওলানা হাসান রফিক, সমাজকর্মী এসএম শহীদুল্লাহ, সমাজকর্মী সাইফ উদ্দিন, সাইফ রায়হান প্রমূখ।

স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী ও জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকী উপলক্ষে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির বাংলাদেশ সফরকে কেন্দ্র করে গত ২৬ থেকে ২৮ মার্চ ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় হেফাজতে ইসলামসহ ধর্মভিত্তিক দল ও সংগঠনের নেতাকর্মীদের নারকীয় তাণ্ডবের বিষয়ে লিখিত ও মৌখিক সাক্ষ্য দিয়েছেন ৩০ জন।

সাক্ষ্যদাতাদের মধ্যে আছেন- আদিবাসী ও সংখ্যালঘুবিষয়ক সংসদীয় ককাসের সদস্য ও ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি র আ ম উবায়দুল মোকতাদির চৌধুরী এমপি, সাধারণ সম্পাদক আল মামুন সরকার, ব্রাহ্মণবাড়িয়া প্রেস ক্লাবের সভাপতি রিয়াজ উদ্দিন জামি, জেলা ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি অ্যাডভোকেট কাজী মাসুদ আহমেদ, জেলা জাসদের সভাপতি অ্যাডভোকেট আখতার হোসেন সাঈদ, জেলা কমিউনিস্ট পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাজিদুল ইসলাম, স্বাধীনতা চিকিৎসক পরিষদের জেলা সভাপতি ডা. আবু সাঈদ, সুর সম্রাট দি আলাউদ্দিন সংগীতাঙ্গনের সাধারণ সম্পাদক সাংবাদিক মনজুরুল আলম, ব্রাহ্মণবাড়িয়া সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের আহ্বায়ক সাংবাদিক আবদুন নূর, বাংলাদেশ আবৃত্তি সমন্বয় পরিষদের সাংগঠনিক সম্পাদক মনির হোসেন, ব্রাহ্মণবাড়িয়া হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিষ্টান ঐক্য পরিষদের সভাপতি দিলীপ নাগ, ব্রাহ্মণবাড়িয়া প্রেস ক্লাবের সাবেক সাধারণ সম্পাদক দীপক চৌধুরী বাপ্পী, অনুশীলন সাংস্কৃতিক কেন্দ্রের সাধারণ সম্পাদক ওয়াহিদ শামীম, ২০১৬ সালের সাম্প্রদায়িক হামলার ভুক্তভোগী ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগরের রসরাজ দাস, আশুগঞ্জ উপজেলা নির্মূল কমিটির ভারপ্রাপ্ত সভাপতি শাহিন সিকদার, আইনজীবী নাসির মিয়া, ভুক্তভোগী শ্রীশ্রী আনন্দময়ী কালীবাড়ি মন্দিরের সেবায়েত জীবন কুমার চক্রবর্তী।

উবায়দুল মুকতাদির চৌধুরী বলেন, 'গত ২৬ মার্চ বিকেল থেকে হেফাজত তথা কওমি মাদ্রাসাভিত্তিক ছাত্ররা শহরে তাণ্ডব শুরু করে। সরকারি স্থাপনাগুলো ভাঙচুর করে আগুন জ্বালিয়ে দেয়। কোনো রকম বাধা ছাড়াই তারা এ তাণ্ডব চালায়। ফায়ার সার্ভিসে খবর দিলে সেখান থেকে তারা জানায়, আমরা আগুন নেভাতে যেতে পারব না, ওপরের নির্দেশ আছে।

ভুয়া ফেসবুক আইডি থেকে ষড়যন্ত্রমূলক পবিত্র 'কাবাঘর' অবমাননার অভিযোগে ২০১৬ সালের ৩০ অক্টোবর গ্রেপ্তার হওয়া নাসিরনগরের হরিপুর ইউনিয়নের হরিণবেড় গ্রামের জেলে পরিবারের সদস্য নিরক্ষর রসরাজ দাস দুই মাস ১৬ দিন জেল খেটে কারাগার থেকে বের হন। শুনানিতে অংশ নিয়ে তিনি বলেন, 'পাঁচ বছর ধরে আদালতে হাজিরা দিতে দিতে আমি ক্লান্ত ও অসহায় হয়ে পড়েছি। হাজিরা দেওয়ার টাকা আমার নেই। রাষ্ট্রের কাছে এ মামলা থেকে আমি বেকসুর খালাস চাই।'

কুমিল্লা, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, সুনামগঞ্জ, চট্টগ্রাম, চাঁদপুর, সাতক্ষীরাসহ সারাদেশে গত পাঁচ বছরে মৌলবাদী ও সাম্প্রদায়িক হামলার বিষয়ে ভুক্তভোগী ও প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য তুলে ধরে গণকমিশনের প্রতিবেদন ও সুপারিশসহ শ্বেতপত্রে অন্তর্ভুক্ত করে আগামী ৩০ নভেম্বর প্রকাশ করা হবে বলে একটি সূত্র জানিয়েছে।

মন্তব্য করুন