গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জে বহুল আলোচিত তিন সাঁওতাল হত্যা মামলার অগ্রগতি না থাকায় আদিবাসীদের মধ্যে চাপা ক্ষোভ বিরাজ করছে। বর্তমানে ওই মামলাটির নারাজি শুনানি শেষে আগামী ৭ ডিসেম্বর আদেশের জন্য দিন ধার্য রয়েছে।

এরই মধ্যে সাঁওতালদের জমিতে ইপিজেড স্থাপনের ঘোষণায় তারা আবারও সংগ্রামে নেমেছে। সাঁওতালদের দাবি, গোবিন্দগঞ্জে অনেক জমি পতিত রয়েছে, সেই সব জমির কোথাও ইপিজেড স্থাপন করা হোক। তারা ইপিজেড স্থাপনের বিপক্ষে নন। তবে বিরোধপূর্ণ জমিতে ইপিজেড নয়।

সাঁওতালরা আরও জানান, তাদের বাপ-দাদার জমি রক্ষায় অনেক রক্ত দিতে হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে আন্দোলন-সংগ্রাম করছেন এবং পুরো জমি তাদের দখলে রয়েছে। সেখানে নিয়মিত ফসল উৎপাদন হচ্ছে। এরপরেও হত্যাকাণ্ডের বিচার না করে জমি নিয়ে নতুন ষড়যন্ত্র শুরু করা হয়েছে।

বিভিন্ন সূত্র থেকে জানা গেছে, সাঁওতালদের দখলে থাকা জমি থেকে তাদের উচ্ছেদের জন্য ২০১৬ সালের ৬ নভেম্বর পুলিশ বাড়িঘরে আগুন লাগিয়ে দিলে সাঁওতালরা প্রতিরোধ গড়ে তুললে তাদের ওপর গুলিবর্ষণ করা হয়। এ সময় তিনজন নিহত এবং ৩০ জন আহত হন। ওই বছরই ১৭ নভেম্বর এক রিটের পরিপ্রেক্ষিতে সাঁওতাল হত্যা মামলাটি তদন্তের জন্য পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনকে (পিবিআই) তদন্তের নির্দেশ দেন সুপ্রিম কোর্ট। ২০১৯ সালের ২৩ জুলাই আদালতে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করে পিবিআই। কিন্তু হত্যা মামলায় এজাহারনামীয় গুরুত্বপূর্ণ আসামিদের ১১ জনকে বাদ দিয়ে চার্জশিট দাখিল করলে তা প্রত্যাখ্যান করে ওই বছরের ৪ সেপ্টেম্বর নারাজি দেওয়া হয়। নারাজির ওপর শুনানি শেষে ২০১৯ সালের ২৩ ডিসেম্বর সিআইডিকে তদন্তের নির্দেশ দেন আদালত। দীর্ঘ তদন্ত শেষে ২০২০ সালের ২ নভেম্বর সিআইডি দাখিল করা চার্জশিটে আবারও ওই ১১ জনকে বাদ দেওয়া হয়। সিআইডির ওই চার্জশিটে এক মৃত ব্যক্তিকে আসামি হিসেবে দেখানো হলে নানা প্রশ্নের সৃষ্টি হয়। এরপর আবারও সিআইডির তদন্ত প্রতিবেদনের বিরুদ্ধে চলতি বছরের ৪ জানুয়ারি আরও একটি নারাজি পিটিশন করা হয়।

অন্যদিকে, আলজাজিরা টেলিভিশনে সাঁওতালপল্লিতে অগ্নিসংযোগের ভিডিও ফুটেজ প্রচারিত হলে বিষয়টি সুপ্রিম কোর্টের নজরে এলে গাইবান্ধা চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেটকে তদন্তের নির্দেশ দেওয়া হয়। তদন্ত শেষে ২০১৬ সালের ১৪ ডিসেম্বর তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করা হয়। তদন্তে পুলিশের এসআই মাহাবুব ও কনস্টেবল সাজ্জাদ হোসেনকে শনাক্ত করে প্রতিবেদন দাখিল করা হয়। এ সময় জুডিশিয়াল তদন্তে অসহযোগিতার কারণে গাইবান্ধার পুলিশ সুপার আশরাফুল ইসলামকে বদলি করা হয়। এরপর অভিযুক্ত ২ পুলিশ সদস্যকে বরখাস্ত করা হয়েছিল। কিন্তু পরে অভিযুক্ত পুলিশ সদস্যদের মামলার সাক্ষী করা হয়। সে সময় গোবিন্দগঞ্জ থানায় দায়িত্বরত ২২ পুলিশ সদস্যসহ পুলিশ সুপারকে অন্যত্র বদলি করা হয়।

সিআইডির চার্জশিটের বিরুদ্ধে করা নারাজি পিটিশনের ওপর চলতি বছরের গত ১২ সেপ্টেম্বর গোবিন্দগঞ্জ সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট পার্থ ভদ্রের আদালতে এ নারাজি শুনানি অনুষ্ঠিত হয়। আদালত দীর্ঘ শুনানি শেষে আদেশের জন্য আগামী ৭ ডিসেম্বর দিন ধার্য করেন।

মামলার বাদী থোমাস হেমব্রম বলেন, ঘটনার প্রায় ৬ বছর অতিবাহিত হয়ে যাচ্ছে। এখন একজন আসামিকেও গ্রেপ্তার করা হয়নি। তৎকালীন স্থানীয় এমপি আবুল কালাম আজাদ ও তৎকালীন রংপুর চিনিকলের এমডি আব্দুল আউয়ালসহ ৩৩ জনের নাম উল্লেখ এবং ৫০০-৬০০ অজ্ঞাত আসামি করে থানায় এজাহার দাখিল করা হয়। পুলিশ প্রভাবিত হয়ে ঘটনার সঙ্গে জড়িত মূল ১১ জনকে বাদ দিয়ে আদালতে চার্জশিট দেয়। আদালতে অভিযুক্তদের বাদ দিয়ে চার্জশিট দেওয়া হলে নারাজি পিটিশন করা হয়। আমরা আদালতে জুডিশিয়াল তদন্ত চেয়েছি। জুডিশিয়াল তদন্ত ছাড়া এ হত্যাকাণ্ডে বিচার আমরা পাবো না।

আদিবাসী নেতা ডা. ফিলিমন বাস্কে বলেন, 'হত্যা মামলা নিয়ে টালবাহনা করা হচ্ছে এবং উল্টো আমাদের বিরুদ্ধে ৮টি মিথ্যা মামলা দিয়ে হয়রানি করা হচ্ছে। গুলিতে অনেকেই হাত-পা ও চোখ হারিয়ে মানবেতর জীবন-যাপন করছেন। এতকিছু ক্ষয়ক্ষতির পরেও বিচার পাচ্ছি না।'

উল্লেখ্য, ২০১৬ সালের ৬ নভেম্বরে সাহেবগঞ্জ ইক্ষুখামারে আখ কাটাকে কেন্দ্র করে চিনিকল শ্রমিক, পুলিশ ও সাঁওতালদের মধ্যে ত্রিমুখী সংঘর্ষ হয়। এ সময় পুলিশের গুলিতে শ্যামল হেমব্রম, রমেশ টুডু ও মঙ্গল মার্ডি নামে তিন সাঁওতাল মারা যান।

মন্তব্য করুন